কিশোরময় জীবন যাঁর | বিশ্ব | DW | 29.03.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

কলকাতা

কিশোরময় জীবন যাঁর

ছবির নাম ‘কিশোর কুমার জুনিয়র’৷ গায়ক গৌতম ঘোষের জীবননির্ভর সেই ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন প্রসেনজিৎ৷ জয়সলমীর থেকে সদ্য ফিরে ডয়চে ভেলের মুখোমুখি হলেন গৌতম ঘোষ৷

টালিগঞ্জ নেতাজী নগরের এই গায়ককে ‘কিশোরকন্ঠী’ হিসেবে বাংলার মানুষ চেনেন৷ অনেকগুলি বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করলেও এবার চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর সংযোগ হচ্ছে অন্যভাবে৷ জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী অভিনেতা কৌশিক গাঙ্গুলির আগামী ছবিতে তাঁর জীবনের কাহিনীই উঠে আসতে চলেছে৷ পর্দায় মুক্তি পাওয়ার আগে জীবনের সেই কাহিনীগুলো শুনতে ডয়চে ভেলে পৌঁছে গিয়েছিল গৌতম ঘোষের কাছে৷ বছর ৬৫-তে এসেও তাঁর মোবাইলের রিংটোনে কিশোর, কন্ঠে বা কথায় কিশোর, কান্নায় আর স্মৃতিতেও কিশোর৷ ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে মনে হলো কিশোর কুমারের মিনি মিউজিয়াম! আদ্যন্ত কিশোরময় এই মানুষটি গুরুকে ঈশ্বর জ্ঞানে পুজো করেন আজও৷ প্রচুর পুরস্কারের মাঝে তাঁর গুরুর জুতোটি দেখা যাচ্ছিল না৷ তাই সেখান থেকেই শুরু হলো প্রশ্ন৷

ডয়চে ভেলে: শুনেছিলাম কিশোর কুমারের জুতোটি আপনার সংগ্রহে সাজানো আছে৷ কই, চোখে পড়ছে না তো?

গৌতম ঘোষ: আর বলবেন না! শোকেসে রাখলে সে জুতো চুরি হয়ে যাচ্ছিলো৷ তাই লুকিয়ে রাখতে হয়েছে৷ (কাবার্ডের ভেতর থেকে জুতো এনে দেখালেন৷)  

এই সেই জুতো? কীভাবে পেলেন?

হ্যাঁ, ১৩ অক্টোবর, মানে শেষের দিনের আগে ১২ অক্টোবর এই জুতো তিনি পরেছিলেন৷ অমিতদা, মানে অমিত কুমারকে (কিশোর কুমারের ছেলে) চাইতে তিনিই এটা দেন৷ তবে সাদা জুতোটা বেশি পরতেন৷ সেটা পাইনি৷   

Indien Kalkutta Sänger Goutam Ghosh

কিশোর কুমারের জুতা হাতে গৌতম ঘোষ

মুম্বাইতে কেমন দেখেছেন তাঁকে?

খুব মুডি মানুষ ছিলেন৷ কোনওদিন দেখা হলে বলতেন, কেমন আছো? কোনওদিন আবার চিনতেই পারতেন না! তবে গান গাওয়ার সময় কোনও কথা হবে না৷ ৪ বছরে মানুষটাকে খুব দেখেছি, চিনেছি৷ এমন মানুষ আর হবে না৷ ১৯৮৭ তে উনি মারা যাওয়ার পর আমি আর বম্বেমুখো হইনি৷

এবার তো আপনাকে নিয়েই ছবি করছেন পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি…

হ্যাঁ, কৌশিক গাঙ্গুলির মতো বড় পরিচালক আমাকে নিয়ে ছবি করবেন, কোনওদিন ভাবিনি৷ তবে এই মুহূর্তে এ নিয়ে কিছু বলবো না৷  

শুধু এটুকু তো বলুন, জয়সলমীরে কি এ জন্যই গিয়েছিলেন?

বুম্বা, মানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় যেখানে আমার চরিত্রে অভিনয় করছেন, জাতীয় পুরস্কার জয়ী পরিচালক যেখানে এ ছবির পরিচালনা করছেন, সেখানে আমি যাবো না!

ভিডিও দেখুন 04:51
এখন লাইভ
04:51 মিনিট

মঞ্চে কিশোর কুমারের গান গাইছেন গৌতম ঘোষ

রাজস্থানে জীবনের কোন অংশটা কাটিয়েছিলেন? মানে যে কারণে ছবিতে রাজস্থান উঠে আসছে?

ছবি রিলিজের আগে এসব বলা ঠিক হবে না৷ শুধু এটুকু বলবো যে, বম্বে আমাকে অনেক দুঃখ দিয়েছে৷ তাই বম্বের কথা ছবিতে রাখতে বারণ করেছিলাম৷ অনেক বঞ্চনা, অপমান বম্বে থেকে পেয়েছি৷  

সারা বাড়ি ভর্তি অসংখ্য পুরস্কার, সম্মান৷ জীবনে কিশোর কুমারের দেখা পেয়েছেন৷ এবার আপনাকে নিয়ে চলচ্চিত্র হচ্ছে৷ এরপরেও বম্বের অপমানগুলো যন্ত্রণা দেয়?

হ্যাঁ, যন্ত্রণা দেয় বৈকি! একজন বিখ্যাত বাঙালি সুরকার আমাকে গানের সুযোগ দেবে বলে ডেকে নিয়েও কোরাস গাইয়েছেন, তারপর গান গেয়ে টাকা পাইনি৷ এমন কত আছে! 

শুধু কি বম্বে? কলকাতা নেই এই তালিকায়?

সে-ও আছে৷ কলকাতায় গান গাওয়ার পর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে৷ গান গাইয়ে টাকা দেয়নি৷ এক বেলা খেয়ে কাটিয়েছি৷ টাকা আদায়ের জন্য অন্যের বাড়ি পর্যন্ত ছুটে গেছি৷ তা-ও টাকা পাইনি৷ 

অডিও শুনুন 08:43
এখন লাইভ
08:43 মিনিট

এমন মানুষ আর হবে না: গৌতম ঘোষ

বম্বে যাওয়া কেন সফল হয়নি?

তাহলে বলি৷ আমি বম্বে গিয়েছি স্রেফ কিশোর কুমারকে দেখতে৷ ১৯৮৭ সালে বিয়ে করেছি৷ বিয়ের এক মাসের মধ্যে বৌকে একা রেখে বম্বে চলে গিয়েছি৷ বৌকে বলেছিলাম, কিছু করে দেখাতে যাচ্ছি৷ কিন্তু আমি তো জানি, কিশোর কুমারকে দেখতেই গিয়েছি৷ তিনি কেমন করে গান গান, মাইক্রোফোন ধরেন, সবটা দেখেছি, শিখেছি৷ কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারিনি৷   

কেন? এতগুলো বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করার পরও এ কথা কেন?

আসলে সেই ছবিগুলো ঠিক আমার মতো৷ কোনও ছবির নায়ক-নায়িকা ভালো নয়৷ কোনওটার গল্প ভালো নয়৷ তাই ছবিগুলোও বাজারে চলেনি৷ আমিও স্বীকৃতি পাইনি৷ তবে ‘লোফার’ ছবিতে গান গেয়ে বিএফজে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি৷ সে বছর অনেক নামি সংগীতশিল্পীও তালিকায় ছিলেন৷

আজকাল রিয়েলিটি শোগুলোতে গায়ক গায়িকারা যেভাবে উঠছেন, সেটা আপনাদের সময়ে ভাবাই যেতো না...

আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা এসব পাইনি৷ আমাদের রাত জেগে পাড়া ফাংশন করতে হয়েছে৷ রাস্তাঘাটে, গ্রামেগঞ্জে যেখানে ডাক পেয়েছি, সেখানে ছুটতে হয়েছে৷ টিভি বা চ্যানেলের সাপোর্ট থাকলে আজ আমরা ঘরে ঘরে বন্দিত হতাম৷ তবে এসব থেকে যারা উঠছে, তারা বেশিদিন টিকছে না কেন? এক দু' বছরের পর আর তাদের দেখা যায় না৷ এরা পরিশ্রম করে না৷ 

আপনাদের কেমন স্ট্রাগল করতে হয়েছে?

আমার পাশে কোনওদিনই কেউ ছিল না৷ সবাই গান গাইয়ে নিয়ে পয়সা দেয়নি৷ তখন আমি খবরের কাগজ বিক্রি করে, মোমবাতির কারখানায় মোমবাতি তৈরি করতাম৷ গান গাওয়ার নেশায় ছুটতাম৷ আর বম্বের স্ট্রাগল? ওখানে আমার কোনও ঠি্কানা ছিল না৷ আন্ধেরী স্টেশনে ১ নং প্ল্যাটফর্মে ঘুমোচ্ছি৷ পুলিশ এসে লাঠির খোঁচা দিলে ২ নং, সেখান থেকে ৩ নংয়ে ঘুমোতে চলে যেতাম৷ তারপর সকাল হতেই কিশোর কুমারের বাড়ি গৌরীকুঞ্জে চলে যেতাম৷

 

গান তো শেখেননি৷ তা সত্বেও লতাজি'র সঙ্গে স্টেজ শেয়ার করেছেন! 

প্রথাগতভাবে গান শেখা হয়নি৷ হারমোনিয়াম বাজাতেও জানি না৷ কান দিয়ে শুনে মন দিয়ে গেয়েছি৷ এটা ঠিক যে, লতাজি, মান্না দে, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, জোজো সবার সঙ্গেই স্টেজ শেয়ার করেছি৷ 

এখনকার দিনে পাড়ার মঞ্চে গান গাইতে গেলে আগের অনুভূতি আসে?

এখন আর পাড়া কালচারটাই নেই৷ ক্লাবের ৫০টা ছেলে একসঙ্গে গান শুনতে যাবে, সেটা এখন ভাবাই যায় না৷ পাড়ায় পাড়ায় জলসাটাই উঠে গেছে৷ এই পাড়া কালচার আর পাড়ার মঞ্চ থেকেই আমি উঠেছি৷ আজকের গৌতম ঘোষ হয়েছি৷ 

ফিরে আসি কিশোরের কথায়৷ তাঁকে গুরুজ্ঞানে পুজো করেন৷ এবার চলচ্চিত্রে আপনার জীবন তুলে ধরা হচ্ছে৷ কী বলবেন?  

আমি নিজে খাণ্ডোয়াতে গিয়েছি৷ এই ছ'মাসও হয়নি তো! তাঁর বাড়ি, যেখানে জন্মেছেন, ২২ বছর পর্যন্ত যেখানে কাটিয়েছেন, কলেজ সব দেখে এসেছি৷ প্রণাম জানিয়ে এসেছি৷ তাঁর গান গেয়েই আজ গৌতম ঘোষ হয়েছি৷ দুঃখ আছে অনেক৷ তবু আমি মনে করি, ভগবান আমায় অনেক দিয়েছেন৷ যোগ্যতার থেকে বেশিও হয়তো দিয়েছেন৷ ছবি করা নিয়ে নাই বা বললাম!

কিশোর কুমারের কথায় তিনি কেঁদে ফেলেন আজও৷ এই সাক্ষাৎকারের সময়েও কেঁদে ফেললেন৷ নিজের শিল্পী জীবনের বঞ্চনা, অপমান বলতে গেলেও গলা বুঁজে আসে তাঁর৷ প্রতিবেদকের কাছ থেকে লোকশিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তীর ফোন নাম্বার নিয়ে তিনি ফোন করলেন দারুণ উৎসাহে৷ কথায় কথায় বললেন, ‘‘দিদি, তোমরা মৌলিক শিল্পী৷ তোমাদের এখনও বেঁচে থাকতে হবে৷ আমরা নকল করে গাই, আমাদের আর কি! চলে গেলেই হয়!’’

কিশোরকন্ঠী বুঝিয়ে দিলেন কেবল ‘কন্ঠী’ হওয়ার যন্ত্রণা কী নিদারুণ! এই ঘরেই পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি এবং নায়ক প্রসেনজিৎ এসে বসেছেন৷ রাতের পর রাত আলোচনা হয়েছে ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে৷ সব চিত্রনাট্য পর্দায় ধরা সম্ভব হবে না৷ থেকে যাবে মানুষ এবং বঞ্চিত শিল্পী গৌতম ঘোষের মনের ডায়েরিতে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন