কলকাতার শিক্ষাঙ্গনে কেন এত অস্থিরতা? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 16.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

কলকাতার শিক্ষাঙ্গনে কেন এত অস্থিরতা?

কখনো ছাত্রী নিগ্রহ, কখনো ভর্তিতে অনিয়ম৷ এমন নানা ইস্যুতে সরগরম রয়েছে কলকাতার শিক্ষাঙ্গন৷ এর ফলে বারবার বিক্ষোভ আন্দোলনে উত্তাল হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থাকছে না শিক্ষাঙ্গনের সুস্থিতি৷

শহর হোক বা শহরতলি, জেলা হোক বা খাস মহানগর, কলেজ ভর্তি ঘিরে অশান্তি, তোলাবাজি, ছাত্রী নিগ্রহ, পড়ুয়াদের অনশন বা ছাত্রের আত্মহত্যা – সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতার শিক্ষাঙ্গনে নিয়মিতভাবে এমনই ঘটনা নজরে আসছে৷

বছরের শুরুতেই হুগলির রিষড়া বিধান কলেজের টিএমসিপি সাধারন সম্পাদকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মারধোরের অভিযোগ ওঠে৷ উপযুক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ছাত্রীটির অভিযোগে পুলিশ প্রশাসনের টনক নড়েনি৷ শেষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে রিষড়া পুরসভার উপ-পুরপ্রধানের পুত্র শাহিদ থানায় আত্মসমর্পন করেন৷

রিষড়ার এই ঘটনা হিমশৈলের চূড়া মাত্র৷ পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্প্রতিক একাধিক আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সেই মুখ্যমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল৷ প্রবেশিকা পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজ্যের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়৷ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন৷ পড়ুয়াদের ৯০ ঘণ্টা অনশন চলার পর প্রবেশিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় যাদবপুর কর্তৃপক্ষ৷

রিষড়া বা যাদবপুরের ঘটনার চরিত্র আলাদা হলেও ঘটনা দু'টি শিক্ষাঙ্গনের অনিয়ম ও অস্থিরতাকে তুলে ধরেছে৷ ছাত্র সংসদের সাধারন সম্পাদক যখন কলেজ ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেও দীর্ঘদিন পার পেয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছাত্রীরা কি নিরাপদ নয়? ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ড. লনা মুখোপাধ্যায় এই ঘটনাকে একান্তই ‘দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি' বলেছেন৷ তাঁর মতে, সব কলেজেই যে এমন পরিস্থিতি, তা যেমন নয়, তেমনি কলেজ কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে নিজেদের দায় এড়াতে পারেন না৷ এটা শিক্ষামহলের ব্যর্থতা যে সব ব্যাপারেই মুখ্যামন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

আবার এই ব্যক্তি কেন্দ্রিক ঘটনা থেকে যাদবপুরের সমষ্টির ক্ষোভ শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতাকে তুলে ধরছে৷ এই সমস্যাকে শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটিবিচ্যুতি বলে মানতে রাজি নন অনেক শিক্ষাবিদ৷ বাম আমলের মন্ত্রী ও অধ্যাপক শ্রীকুমার মুখোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রথমত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পয়সা দিয়ে ডিগ্রি নেওয়ার জায়গা৷ সেখানে ছাত্রদের আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আত্মিকতা নেই৷ আর দিদি (মুখ্যমন্ত্রী) মনে করেন, সমস্তটাই রাজ্য সরকারের পার্টি৷ রাজ্য সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার সবটাই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে নিজেদের নায্য হক বুঝে নিতে ছাত্রদের লড়াই করতে হবেই৷ এটা লড়াই নয়, নায্য হকের জন্য রাস্তায় নামতে হবে৷''

কলকাতা মেডিকেল কলেজের ঘটনা সাম্প্রতিক অতীতের সবচেয়ে জোরালো ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে৷ কলকাতা মেডিকেল কলেজের পড়ুয়াদের অভিযোগ ছিল একেবারেই পরিকাঠামো সংক্রান্ত৷ এখানেও শুরু হয় অনশন৷ এক্ষেত্রেও মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের দাবি মেনে নেয়৷

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আর্থিক দুর্নীতি কোথায় পৌঁছাতে পারে তার নমুনাও এবার মিলেছে পশ্চিমবঙ্গে৷ এই মরসুমে কলেজে ভর্তির সময়, ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷ আঙুল উঠেছে শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের দিকে৷ শেষে দুর্নীতি রুখতে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষনা, অনলাইনে আবেদন করে ভর্তি হতে পারবেন পড়ুয়ারা৷ আপাতত আবেদন যাচাই করেও দেখা হবে না, কাউন্সেলিংও হবে না৷ রাজ্যসরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ভর্তির ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের কোনো ভূমিকা থাকবে না৷ শাসকদল চারটি কলেজে তৃণমূল ছাত্রপরিষদের ইউনিটও ভেঙে দেয়৷

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গনকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের মধ্যে এই আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগই সবচেয়ে নিন্দনীয়৷ একদল পড়ুয়া দাবি আদায়ে প্রাণের ঝুঁকি নিচ্ছে, আরেকদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিজেদের পকেট ভরছে৷ রিষড়ায় যেমন ছাত্রনেতা ক্ষমতায় অন্ধ হয়েছে, যাদবপুরে আবার সামনে এসেছে ব্যবস্থাপনার সংকট৷ সে কারণেই প্রত্যেকটি সমস্যাকে একই সূত্রে বাঁধতে চাইছেন না বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়৷

তিনি বলেন, ‘‘কলেজে ভর্তির দুর্নীতির পেছনে রয়েছে পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি৷ তাই মেধা তালিকার বদলে টাকা লেনদেনের মাধ্যমে ভর্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে৷ তাঁর মতে, শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই তাদের ছাত্রনেতাদের এসব কাজ করতে বলেননি৷ কিন্তু এটাও ঠিক যে এতে ছাত্র সংগঠেনর ওপর শাসকদলের নিয়ন্ত্রণের অভাব প্রকট হচ্ছে৷ তাই মুখ্যমন্ত্রীকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে৷ তাঁকে কেন এভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে? সঠিক ব্যবস্থা থাকলে এটা প্রয়োজন হয় না৷''

অডিও শুনুন 01:28

‘কলেজে ভর্তির দুর্নীতির পেছনে রয়েছে পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি’

তবে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপকে খুব একটা ইতিবাচক বলে মনে করেন না অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র৷ মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতায় অধ্যাপকের মন্তব্য, ‘‘কলেজে গিয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে শাসকদলের সুপ্রিমো তথা মুখ্যমন্ত্রীকে৷ সবাই বুঝেছে, রাজ্য সরকারের একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্প পোস্ট৷ পশ্চিমবঙ্গে যে একনায়কতন্ত্রী মনোভাব নিয়ে তিনি শাসকদলে বিরাজ করছেন, একইভাবে প্রশাসনেও বিরাজ করছেন৷ স্বাভাবিকভাবে বড় সমস্যা হলে তাঁকেই যেতে হবে৷ তিনি সেটা চানও৷''

কার্টুন কাণ্ডের জেরে সরকারের রোষে পড়া অম্বিকেশ বলেন, ‘‘মূল্যবোধের অবক্ষয় এখানে গৌণ৷ মূল সমস্যাটা শাসকদলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল করা নিয়ে৷  সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শাসকদলের নিজের লোকজনদের বসানো হচ্ছে৷ এ জন্যই টোকাটুকি থেকে শুরু করে কলেজে তোলাবাজি সবই বাড়ছে৷''

তোলাবাজি নিয়ে ক্ষুব্ধ দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য টিএমসিপির রাজ্য সভানেত্রী জয়া দত্তকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন৷ কিন্তু ঘোষণার পরে সেই পদে নতুন কাউকে বসানো হয়নি৷ অনুমান করা হচ্ছে, ভর্তি প্রক্রিয়া মিটে গেলে ছাত্রনেতাদের দাবি অনুযায়ী জয়া ফিরে আসতে পারে৷ এ ব্যাপারে জয়া দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছু বলতে চাননি৷

কলেজতুতো দাদা-দিদিদের অরাজকতার সবচেয়ে বড় বলিদান এক কিশোরের আত্মহত্যা৷ মেধা তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও অম্লান সরকার বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যা৷ স্রেফ নির্দিষ্ট দিনে কলেজে ব্যাপক গণ্ডোগোলের জেরে তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল৷ বারবার এ কলেজথেকে ও কলেজে ঘুরেছিলেন তিনি৷ চাপানউতোরের খেলায় তাঁর মৃত্যুর দায় তবে কার দিকে ঠেলবেন শিক্ষা আর মন্ত্রীমহলের বিশিষ্টরা?