করোনা মহামারি: যৌনকর্মীদের জন্য অভিশাপ না আশীর্বাদ! | আলাপ | DW | 06.08.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

করোনা মহামারি: যৌনকর্মীদের জন্য অভিশাপ না আশীর্বাদ!

করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন৷ উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন যৌনকর্মীরাও৷ যৌনপল্লিগুলো থেকে বের হয়ে অনেকেই ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন৷

‘‘সরকারের উচিত যারা যৌন পেশা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের অবিলম্বে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া৷’’

‘‘সরকারের উচিত যারা যৌন পেশা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের অবিলম্বে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া৷’’

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কলি আর তার ভাই ফুল বিক্রি করতো৷ ওদের মা একটা চায়ের দোকানে বাসন মাজার কাজ করতেন৷ ওদের বাবা কে জানা নেই৷ শুনেছিলাম কলির মা যৌনকর্মী৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে চাকরিতে ঢোকার পর একবার ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি ১২/১৩ বছরের কলির কোলে ছয় মাসের একটি বাচ্চা৷ জিজ্ঞেস করতে ওর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়৷ পরে চায়ের দোকানের বিল্লালকে জিজ্ঞেস করে জানা যায় কলির সন্তান৷ ওখানেই শুনলাম মায়ের মত জীবন যাতে বেছে নিতে না হয় তাই কলির বিয়ে দিয়েছেন তার মা৷

এই একটা ঘটনা আমার মনে যৌনকর্মীদের নিয়ে পূর্ব সব ধারণা পাল্টে দিয়েছিল৷ জানি, কলির মা এত ছোট মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ঠিক করেননি৷ কিন্তু একটা ঝুপড়ির মধ্যে তার ব্যবসা আর এই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে থাকতেন! সেই থেকে একটা বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার-প্রয়োজন না হলে কোন নারী যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নেন না৷

হয়ত পরিবারে উপার্জনের কেউ নেই, কোথাও কাজ না পেয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন৷ আর অনেকের ক্ষেত্রে তো জোর করে এই পেশায় নিয়ে আসার ঘটনা কম নয়৷ দালালের খপ্পরে পড়ে এই পেশায় আসতে বাধ্য হন অনেকে৷ অনেকে এই পেশা থেকে বেরিয়ে সমাজে ঠাঁই না পেয়ে আবারো ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন যৌনপল্লীতে৷

করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, দিনমজুর, গৃহকর্মীদের উপার্জন নেই৷ কিন্তু যৌনকর্মীদের অবস্থা কি? করোনা এমন এক রোগ, যা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে এই পেশায়৷ স্বাভাবিক সময়ে অনেকে নিজের জন্য সঞ্চয় রেখে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারতেন বলে বিভিন্ন এনজিওকে জানিয়েছেন৷ কিন্তু করোনাকালে খদ্দের একেবারে কমে যাওয়ায় নিজেরাই এখন না খেয়ে থাকেন৷

অনেকে বাসা ভাড়া না দিতে পেরে যৌনপল্লি ছেড়ে দিচ্ছেন৷ কিন্তু যারা এই কাজে এতদিন থেকেছেন করোনার এই সময়ে কি কাজ করবেন তারা! তাই তাদের কেউ কেউ হয়েছেন ভাসমান যৌনকর্মী৷

অথচ এই যৌনকর্মীদের মধ্যে যারা আগে এই পেশা থেকে বের হওয়ার জন্য বার বার পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, সর্দারনী আর দালাল তাদের ফিরিয়ে এনেছে৷ অন্য সময় এই বেরিয়ে আসাটা এত সহজ ছিলো না৷

তাই করোনা হয়ত তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে৷ বাংলা ট্রিবিউনের গত বছরের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, পুলিশের সহায়তায় যৌনপল্লি থেকে বেরিয়ে কয়েকজন যৌনকর্মী পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছেন৷

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল এইডস অ্যান্ড এসটিডি কর্মসূচির আওতায় ২০১৫ সালে এক জরিপ অনুযায়ী, দেশে নারী যৌনকর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ২ হাজার ২৬০৷ এর পাশাপাশি আছেন লক্ষাধিক পুরুষ ও ট্রান্সজেন্ডার যৌনকর্মী৷ দেশের যৌনপল্লিগুলোতে যৌনকর্মীর সংখ্যা চার হাজারের মতো৷ আর বাকিরা বাইরের যৌনকর্মী৷ তারা ভাসমান বা হোটেল ও বাসাবাড়িতে কাজ করেন৷

দেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লি দৌলতদিয়ায়৷  এখানে স্বাভাবিক সময় প্রায় দেড় হাজার যৌনকর্মী থাকেন৷ বর্তমানে এক হাজার ৫০ জনের মতো যৌনকর্মী রয়েছেন৷

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

লকডাউনের সময় দেশের ১১ যৌনপল্লির বাসিন্দাদের সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল৷ তবে তা ছিল খুবই অপ্রতুল৷

এদিকে, করোনাকালে কাজ হারিয়ে নিম্ন আয়ের নারীদের কেউ কেউ যৌন পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে৷ এ অবস্থা কেবল ঢাকা না, পুরো দেশে৷ আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় খদ্দেররা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার না করতে চাইলে তাতেও বাধ্য হচ্ছেন যৌনকর্মীরা৷ আর এতে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে৷

অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অধিকার নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংগঠন লাইট হাউস৷ প্রতিষ্ঠানটি গত বছরের জুন মাসে দেশের ২৫টি জেলায় নারী যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডারদের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে৷ সেখানে দেখা যায়, তাঁদের কাজ ৭৭ শতাংশ কমে গেছে৷ নারী যৌনকর্মীদের আয় কমে গেছে ৭৩ শতাংশ৷

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ছোট আকারে ৪০০ যৌনকর্মীর ওপর ফলোআপ জরিপ করে লাইট হাউস৷ সেখানে দেখা যায়, দ্বিতীয় ঢেউ আসার পর ১৬ শতাংশ নারী যৌনকর্মী একেবারে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন৷ এর আগে পাঁচ শতাংশ যৌনকর্মীর মাসিক আয় এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে ছিল৷ দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর ৫২ শতাংশ যৌনকর্মীর আয়ের অবস্থা এমনটা দাঁড়ায়

অন্যদিকে, ট্রান্সজেন্ডারদের মধ্যে খুব কমই বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত বা চাকরির সুযোগ পান৷ জীবনধারণের জন্য তাদের অধিকাংশের আয়ের অন্যতম উৎস দোকান এবং গণপরিবহন থেকে টাকা আদায়৷ কেউ কেউ আবার যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন৷

লকডাউনের কারণে সবকিছু বন্ধ থাকায় তাদের বর্তমানে আয় প্রায় শূন্য৷ তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা না পেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের৷ সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য কোনো প্রণোদনা বা লকডাউনে বিশেষ কোনো সহযোগিতা না থাকার কথা জানা গেছে৷

তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে যৌনকর্মী এবং ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা৷ পাশাপাশি যারা যৌন পেশা থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়