করোনা-দূরবীনে ‘লাইভ′ বাস্তবতা | বিষয় | DW | 31.07.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

করোনা-দূরবীনে ‘লাইভ' বাস্তবতা

করেনাকালে গৃহবন্দীত্বের শুরুর দিকে সবাই ছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ়৷ হতবিহ্বল৷ হঠাৎই শেকল ভাঙাল গান হয়ে আসে ‘লাইভ'৷

Symbolbild Home Office | Arbeit in Zeiten von Corona (picture-alliance/PantherMedia/D. Cervo)

প্রতীকী ছবি

বাঙালি বড্ড সৃজনশীল৷ কিংবা বড়ই হুজুগে৷ গ্লাসের অর্ধেক পূর্ণ, নাকি অর্ধেক শূন্য দেখবেন--- সে আপনার ব্যাপার৷ তবে করোনা কারাগারের হাঁসফাঁসে অনলাইনে ‘লাইভ'-এর যে উৎপাদন, সেটি রীতিমতো চোখ কপালে তুলে দেবার মতো৷ দেখলেও; না দেখলেও!

করেনাকালে গৃহবন্দীত্বের শুরুর দিকে সবাই ছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ়৷ হতবিহ্বল৷ হঠাৎই শেকল ভাঙাল গান হয়ে আসে ‘লাইভ'৷ ফেসবুকে লাইভ, ইউটিউবে লাইভ৷ চেনা আত্মীয়-বন্ধু-প্রিয়জনের সঙ্গে লাইভ, আবার অচেনা আমজনতার উদ্দেশ্যেও লাইভ৷ একটি অ্যাকাউন্ট থাকা মানে অসংখ্য লাইভের ছাড়পত্র৷ সেগুলো ছিন্নপত্রের মতো ভেসে বেড়াতে থাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ কেউ দেখে, কেউ দেখে না৷ আর এ শোরগোলে মূলধারার গণমাধ্যমও পিছিয়ে থাকেনি৷ তাছাড়া এ বিচ্ছিন্নকালের স্লোগানমুখর বিষণ্ণ সময়ে অতিথিকে অফিসে নিয়ে আসা কত হ্যাপা! ক্ষ্যাপার মতো তারাও নেমে পড়ে তাই ‘লাইভ' মিছিলে৷

ব্যস, সবারই নিজস্ব কথা বলার প্লাটফর্ম হল৷ যুগের হাওয়া লাগল গায়ে৷ ‘লাইভ'-এ তাই গান হচ্ছে, আবৃত্তি হচ্ছে, নাচ হচ্ছে, টক শো পর্যন্ত৷ শিক্ষাদান, চিকিৎসকের পরামর্শ, অফিসের মিটিং, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম, বাদ যাচ্ছে না কিছুই৷ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টাতে শুরু করে গণমাধ্যমের আধেয়; গণমাধ্যমের চরিত্র৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এটিকে দেখেন সময়ের প্রয়োজন হিসেবে; করোনা ভাইরাস উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যা আগেভাগে চলে এসেছে বলে তাঁর বিশ্লেষণ, ‘‘আমরা করোনা সংকটের মাঝে আছি৷ এ সময়ের মূল কথা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন৷ কিন্তু একইসঙ্গে আমরা মনে করি, মানসিক নৈকট্যকে আরো জোরদার করতে হবে৷ সেই মানসিকভাবে একজন আরেকজনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তথ্য-প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই৷ আমরা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্ত আছি৷ আর গণমাধ্যমও গতানুগতিক সাংবাদিকতার ধারা থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে প্রবেশ করেছে৷ কারণ প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর ৭৮০ কোটি মানুষের প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে তাত্তি¡কভাবে যোগাযোগ রাখার সুযোগ আছে৷ হয়তো সব দেশে অবকাঠামোগত সে উন্নয়ন হয়নি৷ অসাধারণ বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের সুফল আমরা ভোগ করছি৷ ভবিষ্যতে হয়তো এ ধরনের এক বাস্তবতায় আমরা যেতাম৷ করোনার কারণে এটি অনেক আগে আমাদের উপর চেপে বসল৷''

করোনাকাল শেষেও কি এ ধারা অব্যাহত থাকবে? গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার অধ্যাপকের ধারণা তেমনই, ‘‘এ বাস্তবতা থেকে আমরা বেরিয়ে যাব না৷ নানা সংকটের সময় পৃথিবীর যে অগ্রগতি হয়েছে, সংকট কেটে যাবার পরও তা অব্যাহত আছে৷ প্রযুক্তির যে নতুন ব্যবহার দেখছি, সেটি গণমাধ্যমের জন্য সুবিধা৷ এর যে ভোক্তা, তাঁদের জন্য সুবিধা৷ যাঁরা গণমাধ্যমে বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের জন্যও সুবিধা৷ এটি তাই ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমি মনে করি৷ আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এটিকে আরো সফলভাবে ব্যবহার করবে৷''

পাশাপাশি গণমাধ্যমের গতানুগতিক ধারাটি শুকিয়ে যাবে বলেও মনে করেন না আরেফিন সিদ্দিক৷ তিনি বরং অভিযোজনের আগাম ছবি আঁকেন দৃশ্যকল্পে, ‘‘এখনকার নতুন বাস্তবতা ভবিষ্যতে থাকবে৷ তবে আগে যেভাবে সাংবাদিকতা করা হয়েছে, সেটিও থাকবে৷ অপরাধ বিষয়ক কিংবা খেলার রিপোর্ট, কনসার্টের রিপোর্ট, এগুলো ঘটনাস্থলে না গিয়ে করলে চাহিদা মেটানো যাবে না৷ সবই তো রিমোট কন্ট্রোলে করা যাবে না৷ সব ডাক্তার বাড়িতে বসে চিকিৎসা করতে পারবেন না; যদিও এখন টেলিমেডিসিন দিচ্ছেন৷ সার্জিকাল ওয়ার্ডে গিয়ে ডাক্তারকে সার্জারি করতে হবে৷ আবার বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে গিয়েই ক্লাস নেবেন৷ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সামনাসামনি হওয়া ছাড়া শিক্ষা কখনো পূর্ণ হবে না৷ কিন্তু অনলাইনে যে শিক্ষাপ্রদান চালু করেছি, সেটি সম্পূরক হিসেবে যুক্ত থেকে যাবে৷ হয়তো একটি কোর্সের ৭০% ক্লাসরুম সিচুয়েশনে হবে, ২৫-৩০% অনলাইনে হবে৷ এভাবে অনেকটা অভিযোজন হবে৷ আর অভিযোজনের মাধ্যমেই মানব সমাজ এগিয়েছে৷ তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম জগতেও সেটি অবশ্যম্ভাবী৷''

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে মূলধারার গণমাধ্যমে৷ যমুনা টেলিভিশনে যেমন আগে খেলাধূলা উপর সাপ্তাহিক একটি অনুষ্ঠান ছিল ‘স্যাটারডে নাইট স্পোর্টস'৷ করোনার সময় এই টিভি স্টেশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিজস্ব পেজ থেকে ‘দ্য গেম ইজ নট ওভার' নামে ক্রীড়াবিষয়ক অনুষ্ঠান ৩০ দিনে করা হয়েছে ৩০টি৷ ভিউয়ারশিপ ভালো, অর্থ উপার্জনের নতুন পথও এটি৷ তবে যমুনা টিভির স্পোর্টস এডিটর রানা হাসান এমন অনুষ্ঠানে মানবিক স্পর্শটা মিস করেছেন, ‘পেশাদারীত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটিকে আপাত-ব্যবস্থা হিসেবেই দেখব৷ তবে সাংবাদিকতা তো শুধু পেশাদারীত্ব না; এর সঙ্গে মানবিক ব্যাপার আছে৷ ‘দ্য গেম ইজ নট ওভার' অনুষ্ঠানটি টানা করলেও আমার সাংবাদিক সত্ত্বা থেকে মনে হয়েছে, একটি রিপোর্ট তৈরি করলে যে মানসিক সম্পৃক্ততা বা দরদ থাকে, সেটি এখানে পাইনি৷ করোনার কারণে এ পথে আমরা হেঁটেছি; অল্প সময়ের জন্য ঠিক আছে৷ কিন্তু এমনটা সব সময় হতে পারে না৷''

অনলাইন নিউজপোর্টাল রাইজিং বিডি ডট কমের উপদেষ্টা সম্পাদক উদয় হাকিম প্রযুক্তির ভালো দিকটাই দেখেন বেশি, ‘যে সব কাজ আগে অনলাইনে করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না, এখন বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে৷' নিজের আইডিয়ার একটি অনুষ্ঠান কিভাবে চালু হল, বলেছেন সে গল্পও, ‘‘অনেকদিন ধরে ইচ্ছে ছিল গানের একটি প্রোগ্রাম করার৷ সেজন্য একটি টেলিভিশনে চাঙ্ক ভাড়া নেয়া, প্রডাকশন, অন এয়ার হওয়া--- সব কিছু মিলিয়ে অনেক মানুষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন৷ অনেক অর্থেরও৷ আমি দেখলাম, যেহেতু আমাদের একটি নিউজপোর্টালের প্লাটফর্ম আছে, সেটিকেই কেন ব্যবহার করছি না? এ ভাবনা থেকে আমি ‘ত্রিবেণী' নামে একটি প্রোগ্রাম শুরু করলাম গান, কথা ও কবিতা এ তিনটি বিষয় নিয়ে৷ এটি করোনার কারণেই সম্ভব হয়েছে৷ সব মিলিয়ে এ সময় যে গতি সঞ্চার হয়েছে, ভবিষ্যতে তা আরো বেগবান হবে মনে করছি৷''

লাইভ কিংবা অনলাইনে এ জাতীয় প্রোগ্রাম বেশি বোশি হলে সংখ্যায় যতটা বাড়বে, মানে ততটা বাড়বে না বলে এক ধরনের আশঙ্কা আছে৷ উদয় বিষয়টি দেখেন অন্যভাবে, ‘‘এমন অনুষ্ঠান বেশি হলে তখন ভালো মানের প্রতিযোগিতা হবে৷ যাঁর অনুষ্ঠানের মান ভালো, সেটি লোকে বেশি বেশি দেখবে৷''

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সভাপতি শেখ আদনান ফাহাদ করোনা বাস্তবতায় বাংলাদেশে অনলাইনের বিকাশকে ‘ডিজিটাল বিপ্লব' হিসেবে দেখছেন, ‘‘সরকার অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার কথা বলল৷ এখন গ্রামে-গঞ্জে-শহরে সব জায়গায় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে, এটি অভিনব৷ যে মানুষ জীবনে ফেসবুকে একটি পোস্টও দেননি, তিনি এখন  নিজের ক্লাস আপলোড করে দিচ্ছেন; লাইভে এসে ক্লাসও নিচ্ছেন৷ এটিকে ডিজিটাল বিপ্লব বলতে পারি৷''

তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্লাটফর্মে ‘প্রাচ্যনিউজ লাইভ' নামে অনুষ্ঠান করছেন নিয়মিত৷ ব্যক্তি পর্যায়ের সাংবাদিকতায় এ প্রযুক্তি ভীষণ সহায়ক বলে ফাহাদের উচছাস, ‘‘আমি বহু আগে থেকেই ক্লাসরুমে একটি টার্ম ব্যবহার করি, ইনডিভিজুয়াল জার্নালিজম৷ আগে যেটাকে বলা হত, ফ্রিল্যান্সার৷ এখন কেউ যদি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে ভালো কনটেন্ট দিতে পারে, তাহলে সেটি তাঁর জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হতে পারে৷’’ তা হোক বা না হোক, নতুন পৃথিবীর গণমাধমের এক মহড়া যে এই করোনাকালেহয়ে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে নিঃসংশয় এই সহকারী অধ্যাপক, ‘‘আমরা এখনো বেঁচে আছি৷ যদি বেঁচে নাও থাকি, তবু তো পৃথিবীর টিকে থাকবে৷ নতুন পৃথিবীতে গণযোগাযোগের মাধ্যমগুলো আমাদের কাছে কিভাবে আত্মপ্রকাশ করবে, তার একটা মহড়া এখনই দেখতে পাচ্ছি৷''

করোনা-দূরবীনে তাহলে দূরের বাস্তবতা ঝুপ করে কাছেই চলে এল! গণমাধ্যমের জন্য৷ সাধারণ মানুষের সাধ্যেও!

সংশ্লিষ্ট বিষয়