ওরা লোহা না খেলেও, লোহাই খাচ্ছে ওদের | বিশ্ব | DW | 25.07.2015
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বিশ্ব

ওরা লোহা না খেলেও, লোহাই খাচ্ছে ওদের

ওরা লোহা খায় না, লোহা ভাঙে৷ দস্তানা নেই, তাই খালি হাতেই ব্লো-টর্চটা তুলে নেন আলমগীর৷ ন'বছর বয়স থেকে এভাবেই চলছে৷ জাহাজ ভাঙার কাজে সামাজিক সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, ভালো বেতন – কোনোটাই নেই৷ তাও ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশাটাই যে অবলম্বন!

‘লোহাখোর' – এ নামেই আমার বন্ধু-মানুষ, তথ্যচিত্র নির্মাতা শাহীন দিল-রিয়াজ তুলো ধরেছিলেন বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পকে৷ পর্দার সামনে তুলে এনেছিলেন ওদের জীবন, ওদের জীবিকার গল্প৷

গল্পের শুরু অবশ্য আরো আগে, ষাটের দশকের শুরুতে৷ চট্টগ্রাম নৌ-বন্দরের অদূরে, বঙ্গোপসাগরের চরে আটকে পড়েছিল ‘কুইন আলপাইন' নামের একটা জাহাজ৷ উদ্ধার করা না যাওয়ায় একটা সময় জাহাজটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷ সেই থেকেই শুরু, বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের গোড়াপত্তন৷

Schiffsverschrottung in Chittagong, Bangladesch

আজও খালি হাতেই কাজ করেন আলমগীর...

পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ হয়েছে, প্রসারও ঘটেছে শিল্পের৷ দেশের বন্যাপ্রবণ এলাকা অথবা খরার হাত থেকে বাঁচতে গরিব, সহায়-সম্বলহীনরা দলে দলে যোগ দিয়েছে ‘শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড'-এ, দিন মজুর হিসেবে৷

‘লোহাখোর'-এ এই মানুষগুলোকেই দেখেছি আমরা, শুনেছি কান্না৷ বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শে আসার ফলে এদের অনেকেই আজ ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছে, ভুগেছে, অসুস্থ হয়েছে, মৃত্যুবরণও করেছে৷ কখনও আবার অকস্মাৎ আগুন লাগায় বা মাথায় ভাঙা ইস্পাতের টুকরো পড়ে আহত, চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়েছে কেউ কেউ৷ অথচ আজও শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করা যায়নি ইয়ার্ডে৷ তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের বড় বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে একঘরে করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বহুবার৷ অবশ্য পাকিস্তান বা ভারতের অবস্থাও তথৈবচ৷

তাই ইউরোপে নিবন্ধন হওয়া জাহাজগুলো ভাঙার জন্য যেন আর দক্ষিণ এশিয়ায় পাঠানো না হয়, তার জন্য নতুন আইনের ব্যবস্থা নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন৷ প্রশ্ন উঠেছে – এ অঞ্চলে কি তাহলে জাহাজ ভাঙা শিল্প শেষ হতে চলেছে?

উত্তর যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ এতে দমে যায়নি৷ দমে যাওয়ার আমাদের যে কোনো উপায় নেই! পেটের ভাত জোগাড় করতে হবে না? তাই দূষণ আর স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েও কাজ করে গেছে ‘লোহাখোর'-এর নায়করা৷ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর একটি ছবিঘরে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহতার চিত্র৷

হবে না? জাহাজ ভাঙার কাজ যে সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ৷ আর বাংলাদেশে এ কাজ করা হয় সমুদ্রসৈকতে৷ ফলে জাহাজ ভাঙার ফলে যে ইস্পাত ও অন্যান্য বর্জ্য তৈরি হয়, তার একটি বড় অংশ চলে যায় সাগরে, সরাসরি৷ এর বিরুদ্ধে ক্যাম্পেন চলেছে৷

হয়েছে আইনও৷ কিন্তু তাতে কী? বরং মনে পড়ছে ব্রাসেলসভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম'-এর কর্মকর্তা পাট্রিৎসিয়া হাইডেগারের কথা৷ তিনি মনে করেন, ‘‘কাজের পরিবেশ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইন থাকলেও, অর্থ ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ন করা যাচ্ছে না৷''

Deutsche Welle Süd-Ost-Asien Debarati Guha

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সম্পাদক

তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের দাম বেড়ে যাওয়ায় পুরনো জাহাজ আমদানিতে আর উত্সাহ পাচ্ছেন না মালিকরা৷ রডের চাহিদা কমার সঙ্গে সঙ্গে ‘স্ক্র্যাপ'-এর চাহিদাও সেভাবে আর নেই৷ অথচ এতদিন পর্যন্ত গ্রেডের রড তৈরির জন্য কাঁচামাল হিসেবে জাহাজের স্ক্র্যাপ-ই ব্যবহার হয়ে আসছিল৷ চীনও সুযোগ বুঝে আরো সস্তায় বিক্রি করা শুরু করেছে স্টিলের পাত৷ স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে জাহাজ ভাঙা শিল্পে৷ বিশেষ করে, ঐ মানুষগুলোর, জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা শোচনীয়৷ ইয়ার্ডের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে আসার ফলে, একদিকে তাদের যেমন কাজ কমেছে, তেমনই কমেছে মজুরি৷

আলমগীরের হাতে আজও উঠে আসেনি দস্তানা৷ বাংলাদেশে শ্রমিকের যে মজুরি কম, তারা হতদরিদ্র৷ অনেক কম পয়সাতেও কাজ করতে রাজি হয়ে যায় ওরা৷ তাই জাহাজ ভাঙা শিল্পটাই আজ পরিণত হয়েছে ‘লোহাখোর'-এ৷ ওরা লোহা না খেলেও, লোহাই যেন খাচ্ছে ওদের৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন