‘এসএ গেমসের স্বর্ণপদক আমার জন্য যথেষ্ট নয়’ | খেলাধুলা | DW | 09.12.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘এসএ গেমসের স্বর্ণপদক আমার জন্য যথেষ্ট নয়’

বাবা বলতেন, ‘‘তোমার জন্য আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারি না৷’’ পাড়ার দোকানদারও জানতে চাইতো, ‘‘এত রাতে মেয়ে কোত্থেকে আসছে?’’

এসএ গেমসে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-৫৫ কেজি ওজনশ্রেণি কারাতে কুমিতে স্বর্ণপদক জিতে সবার মুখেই গর্বের হাসি ফুটিয়েছেন মারজান আক্তার প্রিয়া৷ ডয়চে ভেলের মুখোমুখি হয়ে এই স্বর্ণকন্যা জানিয়েছেন সব কষ্ট আর স্বপ্নের কথা৷

ডয়েচে ভেলে : পড়ালেখার চেয়ে ছবি আঁকা বেশি পছন্দ করেন৷ আবার ফুটবল-ক্রিকেটের চেয়ে বেশি পছন্দ কারাতে৷ প্রচলিত ধারার বাইরে চলা আপনি বোধহয় অন্যরকমই৷ সেসব নিয়ে নিশ্চয়ই কথা বলবো৷ তবে শুরুতে জানতে চাই, এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জেতার পর বাবা-মায়ে অনুভূতি কেমন ছিল?

মারজান আক্তার প্রিয়া: প্রথমত, আমার কারাতে খেলায় তাঁরা রাজি ছিলেন না৷ অনুশীলন ক্যাম্প শুরু করার পরও না৷ তবে এসএ গেমসের একেবারে শেষ মুহূর্তগুলোয় অনেক সমর্থন করেছেন৷ স্বর্ণপদক জেতার সঙ্গে সঙ্গে আব্বু-আম্মুকে ফোন দিতে পারিনি; রাতে হোটেলে ফিরে ফোন দিই৷ আমি যে স্বর্ণপদক পেয়েছি, সেটি তাঁরা সে সময় জানতে পারেননি, কারণ, বাসায় টিভি ছিল না৷ সন্ধ্যায় অন্য আত্মীয়ের কাছ থেকে জানেন৷ আব্বুকে যখন ফোন করি, ওনার চোখে পানি চলে এসেছে৷ খুশিতে আমার সঙ্গে কথাই বলতে পারছিলেন না৷ আম্মু বরং অনেক শান্ত৷ উনার প্রথম কথা ছিল, ‘‘সম্মান অর্জন করাটা বড় ব্যাপার নয়, সেটি যেন ধরে রাখতে পারো, সে চেষ্টাই করবে সবসময়৷'' 

কারাতে খেলা নিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কোনো সমর্থন পাননি বলছেন...

কোনো সমর্থন পাইনি৷ আমি সবসময় পড়ালেখায় ভালো৷ ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত জিপিএ গোল্ডেন ফাইভ পেয়ে এসেছি৷ এসএসসিতে অল্পের জন্য এ প্লাস মিস হয়৷ পরবর্তীতে জগন্নাথের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই৷ এমন একটি মেয়ে খেলাধূলা বেছে নেবে, তা মেনে নেয়া যে কোনো বাবা-মায়ের জন্যই কঠিন৷ তাঁদের স্বপ্ন ছিল, পড়াশোনায় এত ভালো করছে যে মেয়ে, সে অবশ্যই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে৷

আপনার স্বপ্নটি বদলে গেল কিভাবে? খেলার দিকে গেলেও তো ক্রিকেট-ফুটবলে যান বেশিরভাগ৷ আপনি কারাতেতে এলেন কেন?

এটি ঠিক যে, ফুটবল-ক্রিকেটই সবার ওপরে৷ বিশেষত ক্রিকেট এখন খুব প্রাধান্য পাচ্ছে৷ আমি শখের বশে কারাতে শুরু করি৷ সিনেমায় লেডি ফাইটারদের দেখে খুব ভালো লাগতো৷ নায়িকা যেখানে মারামারি করছে, ছেলেদের মতো নির্ভিকভাবে চলছে৷ এই মনোভাব আমাকে আকৃষ্ট করতো৷ এর পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতেই কারাতের জগতে ঢোকা৷

শুরুটা কিভাবে?

আমি ভিকারুন্নিসা স্কুলে পড়েছি৷ যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন কারাতে শেখানো শুরু হয়৷ আমি তাতে যোগ দিইনি৷ তবে চারতলার উপর থেকে দেখতাম অনুশীলন৷ পাঞ্চ-কিকের সময় জোরে জোরে যে শব্দ করে, তা আকর্ষণ করে৷ তবে নিজে শুরুর সাহস করতে পারছিলাম না৷ বাবা-মায়ের কাছে যতবার শেখার কথা বলি, প্রতিবার তাঁরা মানা করে দেন৷ ক্লাস টেনে উঠে জোর করেই আমি স্কুলে কারাতের অনুশীলনে ঢুকি৷

তারপর?

সেখানে দেখলাম, আমার খুব বেশি উন্নতি হচ্ছে না৷ আব্বুকে বললাম, ‘‘আমাকে আরেকটু ভালো জায়গায় নিয়ে যাও, প্লিজ৷'' আমি এসএসসিতে ভালো ফল করি৷ সঙ্গে আমার জেদ দেখে আব্বু বাধ্য হন৷ উনি তো পুলিশে চাকুরি করেন৷ পুলিশের এক কারাতে কোচের কাছে আমাকে নিয়ে যান৷ দুই-আড়াই মাস শেখার পর দীন ইসলাম নামের একজন আমাকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)-তে নিয়ে যান৷ কারাতের আসল অনুশীলন শুরু সেখানেই৷ এনএসসিতে যাবার এক সপ্তাহের মধ্যেই ফাইনাল খেলি অন্তরার সঙ্গে; এসএ গেমসে এবার যে স্বর্ণপদক পেয়েছে৷ শুরুতে এত ভালো করায় আমি সবার নজরে আসি৷ এর কয়েক মাস পর জাতীয় কারাতেতে অংশ নিয়ে পাই রৌপ্য পদক৷

যখন এনএসসিতে অনুশীলন করছেন, তখনও তো বাসা থেকে খেলতে দিতে চাইতেন না?

ঠিক৷ আমি স্কুল শেষে বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে এনএসসিতে গিয়ে অনুশীলন শুরু করতে করতে বিকেল-সন্ধ্যা৷ বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত৷ এলাকার দোকানদারটা পর্যন্ত তখন জিজ্ঞেস করে, এত রাতে মেয়ে কোত্থেকে আসছে? শুরুর দিকে আম্মু আমার সঙ্গে যেতেন৷ পরে সবার এমন কথা শুনে উনি রাগ করে আমার সঙ্গে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দেন, যেন আমিও কারাতের অনুশীলনে না যাই৷ কিন্তু আমি যাওয়া ছাড়িনি৷

অনেক সময় নাকি এমন হতো, অনুশীলন শেষে বাসায় ফেরার পর বাবা-মা অনেকক্ষণ দরজাও খোলেননি?

ঠিক তাই৷ ওনারা রাগ করতেন৷ বাবা-মাকে অনেক কটূক্তি শুনতে হতো৷ ‘‘ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করে মেয়ে কোত্থেকে আসছে?'' এমন কথা আমি নিজেও শুনেছি অনেক৷ আমার পরিচিতরাই আমাকে বলেছেন, ‘‘ওহ, মারামারি করিস, তোর সামনে তো দাঁড়াতেই পারবো না৷'' কথাটা প্রশংসা না, টিটকারি করে বলতো৷

এসব কথাবার্তা কি আপনাকে আরো জেদী করে তুলতো?

অনেক বেশি জেদী করতো৷ অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করতো৷ ওই মুহূর্তগুলো জমিয়ে রাখতে রাখতে ভেতরে কিছু একটা জমে গিয়েছিল৷ মনে হয়েছিল, জায়গামতো বড় কিছু করতে হবে৷ 

ভিডিও দেখুন 02:02

পর্যটননগরী কক্সবাজারে সার্ফিং

এবার এসএ গেমসে যাবার সময় কি সেই জেদ ছিল যে, এবার সবাইকে দেখিয়ে দেবো?

ভেতরে ভেতরে জেদ ছিল৷ বাবা-মাকে তো আর সেভাবে বলা যায় না৷ তবে অনেক সময় রাগ করে আমিও বলেছি, ‘‘তোমরা আমাকে খেলতে দিচ্ছ না, দেখো আমি পড়াশোনার চেয়ে এখানে বড় কিছু করবো৷'' আব্বু আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘‘তুমি যে খেলায় আছো, আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারি না৷ ক্রিকেট-ফুটবল খেললে বলতে পারতাম, আমার মেয়ে খেলোয়াড়৷ কিন্তু মেয়ে কারাতে খেলে, মারামারি করে৷ এটি কাউকে বলতে পারি না৷ মানুষ ছি ছি করে৷''

এবারের এসএ গেমসে যখন শুধু নিজের বাবা-মা না, সবাইকে নিজের সামর্থ্য দেখিয়ে দিতে পারলেন. তখন সবচেয়ে বেশি কী মনে হচ্ছিলো?

সত্যি বলতে কি, এই অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে আমি সব ভুলে যাই৷ কে কী বলেছে না বলেছে, সব ভুলে গেছি৷ শুধু মনে হয়েছে, দেশের জন্য এত বড় সম্মান আমি নিয়ে এসেছি! জানি, সামনে যদি আমি স্বর্ণপদকের জায়গায় রৌপ্য-ব্রোঞ্জপদক পাই কিংবা কোনো পদকই না পাই, তখন আবার এ কথাগুলো উঠবে৷ তবে সেগুলো নিয়ে আর ভাবি না৷

ফুটবল-ক্রিকেট বাদ দিয়ে যেমন কারাতে বেছে নিয়েছেন, ঠিক তেমনি পড়াশোনার ক্ষেত্রে ছবি আঁকা৷ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়াশোনা করছেন৷ ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ কিভাবে?

ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি করতাম৷ আম্মুর কাছ থেকে শিখেছি৷ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশও নিয়েছি৷ শিল্পকলা একাডেমীতে এক বছরের কোর্স করেছিলাম৷ বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় জাদুঘরে যে ছবি আঁকার আয়োজন হতো, সেখানে নিয়মিত অংশ নিতাম৷ আসলে ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার পাশাপাশি ছবি আঁকায় আগ্রহ ছিল৷ সে কারণে জগন্নাথের চারুকলায় ভর্তি হই৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগেও ভর্তির আগ্রহ ছিল৷ কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় ফর্ম তুলতে পারিনি৷

কারাতে খেলার জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর বন্ধুদের সমর্থন পেয়েছেন কেমন?

ছয় মাস আগে আমি এসএ গেমসের কারাতে ক্যাম্পে সুযোগ পাই৷ তাতে যোগ দিতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করা যাবে না৷ আমি সে দরখাস্ত নিয়ে স্যারদের কাছে যাই৷ এত বড় জায়গায় সুযোগ পাওয়ায় ওনারা খুশি হন৷ তবে বলেন, ক্লাস না করলেও পরীক্ষা দিলে ভালো হয়৷ আমি বলি, ‘‘স্যার পরীক্ষা দেবার চেষ্টা করবো৷ তবে এখানে খেলা আমার সারা জীবনের স্বপ্ন৷'' স্যাররা বলেন, ‘‘ঠিক আছে, তুমি স্বর্ণপদক জিতে এসো৷ তোমার সব কিছু মাফ করে দেবো৷'' এটি আমার মাথায় সবসময় কাজ করতো৷ মনে হতো, স্যাররা বিশ্বাস করেন যে, আমি স্বর্ণপদক জিততে পারি৷ আর বন্ধুরা মজা করে হলেও অনুপ্রাণিত করতো৷ বলতো, ‘‘ওর সামনে দাঁড়ানো যাবে না৷'' কেউ হয়তো বলতো, ‘‘আমাকে ও হুমকি দিয়েছে, প্রিয়া চল তোকে নিয়ে যাবো৷'' এ ব্যাপারগুলো অনেক উপভোগ করতাম৷

স্বর্ণপদক পাবার পরের দিন আরেক ইভেন্টে অংশ নিতে গিয়ে আপনি আহত হন৷ সে কারণে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হয়৷ তখন কি ভয় পেয়েছিলেন?

না, ভয় পাইনি৷ আমি বরং খেলতে চেয়েছিলাম৷ মেডিকেলি আউট হবার জন্য খেলতে পারিনি৷ তবে তখনো আমি বলছিলাম, ‘‘আই অ্যাম ওকে, আমি ওয়ান্ট টু প্লে৷'' অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর সময়ও তাই বলছিলাম৷

সব মিলিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী?

আরো বড় আসর থেকে কারাতের স্বর্ণপদক নিয়ে আসা৷ এসএ গেমসের স্বর্ণপদক আমার জন্য যথেষ্ট না, কেননা, এখনো অনেকের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, ওদের ভেতরটায় পরিবর্তন হয়নি৷ লোকজনের সেই ভেতরটা বদলানোর জন্য আমি আরো বড় আসর থেকে স্বর্ণপদক জিততে চাই৷ এসএ গেমসের পর এশিয়ান গেমস, এরপর অলিম্পিক, কারাতের প্রিমিয়ার লিগ, বিশ্ব পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে পদক জিততে চাই৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন