এশিয়ার মুসলিম নারী অ্যাথলেটদের জীবন যেমন | বিশ্ব | DW | 28.01.2020

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

মুসলিম বিশ্ব

এশিয়ার মুসলিম নারী অ্যাথলেটদের জীবন যেমন

এশিয়ার অনেক দেশে মুসলিম নারী খেলোয়াড়রা পোশাকের জন্য সমালোচিত হন৷ বাংলাদেশের মতো কোনো কোনো দেশে রক্ষণশীলতা এখনো সে পর্যায়ে যায়নি৷ তবু পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে নিয়মিতই তাাদের হতে হয় বৈষম্যের শিকার৷

ইন্দোনেশিয়ার এরিস সুশান্তি রাহায়ু একজন ‘স্পিড ক্লাইম্বিং' খেলোয়াড়৷ ২৫ বছর বয়সী এই মুসলিম নারী হিজাব পরেন৷ তারপরও চারপাশের মানুষের সমালোচনা কানে আসে তাঁর৷

‘‘(মানুষের কথা শুনে) মাঝে মাঝে মনে হয় যেন আমি নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি৷ যেমন, ‘লেগিংস' পরতে হয় আমাদের৷ এটি একটি আঁটোসাঁটো পোশাক৷ কিন্তু কী করতে পারি? একজন অ্যাথলেট হিসেবে আমাকে পেশাদার হতে হবে,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন রাহায়ু৷

রাহায়ু দ্বিমুখী সমালোচনার শিকার৷ কখনো তিনি যেমন কাপড় আঁটোসাঁটো কেন সে প্রশ্নের মুখোমুখি হন, তেমনি হিজাব পরে তিনি কেমন করে খেলেন সে প্রশ্নও তোলা হয়৷ ‘‘মুসলিম নারী হিসেবে আমি আমার সীমাবদ্ধতাও জানি৷ তাই আমার হিজাব নিয়ে মানুষ যা বলে তাও আমি পাত্তা দেই না,'' বলেন রাহায়ু৷

ক্লাইম্বিং স্পোর্টসে ক্ষিপ্রতার জন্য নিজ দেশে ‘স্পাইডারওমেন' হিসেবে পরিচিত রাহায়ু৷ ২০১৯ চীন ক্লাইম্বিং ওয়ার্ল্ড কাপে তিনি ১৫ মিটারের ইভেন্টে স্বর্ণ জেতেন৷ এমনকি ৬.৯৯৫ সেকেন্ডে ইভেন্ট শেষ করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন৷

অন্যদিকে, বাংলাদেশি ফুটবল কোচ মিরোনা হিজাব পরেন না৷ কিন্তু মুসলিম হিসেবে নিয়মিত নামাজ পড়েন৷ এই নারী সাবেক জাতীয় ফুটবলার৷ যখন খেলোয়াড় ছিলেন তখন তাঁকে জার্সি ও শর্টস পরতে হত৷

‘‘আমি যখন প্রথম অনুশীলন শুরু করি, তখন স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে অনেকে অনেক বাজে বাজে কথা বলত৷ কারণ আমরা খেলোয়াড়ের পোশাক পরতাম৷ এগুলো এত বাজে কথা ছিল যে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না৷ অনেকবার ভেবেছি যে আর কখনো মাঠে ফিরে যাব না,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন মিরোনা৷

কিন্তু খেলার প্রতি টান তাঁকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে মাঠে৷ তিনি নারী জাতীয় দলের হয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত খেলেছেন৷

‘‘অথচ এখন যখন আমার ছবি বা সাক্ষাৎকার পত্রিকায় ছাপা হয়, সেই মানুষগুলোই আমাকে শুভেচ্ছা জানান,'' বলেন মিরোনা৷ 

২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর মিরোনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী কোচ হিসেবে একটি পেশাদার ফুটবল ক্লাবের দায়িত্ব নেন৷ নতুন ক্লাব ঢাকা সিটি এফসিতে প্রধান কোচ হিসেবে যোগ দেন তিনি৷

বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া দু'দেশেই ৯০ ভাগের বেশি মুসলিম৷ এই জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী৷ কিন্তু সে অনুপাতে তাদের ক্রীড়াতে অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য৷

 

রাহায়ুর হিজাব ও ক্রীড়াজীবন

ইন্দোনেশিয়ার সেন্ট্রাল জাভা প্রদেশের গ্রোবোগান এলাকায় ১৯৯৫ সালের ২১ মার্চ জন্ম রাহায়ুর৷ ছোটবেলায় পার্কে ও বাড়ির উঠোনে গাছ বাইতেন তিনি৷ তবে ২০০৭ সালে একে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে সাহায্য করে তাঁর স্কুল৷ সেই থেকে শুরু৷

আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর ডেব্যু হয় ২০১৭ সালে৷ ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ স্পোর্ট ক্লাইম্বিং বা আইএফসি ওয়ার্ল্ডকাপে তিনি সে বছর রৌপ্যপদক জেতেন৷ একই বছর তেহরানে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় হন৷

2018 Asian Games Aries Susanti Rahayu

২০১৮ এশিয়ান গেমস জেতার পর ইন্দোনেশিয়ার এরিস সুশান্তি রাহায়ু

২০১৮ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জিতে নিজ দেশে জনপ্রিয়তা পান রাহায়ু৷ আর ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতে কাগজে কলমে জনপ্রিয়তার চূড়ায় চড়ে বসেন এই নারী৷ অনেক নারী হিজাব পরে খেলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না৷ কিন্তু রাহায়ু নিজের পছন্দেই এটি পরে থাকেন৷

‘‘আমার মতে একজন মুসলিম নারীর পরিচয় হলো তাঁর হিজাব,'' বলেন তিনি৷ ‘‘এমনকি খেলাতেও নিজের শরীর ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি আমি৷''

মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে মেয়েদের ওপর পোশাক চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা যেমন দেখা যায়, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বে অনেকেই হিজাব পরা নারী দেখলেই ভাবেন তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছে৷ রাহায়ু কারো অনুভূতিতেই আঘাত করতে চান না৷ যার যার নিজস্ব পোশাক বেছে নেয়ার অধিকার আছে বলে তিনি মনে করেন৷

তিনি বলেন, ‘‘আমি বহুদিন ধরে হিজাব পরি৷ আমি মুসলিম প্রধান আমার দেশের হয়ে কিছু করতে পারছি তাতেও খুব গর্ববোধ করি৷ হিজাব পরা নারীরও বড় অর্জন থাকতে পারে৷'' তিনি যোগ করেন,‘‘বড় কথা হলো আমি কারো ক্ষতি তো করছি না৷''

এ বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার ইসলামিক স্কলার আলামসিয়াহ এম. দ্জাফর বলেন, নারীদের খেলাধুলায় অংশ নেয়ার অধিকার আছে৷ এমনকি তারা কী পোশাক পরবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারও আছে৷

‘‘নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পছন্দকে সম্মান দেখাতে হবে,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন দ্জাফর৷ ‘‘দ্বিতীয়ত, হিজাব বা বুরকা নিয়ে আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মত আছে৷ তৃতীয়ত, ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব পোশাকের ঐতিহ্য ও ইতিহাস রয়েছে৷ এর মধ্যে যারা হিজাব বা বুরকাকে বাধ্যতামূলক মনে করেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও সম্মান দেখাতে হবে৷''

আর রাহায়ু মনে করেন, খেলা হোক, পড়াশোনা হোক, কিংবা যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন, মেয়েদের ও ছেলেদের সমান সুযোগ থাকা উচিত৷

 

কবে হবে সমান সুযোগ?

এদিকে, মিরোনা যখন প্রথমবার ছেলেদের কোনো পেশাদার দলের প্রধান কোচ হবার খবর পান স্বভাবতই খুব উচ্ছ্বসিত হন৷ একইসঙ্গে কিছুটা অস্বস্তিও তৈরি হয়৷

‘‘আমার স্যার আমাকে বলেন, একজন মা যদি তাঁর সন্তানদের বড় করতে পারেন, তবে তুমি কেন পারবে না? বাইরের দেশে মেয়েরা করছে না? তুমি কেন পারবে না,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন তিনি৷ ‘‘আমি এতে অনুপ্রাণিত হই এবং ভাবি যে, হ্যাঁ আমিও পারব৷''

তাহলে কেমন ছিল প্রথম বছরটি? ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেবার পর প্রথম তিন মাস পর কিছুটা বিরতি পরে তাঁর৷ সেই তিন মাসে ১০টি ম্যাচ খেলে তাঁর দল৷ এর চারটিতে জয় পায় সিটি ক্লাব৷ আর তিনটিতে ড্র করে এবং তিনটিতে পরাজিত হয়৷

মাত্র ২৫ বছর বয়সে কোচের দায়িত্ব নেন মিরোনা৷ আর্থিক কারণে ২০১৫ সালে খেলোয়াড় ক্যারিয়ারের ইতি টানতে হয় তাঁর৷ মিরোনা বলেন, খেলোয়াড় থেকে কোচ পুরো পথটাই ছিল অনেক কঠিন৷

Bangladesch erste weibliche Trainerin der Herrenmannschaft

অনুশীলনের ফাঁকে বাংলাদেশের ফুটবল কোচ মিরোনা৷

‘‘আমাদের মত মুসলিম প্রধান দেশে এমনিতেই মেয়েরা খেলাধুলায় অনেক পিছিয়ে,'' তিনি বলেন৷ ‘‘সম্প্রতি অবশ্য মেয়েরা বয়সভিত্তিক থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ভালো করছে৷''

বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের জেলা বাগেরহাটের একটি গ্রামে জন্ম মিরোনার৷ শুরু থেকে পরিবার পক্ষে থাকলেও আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে তেমন সমর্থন পাননি তিনি৷

‘‘প্রথম বাধা আছে আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে৷ তারা বলত, মেয়েরা কেন ফুটবল খেলবে, ছেলেদের মতো ড্রেস পরবে বা মাঠে গিয়ে খেলবে৷ তারা স্বাভাবিকভাবে বিষয়টি নেননি,'' বলেন তিনি৷ পরে যখন মিরোনা একের পর এক সাফল্য আনতে লাগলেন তখন এলাকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে৷ ‘‘এখন তারা আমাকে নিয়ে গর্ব করে,'' বলেন তিনি৷

বাংলাদেশে শুরু থেকেই মেয়েরা খেলোয়াড়দের পোশাক পরেন৷ সবসময়ই বাধাগুলো ছিল সামাজিক পর্যায়ের৷ কিন্তু ২০০৩ সালে যখন মেয়েদের স্কুল ফুটবল চালু হয়, তখন কিছু রক্ষণশীল ইসলামিক গোষ্ঠী প্রতিবাদ শুরু করেন, যদিও তা ধোপে টেকেনি৷

বাংলাদেশি মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন সমাজের মানুষের সচেতনতার অভাব ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা হিসেবে৷

‘‘মেয়েরা এগিয়ে যাওয়ার পথে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাধা সবসময়ই ছিল৷ আগে হয়তো সামাজিক গণমাধ্যম ছিল না, তাই এতটা বোঝা যেত না,'' বলেন তিনি৷ ‘‘আগে তারা মেয়েরা কেন এত দেরি করে বাইরে থাকে, এমন যুক্তি দিতেন, এখন পোশাক নিয়ে কথা বলেন৷'' তবে ক্রীড়াক্ষেত্রে পোশাক-আশাক নিয়ে কখনো কথা ওঠেনি বলে জানান এলিনা খান৷

মিরোনাও মনে করেন, মেয়েদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে৷ কারণ, এই পথে বাধা পুরুষ সহকর্মীদের মানসিকতা৷

‘‘কোচদের প্রশিক্ষণ যখন শুরু হয় তখন অনেকে আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করতেন৷ তারা ভুলে যেতেন যে আমাদের কোচ হবার যোগ্যতা আছে৷ যেমন আমরা ২০-২৫ জন ট্রেনিং করতাম৷ সবসময় ৭ থেকে ১০ এর মধ্যে থাকতাম৷ এর অর্থ আমাদের চেয়েও খারাপ করতেন অনেক ছেলে কোচ৷''

মিরোনা তাঁর চলার পথে অনেকের মানসিকতা পরিবর্তন করতে পেরেছেন৷ সেই চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন৷

‘‘আমি খেলোয়াড়দের সবসময় বলি, তোমাদের সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে সেটা দেখোনা৷ দেখো কী তুলে ধরা হচ্ছে৷ সেটা অনুসরণ করো,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন মিরোনা৷

এই নারী বাংলাদেশের সেরা কোচদের একজন হতে চান৷ কোচ হিসেবে মেয়েদের ও ছেলেদের জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিতে চান৷

রাহায়ু ও মিরোনা, এই দুই নারীই তাদের স্বপ্নের শিখরে পৌঁছাতে চান৷ সেজন্য তারা চান সবার সহযোগিতা৷ তাদের আশা, সমাজ পোশাক দিয়ে নারীদের বিবেচনা করবে না, বিবেচনা করবে তাদের কাজ দিয়ে৷

 

গত বছরের ছবিঘরটি দেখুন: