1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

এম এ ইংলিশ চায়েওয়ালি

পায়েল সামন্ত কলকাতা
১১ নভেম্বর ২০২১

লকডাউনে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের কেউ কেউ ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে নজর কাড়ছেন৷ কারো চায়ের দোকান, কেউ দিচ্ছেন ফুচকার স্টল৷ চাকরিপ্রার্থীদের এই পেশা চয়ন কোন বার্তা তুলে ধরছে?

https://p.dw.com/p/42s2A
Indien | Opfer von Säureangriffen
ফাইল ফটোছবি: Payel Samanta/DW

কোভিড ও লকডাউনের জেরে শিল্প-বাণিজ্য থেকে অর্থনীতিতে সার্বিক মন্দা৷ সিএমআইই এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে দেশে কাজ হারাতে হয়েছে ৫০ লাখের বেশি মানুষকে৷ এদিকে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বিজ্ঞাপনের সংখ্যাও কম নেই চারপাশে৷ এই পরিস্থিতিতে কী করবেন শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী তরুণরা? নতুন চাকরির সুযোগ কমে আসায় কেউ কেউ পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন৷

সম্প্রতি এই কারণে নজর কেড়েছেন হাবড়ার টুকটুকি দাস৷ ইংরেজিতে এমএ পাশ করে তিনি রেল স্টেশনে চায়ের দোকান খুলেছেন৷ দোকানের নাম ‘এমএ ইংলিশ চায়েওয়ালি'৷ খড়দহের ইঞ্জিনিয়ার দেবজ্যোতি সাহা লকডাউনে গতবছর উপার্জনের তাগিদে ফুচকার দোকান খোলেন৷ এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্তর আলোচনা চলছে৷ সেই সঙ্গে উঠে আসছে অনিবার্য প্রশ্ন, কেন এ ধরনের পেশা বেছে নিচ্ছেন টুকটুকি-দেবজ্যোতিরা?

ভূগোলে  এমএ  খুঁজছেন  মাটি  কাটার  কাজ


এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে তাদের দিকে তাকানো যায়, যারা চাকরির প্রতীক্ষায় তারুণ্য অতিক্রম করে ফেলেছেন৷ এখনো তাদের লড়াই চলছে৷ ২০০৭ সালে ভূগোলে এমএ পাশ করেন সন্দেশখালির গীতশ্রী মান্না৷ ১৪ বছর পরেও সরকারি বা বেসরকারি চাকরি পাননি৷ অধিকাংশ চাকরির পরীক্ষায় বসার বয়স পার হয়ে গিয়েছে৷ তবু অন্য পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷ তার স্বামীর কাজ নেই৷ ফলে সংসারের ভার গীতশ্রীর কাঁধে৷ তিনি এখন হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করছেন৷ একটি সংগঠন থেকে পাওয়া সেলাই মেশিন চালিয়েও রোজগার করেন৷ মাটি কাটার কাজ করতে চেয়ে জব কার্ডের আবেদন করেছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে চাকরি নেই৷ নইলে এতো শিক্ষিত বেকার থাকবে কেন৷ আমি নিজেই দেখেছি বিএ পাশ ছেলে রিকশা চালাচ্ছে৷ আমি পড়তে ও পড়াতে ভালবাসি৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমার শিক্ষা না থাকলেই ভাল হতো৷"

সৌমিত্র মণ্ডল

বাড়ছে  মানসিক  অবসাদ

চলতি সপ্তাহে ধনেখালির এক গৃহশিক্ষক অভাবের তাড়নায় পরিবারের তিনজনকে হত্যা করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন৷ তিনি অবসাদগ্রস্ত ছিলেন৷ চাকরি না পাওয়া গোসাবার তরুণ সৌমিত্র মণ্ডলও কি অবসাদের শিকার নন? ভূগোলে অনার্স, বিএড পাশ সৌমিত্র একবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন৷ দুশ্চিন্তায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন তিনি৷ মাসিক মাত্র দু'হাজার টাকায় স্কুলে পার্শ্বশিক্ষকতার কাজ করছিলেন৷ লকডাউনে সেই কাজও চলে যায়৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, "সরকারি স্তরে পরীক্ষায় পাশ করেও আমার চাকরি হয়নি৷ স্কুলে নিয়োগ বন্ধ৷ বেসরকারি ক্ষেত্রেও চেষ্টা করেছি৷ সুবিধা হয়নি৷ প্রতিযোগিতার বাজারে আমরা কেউ পিছিয়ে নেই৷ কিন্তু আস্তে আস্তে নিজেরাই হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি৷"
স্থায়ী   সমাধান   কোথায়

সমস্যা সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবিশ ডয়চে ভেলেকে বলেন, "সরকারি স্তরে কর্মসংস্থানের সঙ্কোচন হয়েছে৷ স্থায়ী কর্মীদের অবসরের পর সেই জায়গায় কম পারিশ্রমিকে অস্থায়ী নিয়োগ করা হচ্ছে৷ অন্য দিকে ভারী শিল্প গড়ে উঠছে না৷ তা হলে অনুসারী শিল্পে বহু মানুষের কাজ হত৷ ফলে বেকারত্ব তীব্র হচ্ছে৷ যা সামনে পাচ্ছে, তাকেই আঁকড়ে ধরছে বেকাররা৷ ডোম পদের জন্যও তাই হাজার হাজার আবেদন জমা পড়েছিল৷"


যদিও অর্থনীতিবিদদের একাংশ বিষয়টি অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছেন৷ তাদের বক্তব্য, কোভিডজনিত বিপর্যয় যখন কাটিয়ে ওঠা যায়নি, সেই সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের খোঁজ স্বাভাবিক৷ অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকারের মতে, "সমাজের কিছু নির্দিষ্ট ধারণা থেকেই প্রচলিত চাহিদা, সরকারি চাকরি চাই৷ দেশের সামাজিক কাঠামো অনুযায়ী কে কী ধরনের কাজ করবেন, তা যেন গতে বাঁধা৷ এটি কর্মসংস্থান নয়, সমাজের সমস্যা৷ বাঁধা গতে না চললে বলা হয়, কিছুই যেন হল না জীবনে৷''

এই ধারণার সঙ্গে কিছুটা একমত টুকটুকি-দেবজ্যোতিরা৷ সমাজের চোখে তথাকথিত সম্মানজনক চাকরি না পাওয়ার হতাশা থাকলেও টুকটুকি বলেন, "শিক্ষিত হয়েও যে কোনও কাজে এগিয়ে আসা যায়, তাতে পিছপা হওয়া উচিত নয়৷'' দেবজ্যোতির বক্তব্য, "অন্য রাজ্যের তুলনায় কম চাকরি পশ্চিমবঙ্গে৷ তবে চাকরিই বা করতে হবে কেন? আমরা যেভাবে ব্যবসা করছি, সেটাও তো করা যেতে পারে৷" এখন দেবজ্যোতি চাকরি করছেন৷ তার ফুচকার দোকানে আরো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে৷ এই ফুচকার দোকান কি এই সঙ্কট পরিস্থিতিতে মডেল হতে পারে? রতন খাসনবিশের মতে, "এটা অল্প পরিসরে সাময়িক সমাধান৷ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়৷ এত বেকারের কর্মসংস্থানের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অবশ্যই দরকার৷"

দেবজ্যোতি সাহা