‘এত বছর জেল খাটলাম, আল্লাহ আমারে কিছু না কিছু দেবে’ | আলাপ | DW | 28.11.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সাক্ষাৎকার

‘এত বছর জেল খাটলাম, আল্লাহ আমারে কিছু না কিছু দেবে’

মেয়েকে বিষ দিয়ে হত্যার অভিযোগে জাবেদ আলীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ২০০১ সালে৷ পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেলেও রায়ের কপি জেলে না পৌঁছানোয় মুক্তি হয় না তার৷ ১৩ বছর পর অবশেষে ২০১৬ সালে ছাড়া পান তিনি৷

default

প্রতীকী ছবি

ডয়চে ভেলে: আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল কেন?

জাবেদ আলী: মামলা ছিল, মার্ডার৷ আমার সন্তান মারা গিয়েছিল৷ তারপর আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়৷ কেস দেয়ার পরে আমাকে জেলে ঢুকানো হয়৷ আমি সেভাবে জেল খাটি৷ সরকার বিচার করেছে৷ সাজা দিয়েছে ৩০ বছর৷ ৫০  হাজার টাকা জরিমানা করেছে৷ সাজার বয়স যখন দুই বছর, তখন হাইকোর্টে বিচারের পর কেসটায় খালাশ হয়ে যাই৷ লোকজনের অভাবে আমি কাগজপত্র দেখাশুনা করতে পারিনি৷ যশোরের লোকজন ধরে কাগজ তুলে হাইকোর্টে দেয়ার পরে দেখা যায় যে, ১৩ বছর জেল আমাকে বেশি খাটতে হয়েছে৷

আপনার মেয়ের বয়স কত ছিল? কীভাবে মারা গেল ও?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

মেয়ে যে কীভাবে মারা গেল সেটা তো সঠিকভাবে বলতে পারবো না আমি৷ কিন্তু মেয়েকে আমি মারিনি৷

মেয়ের মৃত্যুর জন্য আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকের আপনাকে কেন সন্দেহ হলো?

আমার স্ত্রী আগে মারা যায়৷ তখনই আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিল৷ সেটা করতে পারেনি৷ আমার সন্তান মারা যাওয়ার পর জোর করে আমার নামে মামলা করলো তারা৷ বিচারক জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কি দোষী না নির্দোষ? তো আমি বললাম, আমি নির্দোষ৷ আল্লাহই জানে, সরকার বিচার করলো৷ আমার তো লোকজন কেউ ছিল না৷ কেস হলে তো পয়সাকড়ি খরচ না করলে কোনো ফলাফল পাওয়া যায় না৷ নিম্ন আদালত আমাকে সাজা দিলো৷ কিন্তু হাইকোর্ট বিচার করলো৷ সরকার দেখলো যে আমি নির্দোষ৷ তখন আমাকে খালাস দিয়ে দিলো৷

আপনার কি সরকারি উকিল ছিল?

সব সরকারি উকিল ছিল৷ এখানেও ছিল, হাইকোর্টেও ছিল৷

এই যে হাইকোর্টে আপিল করা হলো, এটা কি আপনি আপিল করতে বলেছিলেন নাকি উকিল বিবেচনা করে করেছেন?

সাতক্ষীরার কোর্টে যখন সাজা হয়ে যায়, তখন জেলার সাহেবরে আমি বললাম যে, স্যার, আমার তো লোকজন নাই৷ খালি বৃদ্ধ মা আছে, চলাফেরা করতে পারে না৷ তো আমাকে একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেন৷ তারপর উনি একটা দরখাস্ত লিখে তিন-চার জায়গায় দস্তখত করিয়ে হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন৷ ওইটার কাগজপত্র যদি জেলগেটে চলে আসতো, তাহলে তো আমাকে ছেড়েই দিত৷ আসেনি, তাই আমাকে ছেড়েও দেয়নি৷ আমি তো লেখাপড়া জানি না, গণ্ডমুর্খ৷ এ জন্য আমি কাউকে কিছু জানাইনি৷

আপনি এখন কী করেন?

এখন আমি মাঠে কাজকর্ম করি৷ চলতে তো পারি না৷ টুকটাক যা পাই কাজ, সেটাই করি৷ 

অডিও শুনুন 09:37
এখন লাইভ
09:37 মিনিট

‘কেস হলে তো পয়সাকড়ি খরচ না করলে কোনো ফলাফল পাওয়া যায় না৷’

আপনার পরিবারে এখন কে কে আছেন?

আমার পরিবারে খালি আমার বুড়ো মা আছে৷

আপনার যে খালাশ হয়ে গেল, সেটা আপনি কীভাবে জেনেছিলেন? কার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন তখন?

যশোরের একজন লোক, নাম রশীদ....তার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম, ‘জামাই, এত বছর জেল খাটছি, এখন তো আমি পারি না আর৷ চোখে পানি আসে খালি বাড়ি যাওয়ার জন্য৷' তো কোনোরকমে কিছু পয়সাকড়ি ম্যানেজ করে উনার কাছে দিলাম৷ উনি কাগজপত্র তুলে আমার কাছ থেকে সই নিল৷ তারপর হাইকোর্টে গিয়ে আমার কাগজ তুলে দেখে যে, আমার খালাশ হয়ে গেছে৷

এর মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের কেউ আপনার সাথে যোগাযোগ করেনি?

না, জেলখানায় কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি৷ 

তার মানে, আপনি যদি লোক ধরে কাউকে হাইকোর্টে না পাঠাতেন, আপনাকে আরো জেল খাটতে হতো?

আমাকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত জেল খাটতে হতো৷

কার ভুলে এমন একটা ঘটনা ঘটলো? আপনি এ বিষয়ে বিচার চাননি?

এর আমি কিছুই জানি না৷ একমাত্র আল্লাহই জানেন৷

জেল থেকে চলে আসার পর আপনি কী করলেন?

এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে চলা শুরু করলাম৷ এখন ধার শোধ করছি৷ এখনও ১২ হাজার টাকা পাবে তারা আমার কাছে৷

আপনার কি একটাই সন্তান ছিল?

আমার দু'টো সন্তান৷ একজন মারা গেছে৷ আরেকজনকে বিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এক নাতনি হয়েছে, এক নাতি হয়েছে৷

আপনি কি জেল খাটার কারণে সামাজিকভাবে অপদস্থ হয়েছেন কখনো?

আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি৷ আমি অপদস্থ-টপদস্থ কিছুই বুঝি না৷ কিন্তু আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি৷ খুব দুঃখের মধ্যে দিন কাটাই৷

এই যে আপনি এত বছর জেল খাটলেন...

আমি চাইছিলাম, আমাকে কিছু টাকা পয়সা যদি দিত তাহলে আমি এই বৃদ্ধ বয়সে একটু শান্তিতে থাকতে পারতাম৷ আমার তো চলার মতো শক্তি নেই৷ আমি যখন জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসি, তখন সাংবাদিকরা আমার অনেক ছবি তোলে, পেপারে ছাপায়৷ তারপর টিভিতে দেখায় যে ২০ লাখ টাকা আমাকে দেবে৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত তো কিছু শুনলাম না৷ চোখের পানি ফেলে ফেলে ঘুরে বেড়াই৷

আপনি আর কোথাও যোগাযোগ করেননি?

হাইকোর্টে উকিল কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছিল৷ আমি বলেছিলাম, আপনি যদি কিছু করতে পারেন তাহলে আমার খুব উপকার হয়৷ আমি খুব অসুবিধার মধ্যে আছি৷ উকিলের নাম হলো অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান৷ তো ওই উকিল আমাকে বলেছে যে, কোনো সংবাদ পেলে আমাকে জানাবে৷ এরপর সেই উকিলের সাথে আমার আর কোনো কথা হয় নাই৷ এখন আপনারা যেভাবে হোক আমারে একটু সুযোগ-সুবিধা করে দেন৷

এই যে আপনাকে নিরপরাধ ঘোষণার পরও এতদিন জেলে থাকতে হলো, আপনার সেজন্য রাগ হয় না?

আমার রাগ হয় না৷ আমি জানি যে, এই যে আমি এত বছর জেল খাটলাম, তার জন্য আল্লাহ আমারে কিছু না কিছু দেবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও