এক নজরে ভারতের নির্বাচন কমিশন | আলাপ | DW | 06.11.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

এক নজরে ভারতের নির্বাচন কমিশন

ভারতের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাস থেকে বোঝা যায় কোন পথে বইছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি৷ এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতের নির্বাচন কমিশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক৷

সংসদীয় গণতন্ত্রের হিসাবে ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম৷ অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারের সংখ্যা অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি৷ কিন্তু জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীনও হতে হয় বেশি৷ ঠিক সেখানেই প্রয়োজন পড়ে একটি নিরপেক্ষ, দায়িত্বশীল ও কার্যকরী নির্বাচন কমিশনের৷

দেশভাগের পর স্বাধীন ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সালের ২৫শে জানুয়ারি গঠিত হয় প্রথম নির্বাচন কমিশন৷ প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুকুমার সেনের দায়িত্বে স্বাধীন ভারতের প্রথম দু’টি (১৯৫২ ও ১৯৫৭ সালে) সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়৷

নির্বাচন কমিশনে সংস্কার
১৯৯০ সাল থেকে বলা যায় ভারতের নির্বাচন কমিশনের এক নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিলো৷ এর আগে, নির্বাচন কমিশন বলতে ছিলেন শুধুই একজন প্রধান কমিশনার৷ কিন্তু পরে, ১৯৯০ সালে নতুন আইন প্রনয়ন করা হলে, অন্তত তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গড়ার প্রচলন শুরু হয়৷ আইন বদলের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন আর ভি এস পেরি শাস্ত্রী৷ তাঁর নেতৃত্বেই ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আসে অসংখ্য নতুন ধারা৷ ভোট দিতে পারার বয়েস কমিয়ে ১৮-তে আনার সাথে সাথে একাধিক সদস্যের নির্বাচন কমিশনের শুরুও শাস্ত্রীর আমলে৷

শাস্ত্রীর পর নির্বাচন প্রক্রিয়ার দায়িত্ব পান ভারতের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ভি এস রামাদেবী৷ কিন্তু খুব বেশিদিন তিনি সেই দায়িত্বে থাকেনি৷

রামাদেবীর পর নির্বাচন কমিশনের ভার নেন টি এন সেশন ও তাঁর অধীনেই (১৯৯০ থেকে ১৯৯৬) ভারতের নির্বাচনের সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আসে৷ তামিলনাড়ুর এই সাবেক প্রশাসনিক ক্যাডারকে অনেকে ‘চেঞ্জমেকার’ বা পরিবর্তনের রূপকার হিসেবে চেনেন৷ সেশনের নেতৃত্বে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আসে স্বচ্ছতা, করা হয় নির্বাচনী আইনের ব্যাপক সংস্কার৷ আমলাতান্ত্রিকতা ও রাজনীতিকদের একাধিপত্য থেকে মুক্ত করেছিলেন তিনি ভারতের নির্বাচনকে৷ পুলিশ-প্রশাসনের ওপর ক্ষমতা ধরে রেখে আইন শৃঙ্খলা ও গণতন্ত্রের রক্ষায় নামেন৷ টি এন সেশনের হাত ধরেই ভারতে শুরু হয় পরিচয়পত্রের প্রচলন - দুর্নীতিমুক্ত হয় বিশাল ভারতের তার চেয়েও বিশাল নির্বাচন ব্যবস্থা৷

সেশনের পরও কিছু বছর ধরে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার চলতে থাকে৷ ২০০১ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হন মেঘালয়ের আধিকারিক জে এম লিংডো৷ সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী, বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদীর সাথে তাঁর বিরোধ দেখা দিলেও সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০০২ সালের নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন হয়৷
ভারতের নির্বাচনে নিরপেক্ষতা ও পরিচ্ছন্নতা আনার পেছনে নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সংশয়ের সুযোগ খুব কমই ছিলো বলা যায়৷ পরবর্তীতেও নির্বাচন কমিশনের তৎপরতায় তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের ভোটাধিকার সহ আরো অনেক বদল আনা হয়৷ ২০১০ সালে ভারতের প্রথম সংখ্যালঘু নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নির্বাচিত হন এস ওয়াই কুরেশি৷ ২০১৫ সালে প্রবল মাওবাদী সংঘর্ষের মধ্যেও সংবাদমাধ্যমের বাড়তি নজর এড়িয়ে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয় নির্বাচন ভি এস সম্পতের কর্তৃত্বে৷ কিন্তু মূলত ২০০৯ সালের পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে শুরু করে৷

দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচন কমিশন
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভেতরে উঠতে থাকে নানা রকমের অভিযোগ৷ তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এন গোপালস্বামী তাঁরই সহকর্মী, আরেক নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ হবার অভিযোগ আনেন৷ তদন্তের পর জানা যায় যে সত্যিই তিনি নিয়মিত পরামর্শ চাইতেন কংগ্রেসে উচ্চপদস্থ নেতৃবৃন্দের কাছে৷ কিন্তু ক্ষমতায় তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার৷ দলের জোর খাটিয়ে গোপালস্বামীর অভিযোগকে সম্পূর্ণ দাবিয়ে দিতে সক্ষম হয় তারা৷ ক্রমেই কমে যেতে থাকে ভারতের নির্বাচনে কমিশনের একক অধিকার ও বাড়তে থাকে ক্ষমতার অপব্যবহার৷

তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অচল কুমার জ্যোতির পরিচালনায় ২০১৭ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে নতুন করে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে৷ বলা হয়, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনকালীন আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরোধিতা করলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একই আচরণকে তিনি এড়িয়ে যান৷

সংবিধান অনুযায়ী, ভারতের রাজনৈতিক গঠন কিছুটা যুক্তরাষ্ট্রীয় আদলে গড়া৷ ফলে, নির্বাচন কমিশনও রাজ্য ও কেন্দ্রের জন্য ভিন্ন৷ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ও পঞ্চায়েত ভোটের ক্ষেত্রে এই দুই কমিশনের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ কেন্দ্রীয় কমিশনের বলা সত্ত্বেও রাজ্য কমিশনের ক্ষমতাসীন দল, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি তুলনামূলকভাবে নরম মনোভাব নিয়ে চলেছিলো, যার ফলে বেশ কিছু ভোটকেন্দ্রের ফলাফল হয় সব গবেষণার থেকে আলাদা৷

আসন্ন ২০১৯
আগামী বছর ভারতে কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের সাথে সাথে পশ্চিমবঙ্গ সহ আরো কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন৷ স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ নাগরিক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনেক প্রত্যাশা৷ বিগত কয়েক বছর ধরে যেভাবে দলীয় ক্ষমতার প্রদর্শনে আক্রান্ত হয়েছে কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভারতের বৃহত্তর গণতন্ত্র চর্চা, তাতে আগামী নির্বাচনে কী হবে তা নিশ্চিত করে বলার অবকাশ এখনই নেই৷ যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনার৷ প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন থেকে একদম আলাদাভাবে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সদস্য নিয়োগ গোটাটাই ঘটে রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে, যার ফলে দলীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগও থাকে বেশি৷

তবুও আশা করা যায় যে সংবিধানে সেই জায়গাটুকু থাকার কারণে মুখ্য নির্বাচন কমিশন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা ভোটকেন্দ্রগুলির ওপর নজরদারী আরো কঠোরভাবে করতে সক্ষম হবে৷ ভুলে গেলে চলবে না, ২০১৪ সালে কমবেশি নিরপেক্ষ নির্বাচনের হাত ধরেই কংগ্রেস-ইউপিএ জোটকে পরাজিত করে ক্ষমতায় এসেছিলো বর্তমান বিজেপি-এনডিএ সরকার৷ ভোটবাক্স থেকেই জানা গিয়েছিলো কোন পথে চলেছে বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক দিশা৷ ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতবর্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে পারে জনতার মনোভাবের সঠিক বহিঃপ্রকাশ৷

একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র ভারতের গণতন্ত্র বজায় রাখার জন্যেই এখন প্রয়োজন, তা ঠিক নয়৷ যেভাবে সংস্কারের জোয়ার এনে গোটা উপমহাদেশে উদাহরণ হয়েছিলেন টি এন সেশনের মতো যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বরা, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি যেভাবে গণতান্ত্রিক আচরণ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, তা থেকে মুক্ত রাজনৈতিক চেতনাকে পুনরুদ্ধারের রাস্তা অবশ্যই সুস্থ নির্বাচনের সংস্কৃতি, যা একটি নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল নির্বাচন কমিশন ছাড়া দিবাস্বপ্ন৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন