এক গর্বিত বীরাঙ্গনার বিদায় | বিশ্ব | DW | 06.03.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

এক গর্বিত বীরাঙ্গনার বিদায়

তিনিই প্রথম নিজেকে প্রকাশ্যে ‘বীরাঙ্গনা' হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন৷ বলেছিলেন, ‘‘বীরাঙ্গনা লজ্জার নয়, গর্বের৷'' তিনি মুক্তিযোদ্ধা এবং ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী৷ অসম সাহসের পথ দেখিয়ে চলে গেলেন তিনি না ফেরার দেশে৷

মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে মারা যান ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী (৭১)৷ হাসপাতালের গণসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম লেলিন ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘তিনি কিডনি, ফুসফুসের রোগসহ কয়েকটি জটিল রোগে ভুগছিলেন৷ সর্বশেষ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন৷ দুপুর পৌনে একটার দিকে মারা যান তিনি৷''

২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন৷ এর আগে দুবার এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন৷ গত বছরের ৮ নভেম্বর বাসার বাথরুমে পড়ে গিয়ে আঘাত পান ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী৷ তার পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে৷

১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন করেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী৷ ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হন৷ পরবর্তীতে তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে বীরাঙ্গনা হিসেবে প্রকাশ করেন সাহস আর গর্ব নিয়ে৷ ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক' পান৷ ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷ তাঁর আত্মজীবনী  ‘নিন্দিত নন্দন' প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে একুশের বইমেলায়৷ এর বাইরে তিনি তেমন লেখালেখি করেছেন বলে জানা যায় না৷

অডিও শুনুন 05:33
এখন লাইভ
05:33 মিনিট

‘তাঁর কাছ থেকে আমি উপন্যাস লেখার আগে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব  করার চেষ্টা করি’

কিন্তু তার আগে ২০০৪ সালে উপন্যাসিক শাহীন আখতার ‘তালাশ' উপন্যাসে তুলে ধরেন এইবীর নারীর জীবন, যুদ্ধ আর সংগ্রাম৷শাহীন আখতার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘তাঁর সঙ্গে দিনের পর দিন আমি কথা বলেছি৷তাঁর কাছ থেকে আমি উপন্যাস লেখার আগে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব  করার চেষ্টা করি৷তিনি আমাকে দিনের পর দির সেই সব নারীর কথা শুনিয়েছেন,যাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন৷ বলেছেন, যুদ্ধশিশুদের কথা৷ তারপর তিনি আমাকে ধীরে ধীরে এক নারীর গল্প বলেছেন৷ তাঁর নির্যাতনের কথা বলেছেন৷ তাঁর কষ্টের কথা বলেছেন৷ তাঁর সংগ্রামের কথা বলেছেন৷ গর্বের কথা বলেছেন৷ কিন্তু সেই নারীর পরিচয় তিনি আমাকে তখনো বলেননি৷ অনেক পরে তিনি জানিয়েছেন, সেই নারী তিনি৷ তিনি বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী৷''

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার পাশাপাশি ১০ লাখ মা-বোন নির্যাতনেরও শিকার হন৷ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের সম্মানের নাম দেন ‘বীরাঙ্গনা৷' কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক কারণে কোনো নারীই তখন তাঁদের ওপর ওপর নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করতে চাইতেন না৷ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীই প্রথম নারী যিনি তাঁর ওপর নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করেন৷ বলেন, ‘‘বীরাঙ্গনা লজ্জার নয়, গর্বের৷'' 

তাঁর নামের সঙ্গেও যুক্ত করেন বীরঙ্গনা শব্দটি৷ বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করে  এক বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে৷ শাহীন আখতার বলেন, ‘‘তিনি যেখানেই যেতেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন৷ তিনি তেমন লেখেননি৷ তবে সাক্ষাৎকারে, আলাপে আলোচনায়, গল্পে মুক্তিযুদ্ধই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান৷ আমার সঙ্গে ৬-৭ মাস আগেও তাঁর দেখা হয়েছে৷ ওই মুক্তিযুদ্ধের কথাই বলেছেন তিনি৷ তাঁর মুক্তিযুদ্ধের কথা কখনো শেষ হবার নয়৷ আমিও যেন আরো অনেক কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম৷''

অডিও শুনুন 01:57
এখন লাইভ
01:57 মিনিট

‘উনি কখনো আশা করেননি কেউ তাঁকে কিছু দেবে’

তিনি ২০০০ সালে টোকিও ট্রাইবুন্যালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন৷ শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় থাকেন৷ গণ আদালতে নির্মম নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন৷ শাহীন আখতার বলেন,‘‘১৯৯৯ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের ত্যাগের কথা গর্বের সঙ্গে সবাইকে জানিয়ে দেবেন৷''

গত ১৫ বছর ধরে ফেরদৌসী প্রিয়ভাসিণী'র সঙ্গে নানাভাবে কাজ করেছেন সাংবাদিক উদিসা ইসলাম৷ তাঁর একাধিক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন৷ তাঁর কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা কথা জেনেছেন৷ জেনেছেন মুক্তিযুদ্ধে নারীদের কথা৷ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়ভাষিণী সম্পর্কে উদিসা বলেন, ‘‘তিনি তাঁর নির্যাতনের জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক অদম্য শক্তি অর্জন করেন৷ তিনি ছড়িয়ে দিতে চান মুক্তিযুদ্ধের কথা৷ নির্যাতনের কথা৷ ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চ যখন হয়, তখন তাঁর শরীর খারাপ ছিল৷ কিন্তু তিনি সেখানে হাজির হন৷ মঞ্চে বসে কথা বলায় তাঁর আগ্রহ ছিল না৷ তিনি ওই এলকায় ঘুরে ঘুরে  তরুণদের সাথে কথা বলতেন৷ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতেন৷ সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেন৷''

উদিসা আরো বলেন,‘‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সরব হয়, তখনই মূলত ফেরদৌসি প্রিভাষিণী সরব হন৷ নিজেকে প্রকাশ করেন৷ প্রকাশ করেন হায়েনাদের বর্বরতার এক কালো অধ্যায়ের কথা৷''

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী কোনো স্বীকৃতির জন্য কিছু করেননি৷ তিনি চাইতেন মুক্তিযুদ্ধের কথা মানুষ জানুক৷  মুক্তিযুদ্ধের কথা ছড়িয়ে পড়ুক৷ ২০১৬ সালে সরকার ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে৷ এর আগে আরো ১২২ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হয়৷ তাঁর কাছের এবং সংগ্রামের সহযোগী খুশি কবিরের ভাষায়, ‘‘এত দেরিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় প্রিয়ভাষিণীর মধ্যে কোনো আক্ষেপ ছিল না৷ তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন৷ তাঁর কথা ছিল, আমি যা আমি তাই৷ উনি সারাজীবন লড়াই করেছেন৷ আর আমরাও ওনার জন্য লড়াই করেছি তাঁকে ভালোবেসে৷ উনি কখনো আশা করেননি কেউ তাঁকে কিছু দেবে৷ উনি যা করেছেন ভালোবেসেই করেছেন৷''

অডিও শুনুন 03:47
এখন লাইভ
03:47 মিনিট

‘তিনি তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতেন, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেন’

খুশি কবির বলেন, ‘‘একটা সময় ছিল বীরাঙ্গনা বলতে গরিব নারীদের চিত্রিত করা হতো৷ সহায়-সম্বলহীন নারীদের চিত্রিত করা হতো৷ কেউ এটাকে লজ্জার চোখে দেখতো৷ কিন্তু তিনি সেই ধারণা ভেঙে দেন৷ নিজেকে প্রকাশ করেন বীরাঙ্গনা হিসেবে৷ বলেন, বীরাঙ্গনা লজ্জার নয়, গর্বের৷''

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও তিনি ভাস্কর হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন৷ খুশি কবির বলেন, ‘‘তাঁর ভাস্কর্য হলো প্রাণ সঞ্চারী৷ তিনি এখন টুকরো কাঠ বা গাছের একটি শিকড় বা এক টুকরো কাচকে জীবন দিতেন৷ তাঁর হাতের ছোঁয়ায় তা প্রাণ পেতো৷ সৌনন্দর্যের নতুন দিক উন্মোচিত হতো৷ হয়ে উঠতো ভাস্কর্য৷ গভীর জীবনবোধের ভাস্কর তিনি৷''

উদিসা ইসলাম বলেন, ‘‘ঢাকায় আসার আগে তিনি মফস্বল শহরে থাকতেন৷ নিজের বাগানে অবহেলায় পড়ে থাকা কাঠ, শিকড়কে তিনি নতুন রূপ দিতেন তখন থেকেই৷ তাঁর ভাস্কর্য ভিন্নমাত্রার জীবনবোধের৷''

এই বীর নারী,বীরাঙ্গনা, এই মহান ভাস্কর চলে গেলেন৷ কিন্তু যাঁরা তাঁকে ভালোবাসেন, তাঁদের মনে আফসোস আছে৷ আছে ক্ষোভ৷ তাঁদের কথা জীবন থেকে তো চলে যেতেই হয়, কিন্তু দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য নেয়া হলে হয়তো আরো কিছুদিন তাঁকে পাওয়া যেতো৷ হয়তো আরো কিছুদিন শোনা যেতো তাঁর জীবনের গল্প, সাহসের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প৷

প্রিয়ভাষিণীর প্রথম জানাজা হয়েছে পিংক সিটি জামে মসজিদে৷ মাগরিবের নামাজের পর হাফেজ মাওলানা জুনায়েদ আহমেদ জানাজা পরিচালনা করেন৷ পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও তাঁকে দেখতে আসা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এতে অংশ নেন৷ জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ ল্যাবএইড হাসপাতালের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে হিমঘরে মরদেহ রাখা হবে বলে জানিয়েছেন প্রিয়ভাষিণীর বড় ছেলে কারু তিতাস৷

এদিকে কবি আব্দুস সামাদ জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা এবং ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মরদেহ বৃহস্পতিবার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর মামা প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাজিম মাহমুদের কবরে সমাহিত করা হবে৷

পরিবারসূত্রে আরও জানা যায়, প্রিয়ভাষিণীকে দেখতে তাঁর ছোট ছেলে তুর্য থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে বুধবার রাত ১২টায় ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন।

প্রতিবেদনটি কেমন লাগলো? জানান নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও