একজন পুলকার চালক যেভাবে ‘হসপিটাল ম্যান’ হয়ে উঠলেন | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 22.01.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

একজন পুলকার চালক যেভাবে ‘হসপিটাল ম্যান’ হয়ে উঠলেন

তিনি সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পরিবারের মুখে তুলে দেন খাবার৷ দরিদ্র, অসহায় পরিবারগুলিকে এই করোনা পরিস্থিতিতেও খাবার দিয়ে সাহায্য করেছেন৷ শহর কলকাতার একজন পুলকার চালক হয়ে উঠেছেন ‘হসপিটাল ম্যান’৷  

দক্ষিণ কলকাতার তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালে খাবার বিলি করেন পার্থ কর চৌধুরী

দক্ষিণ কলকাতার তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালে খাবার বিলি করেন পার্থ কর চৌধুরী

সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পাশে থাকতে হয় তাদের বাড়ির লোকেদের৷ দিনভর চিকিৎসা সংক্রান্ত দৌড়াদৌড়িতে সময় চলে গেলে তাদের আর খাওয়ার সময় মেলে না৷ তাছাড়া চিকিৎসা ব্যয়ে জর্জরিত পরিবারগুলির খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্যও অনেক সময় থাকে না৷ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশে বিপুল জনসংখ্যায় রোগীর পরিবারকে খাবার জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফেও করা হয়নি৷ তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোগীর খাবার থেকেই ভাগ নিচ্ছেন পরিবারের মানুষজন৷ এতে রোগীর পুষ্টির ঘাটতি হয়ে যায়৷ 

সমস্যাটা নিয়ে বিচলিত হয়েছিলেন দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট এলাকার বাসিন্দা পেশায় পুলকার চালক পার্থ কর চৌধুরী৷ তিনি পাঁচ বছর লাগাতার ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনটি সরকারি হাসপাতালের সামনে রোগীর পরিবারের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিয়েছেন বিনা পয়সায়৷ কোভিড পরিস্থিতিতে এ সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছিল৷ লকডাউনে খাবার দোকান বন্ধ৷ অসহায় মুখগুলির জন্য রান্নার ব্যবস্থা করেন পার্থ৷ কোভিডের সময় সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে সেবা করতে গিয়ে কোভিড আক্রান্তও হয়েছিলেন তিনি৷ তবুও বিরতি নেই তার কাজে৷ হয়ে উঠেছেন শহর কলকাতার মানবিক মুখ ‘হসপিটাল ম্যান’৷

দক্ষিণ কলকাতার তিনটি বড় সরকারি হাসপাতাল, এসএসকেএম, শম্ভুনাথ পণ্ডিত আর চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতালের সামনে একাকী ৫২ বছর বয়সি পার্থকে খাবার বিলি করতে দেখা যাবে দিনের তিনটি সময়ে৷ ডয়চে ভেলেকে পার্থ বলেন, ‘‘২০১৬ সালে আমি নিজেই সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম৷ রোগীর পরিবারের মানুষদের দেখেছি খুব কাছ থেকে৷ সরকারি হাসপাতালে আর্থিক অবস্থা তো বটেই, উপরন্তু দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়েও খাবার খাওয়া হয় না৷ তখনই আমি ওদের খাবার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই৷’’

অডিও শুনুন 06:35

রোগীর পরিবারের মানুষদের দেখেছি খুব কাছ থেকে: পার্থ কর চৌধুরী

আমাদের রাজ্যে ইতিমধ্যে শ্রমজীবী ক্যান্টিনে ২০ টাকায় এবং মা ক্যান্টিনে পাঁচ টাকায় পেট ভরে ভাত খাওয়ার পরিষেবা শুরু হয়েছে৷ কিন্তু সবাই কি তাতে লাভবান হয়েছে? প্রশ্ন করেন পার্থ৷ তিনি মনে করেন, ‘‘রেকি করে দেখার প্রয়োজন আছে, কাদের প্রয়োজন যথার্থ৷’’ বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁ থেকে বাড়তি খাবার সংগ্রহ করেছেন পার্থ, কখনো নিজেই খাবার ব্যবস্থা করেছেন৷ পার্থ বলেন, ‘‘বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে রাত ১২ টা- ১টা বেজে গিয়েছে৷ তখনও দেখেছি অত রাতেও কিছু মানুষে খাবারের প্রত্যাশায় বসে আছেন৷’’ কিন্তু কোভিড পরিস্থিতিতে যখন দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেল, তখন কলা, বিস্কুট, মুড়ির মতো শুকনো খাবার দেওয়া শুরু করলেন৷ এরপর মানুষই পার্থর পাশে এসে দাঁড়ান৷ চাল, ডাল পেতে শুরু করলেন৷ তা দিয়ে রান্না করে খাবার নিয়ে যেতে লাগলেন৷ এভাবেই বছরভর, রোজ প্রায় দেড়শ মানুষকে সেবা দিয়ে চলেছেন ‘হসপিটাল ম্যান’ পার্থ৷

জনস্বাস্থ্যের চিকিৎসক অলোক বিশ্বাস বলেন, ‘‘রোগীর পরিবার এই কষ্টটা একদিন নয়, মাসের পর মাস ধরে ভোগ করেন৷ আমি দেখেছি, লিভার বা হার্টের রোগীকে বাঁচাতে গিয়ে তার পুরো পরিবারটাই ভেসে যায়৷ আমাদের দেশে এমন একটা সরকারি পরিষেবা থাকা উচিত ছিল, যেখানে সহজে রোগীর পরিবার খাবার পেতে পারেন৷'' অর্থাৎ যে ব্যবস্থা সরকারের করা উচিত ছিল, সেটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ করে চলেছেন ‘হসপিটাল ম্যান’৷ তবে খুব সহজেই তিনি সরকারি হাসপাতালের রোগীর পরিবারের মুখে খাবার ধরতে পারছেন, এমনটা নয়৷

হাসপাতালের পাশে থাকা খাবারের দোকানগুলি পার্থর বিরোধিতা করেছে কখনো, কখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সীমানা থেকে বের করে দিয়েছেন, কখনো পুলিশি হাঙ্গামা৷ এমনকি কোভিড পরিস্থিতিতে হাসপাতালে যাতায়াত করতেন বলে পাড়া থেকেও তাকে একঘরে করে রাখা হয়েছিল৷ কোনো কিছুতেই পিছু হঠেননি তিনি৷ একসময় স্কুলের পুলকার চালক পার্থ প্রথমদিকে স্কুলের দায়িত্ব পালন করে হাসপাতালে খাবার বিলি করেছেন৷ এরপর কোভিডে স্কুলের কাজ হারালেও তার সেবাকাজ থামে না৷ জমানো টাকার ভাণ্ডার থেকে খরচ করে খাবারের ব্যবস্থা করতেন৷ সেটা ফুরিয়ে গেলেও তিনি হাল ছাড়েননি৷ এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন৷ ঋণের টাকাতেই এখন গাড়ির তেল, রান্নার খরচ চালান৷ ক্রাউড ফান্ডিংয়ে বিশ্বাস তার নেই৷ মানুষ দিতে চাইলে তবেই তিনি নেন সাহায্য৷ ভবিষ্যতে হসপিটাল ম্যান সারাজীবন এইভাবে রোগীর পরিবারের মুখ খাবার তুলে দিতে কমিউনিটি কিচেন গড়ে তুলতে ইচ্ছুক৷

ইতিমধ্যে কোভিড পরিস্থিতিতে কিছু দুঃস্থ পরিবারকে রেশন তুলে দিয়েছেন, খুলেছেন বিনামূল্যে মেডিকেল পরিষেবার ব্যবস্থা৷ চিকিৎসক বিশ্বাস বলেন, ‘‘এইভাবে ব্যক্তিগতভাবে পার্থদার এগিয়ে আসা একটা বিরাট মহৎ কাজ৷ এমন কাজ আর কেউ করে না৷ পুরো একাকী যেভাবে তিনি কাজটা করেন, সেটা অতুলনীয়৷’’

নির্বাচিত প্রতিবেদন