এই ‘বার্নড আউট′ সমাজ লইয়া আমরা কী করিব? | বিশ্ব | DW | 19.03.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

এই ‘বার্নড আউট' সমাজ লইয়া আমরা কী করিব?

এক রকমের দোনোমনা, অনিশ্চয়তা নিয়েই চত্বরে পা রাখলো তরুণ৷ তার মানসপটে যে ছবিগুলো আঁকা ছিল, তার সঙ্গে খুব একটা মিলছে না৷

বাইরের রিক্সার টুং টাং শব্দ, গাড়ির হর্ন আর লম্বা করিডোরের দেয়ালে বা পাশে বসে-দাঁড়িয়ে থাকা আপু-ভাইয়াদের কল কল করে কথা বলে যাওয়ার টুকরো টুকরো শব্দ, সব মিলিয়ে যে দ্যোতনা তৈরি হয়েছে, তাতে বুকের ভেতর দুরু দুরু শব্দটা চাপা পড়ছে না৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন৷ রুম নম্বর যেন কত? যাক, শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল৷ মাঝারি সাইজের সাদা দেয়ালে ঘেরা একটা রুম৷ ঢুকতে হয় বিশাল পুরোনো সবুজ দরজা ঠেলে৷ ভেতরে কালচে বাদামি বেঞ্চগুলোতে কয়েক ডজন ছেলে মেয়ে বসে আছে৷

অনিশ্চয়তা দিয়ে শুরু হলেও শেষশেষ প্রথম দিনটি ভালোই গেল৷ কয়েকজন বন্ধু পাওয়া গেল৷ আর বড় ভাইয়া-আপুরা ফ্রেশার্স রিসেপশনটি এত সুন্দরভাবে করলেন, মনটাই ভালো হয়ে গেল৷ ঠিক করলো, সে এখানেই থাকবে৷ সাবজেক্ট বা প্রতিষ্ঠান বদলাবে না৷ কারণ, তার কলেজের বন্ধুরা একেকজন ‘ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে, ভালো সাবজেক্টে' ভর্তি হয়ে গেছে৷ সে হয়ত তাদের মতো ‘ভালো সাবজেক্ট' পায়নি৷ তবে এখানেই তাকে অনেক ভালো করতে হবে৷

ওপরের গল্পটি তরুণ আমাকে বলেছিল৷ সে গিটার ভালোবাসে৷ কিন্তু ‘ভালো' করার লড়াইয়ে সেই গিটার ভুলে গেছে৷ কেন হবে না? বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার বাইরে সে ফ্রেঞ্চ ভাষা শেখে, আর শেখে ওয়েব ডিজাইনিং৷ জিআরই-আইইএলটিএস এগুলোরও প্রিপারেশন এখন থেকেই নিতে হবে৷ তাই সময় নেই৷ তরুণের ছোট ভাই অরুণ পড়ে আইডিয়াল স্কুলে৷ তার এসব গিটার-ফিটার ভালো লাগে না৷ কিন্তু সে ভালোবাসে ক্রিকেট৷  কিন্তু স্কুলের পড়া আর মায়ের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে ক্রিকেট খেলাটা সেভাবে আর হয়ে ওঠে না৷

ক'দিন আগে আমার খুব কাছের এক বন্ধু ফোন করলেন৷ কী-সব জীবনানন্দ-বিজয়গুপ্ত-হুমায়ুন আজাদ আওড়িয়ে শেষমেষ যা বললেন, তার অর্থ করলে এই দাঁড়ায়, জীবন আর আনন্দময় নেই৷ সন্তুষ্টির বড় অভাব৷ তিনি খুব ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন৷ খদ্দেরদের কাছে এই প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনেক৷ তাঁর কাজের সুনামও ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে৷ খাটেনও খু্ব৷ অফিসে থাকেন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা৷ কিন্তু প্রতিমুহূর্তে সেই একই চর্বিতচর্বন, সৃজনশীলতার চেয়ে উৎপাদনের সংখ্যায় বেশি প্রাধান্য৷

ওপরের যে ঘটনাগুলো, কোনোটাই আমাদের অজানা নয়৷ আমাদের চারপাশেই শুধু ঘটছে তা নয়, আমাদের সঙ্গেই বরং ঘটছে৷ আমরা সামাজিকভাবে একরকম রেসের মধ্যে আছি৷ শিক্ষাজীবনেও রেস, চাকুরি-ব্যবসা সব কিছুতেই দৌঁড়াচ্ছে সবাই৷ আমাদের দৈনিক জীবনের  দুই তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি পড়াশোনা অথবা কাজ করতে করতে কেটে যাচ্ছে৷

আমার বাসায় একটা বয়লার আছে৷ সেই বয়লার পানি গরম ও রুম হিটিংয়ের কাজ করে৷ এতে মাঝে মাঝে চাপ বেড়ে যায়৷ সেই চাপ বেড়ে গেলে তা বের করে দেয়া বাধ্যতামূলক৷ না হলে ‘বার্ন আউট' হবার আশঙ্কা থাকে৷ আসলে আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে৷ প্রচুর কাজ বা পড়াশোনা করতে করতে একরকম মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে৷ আমরা বুঝতে পারছি, কোথাও সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু গুরুত্ব দিচ্ছি না৷ তাই সেই চাপও বের করছি না, অথবা কাজ-পড়াশোনার গ্যাঁড়াকলে এমনই ফেঁসে যাচ্ছি, যে বের হতেও পারছি না৷ ফলে ‘বার্নড আউট' হচ্ছি৷

এতে কী ক্ষতি হচ্ছে? আমাদের মাঝে অসহনশীলতা বাড়ছে৷ রিক্সাওয়ালাকে চড় মারছি৷ রাস্তায় কেউ গালি দিলে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছি৷ মেয়েদের ধর্ষণ করছি৷ বিরোধী মত শুনতে চাচ্ছি না৷ এক রকমের ‘অসহনশীলতা' বিরাজ করছে আমাদের ‘বার্নড আউট' সমাজে৷

উন্নত দেশগুলোতে বিষয়গুলো এমন যে নয়, তা অনেকেই জানেন৷ এখানে বিনোদনের অনেক মূল্য৷ বাচ্চারা বন্ধের দিনেও স্কুলে যেতে চায়, কারণ সেখানে খেলার অবারিত সুযোগ৷ খেলতে খেলতেই শেখে৷

তবে এ অবস্থা যে শুধু আমাদের দেশেই তা কিন্তু নয়৷ আমার এখানকার ভারতীয় বন্ধুদের কাছে শুনেছি, কী ভীষণ লড়াই করতে হয় তাদের চাকরির বাজারে৷ তাই প্রচুর চাপ৷

Bdnews-Deutsche Welle Talkshow

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

এ নিয়ে কিছু গবেষণা ঘাটছিলাম৷ দেখলাম, কোনো দেশ যখন অর্থনৈতিক পরিবর্তনের (ইকনোমিক ট্রানজিশন) মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার একটা ‘হিউম্যান কস্ট' তৈরি হয়৷ যেমন ১৯৮৯ সালের পর থেকে পোস্ট-কমিউনিস্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে বাজার অর্থনীতিতে যখন রূপান্তর হচ্ছিল, তখন তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে৷ সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক ঘাটতি মিটতে শুরু করে৷ কিন্তু সমাজে অসমতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়৷ চাকরির বাজারে ন্যায্যতা থাকে না, মাদকাসক্তি বাড়ে, সর্বোপরি মানুষের মাঝে সুখ বা খুশি থাকার বিষয়টি হ্রাস পায়৷ এই গবেষণা শুধু কমিউনিস্ট দেশগুলোর বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরের ওপর করা হলেও সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোতেও এই উপাদানগুলো চোখে পড়ে৷ তাই বাংলাদেশ বা ভারতের মতো দেশগুলোর সমাজে নিত্যদিন ‘বার্নড আউট'-দের দেখা যায়৷

রেস থেকে হয়ত আমরা হুট করে বের হতে পারব না৷ কিন্তু চাইলে তো কিছুটা সচেতন হতে পারি৷ মনের চাহিদাকে কিছুটা হলেও গুরুত্ব দিতে পারি৷ অফিসে সপ্তাহে পাঁচ-ছয়দিন ১০-১৫ ঘণ্টা সময় দিয়ে আদতে কী লাভ হচ্ছে, তার কস্ট-ইফেক্ট অ্যানালাইসিস করা উচিত৷ কাজ করতে করতে যে ভীষণ চাপ তৈরি হচ্ছে মনের মধ্যে, তা বের করে দিতে হবে৷ সেজন্য প্রতিদিন সেই ১০-১৫ ঘণ্টা থেকে যদি দু'টি ঘণ্টা এই কাজে ব্যয় করা যায়, তা-ও মন্দ নয়৷ যেমন তরুণ যদি সবকিছুর পরও তার পছন্দের গিটারটি বাজাত, কিংবা অরুণ ক্রিকেট খেলাতেও মনোযোগ দিত, কিংবা আমার যে বন্ধুটি ছবি তুলতে পছন্দ করেন, তিনি তাতে সময় ব্যয় করতেন কিছুটা, তাহলে হয়ত চাপটা বের হয়ে যেত৷

আর গবেষণা বলে, অন্য কাজগুলোও তখন আরো ফলদায়ক হত৷ যেসব অফিস সপ্তাহে ছ'দিন কর্মীদের দিয়ে কাজ করায়, তারা সেই কর্মীর শ্রমের সেরা ফসল কখনো পাবে না, তা প্রমাণিত৷ শুধু তাই নয়, দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করালেও একই ফল৷

গুগলের মতো পৃথিবীর সেরা অফিসগুলোতে কর্মীরা এই আট ঘণ্টার মধ্যে চাইলে যেন একটু ঘুমিয়েও নিতে পারেন যেন, সে ব্যবস্থাও আছে৷ বিনোদনের ব্যবস্থা তো আছেই৷ বিনোদন পার্কে যেমন স্লাইডিং থাকে, অনেক অফিসে ওপর তলা থেকে নীচের তলাতে নামতে তেমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে৷ নিছক মজা করার জন্য এগুলো করা হয়েছে, ভাবলে ভুল হবে৷ এরা প্রথাগত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছেন৷ বিনোদন বা চাপ নিঃসরণের জন্য ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন৷ আর দেখুন তাদেরই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি৷

পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তাই৷ দিনে কয়েক ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়া আর ১২-১৫ ঘণ্টা পড়ার পেছনে ছোটা দু'টোর মধ্যে অনেক তফাত৷ ‘হিউম্যান কস্ট' মেনে নিয়েও এর একটা বিহিত করা করতে হবে৷ না হলে, এই ‘বার্নড আউট' সমাজ লইয়া আমরা কী করিব?

আপনারও কি এমন মনে হয়? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন