উর্দু লাইব্রেরিতে গীতা, রামায়ণ অনুবাদ | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 02.02.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

উর্দু লাইব্রেরিতে গীতা, রামায়ণ অনুবাদ

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে ভারত৷ কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক উস্কানি সে সব ম্লান করে দিচ্ছে৷ এর মধ্যেই কলকাতার এক অখ্যাত গলিতে সম্প্রীতির বার্তা ছড়াচ্ছে একটি উর্দু লাইব্রেরি৷

জাকারিয়া স্ট্রিটের মহম্মদ সাহজাহান সকাল থেকে মুদিখানার ব্যবসা সামলে সন্ধেয় আসেন লাইব্রেরিতে৷ সেই কবে উর্দু মিডিয়ামে পড়ার সময়ই দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা নিয়েছিলেন৷ বাংলার প্রতি ভালোবাসাটা এখনো আছে৷ তাই ১৮ বছর আগে পড়া রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির প্রতি এখনও টান অনুভব করেন৷ মহম্মদ আলি লাইব্রেরিতে বসে তিনি অবলীলায় আলোচনা করতে পারেন কাজী নজরুল অথবা তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে৷

গীতা, রামায়ণ, মহাভারত তাঁর পড়া হয়নি৷ কিন্তু বেদের একখণ্ড তাঁর পড়া হয়ে গিয়েছে৷ এই লাইব্রেরিতে উর্দু ভাষায় রয়েছে এসবের অনুবাদ৷ তাই ইচ্ছে করলেই জানা যায় হিন্দু মাইথোলজি৷ তাঁরই মতো কানাই শীল স্ট্রিটের মহম্মদ আলি লাইব্রেরিতে রোজ সন্ধেয় উপস্থিত হন উর্দুভাষী আফসার সামসুর বা ফরাগ রোহ্‌বি৷ পান চিবোতে চিবোতে আফসার বলেন, ‘‘২০ বছর ধরে এখানে আসি৷ এখানে আগে বাংলা খবরের কাগজ আসত নিয়মিত৷ সেগুলো পড়তাম৷ এখানে এখন অন্য বই পড়তেই আসি৷''

উর্দু কবি ফরাগ৷ তাঁর নিজের একটি প্রকাশনাও আছে৷ তিনিই বললেন, ‘‘এই লাইব্রেরিতে আপনি উর্দুতে রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবতগীতা কিংবা বেদও পাবেন৷ আমি গীতা পড়েছি তো৷ রামায়ণ, মহাভারত থেকে জিজ্ঞেস করুন, বলে দেবো৷''

আ-মরি বাংলা ভাষা

জাকারিয়া স্ট্রিট আর কলুটোলা লেনকে জুড়েছে কানাইশীল স্ট্রিট৷ ৪৪ নং ওয়ার্ডের এই রাস্তার ঘিঞ্জি ফুটপাতে দাঁড়ালেই চোখে পড়বে মহম্মদ আলি লাইব্রেরি৷ ১৯৩০ সালে স্থাপিত এই লাইব্রেরি আজও সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগেই চলে আসছে৷ রোজ সন্ধে ছটায় শুরু হয়ে যায় এদের রোজকার আনাগোনা৷ চাঁদনি চক থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের আশপাশে এই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বহু উর্দু ভাষাভাষী মানুষ থাকেন৷ সে হিসেবে বাংলাভাষী মানুষই বরং কম৷ মহম্মদ আলি লাইব্রেরিতে এলে দেখা যায়, রোজ কত উর্দুভাষী মানুষ বাংলার কবি-লেখকদের নিয়ে আলোচনা করছেন৷ অবিশ্বাস্য লাগলেও এটা সত্যি৷ এতেই মুছে যায় যত বিভেদের প্রচার৷ ফরাগ রোহ্‌বি উর্দুতেই বলছিলেন, ‘‘বাংলা সাহিত্যের পরিসর বিপুল৷ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কি বিভেদের কথা বলেছেন! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কত সুন্দর! সাধারণ মানুষ মোটেই বিভেদে বিশ্বাস করে না৷ বিভেদ ঘটায় রাজনীতির লোকেরা৷ সাহিত্য আমাদের নিজেদের দেশ, সংস্কৃতি চিনতে ও জানতে শেখায়৷''

অডিও শুনুন 05:23

‘গীতা, রামায়ণ, মহাভারত পড়া না হলেও বেদের একখণ্ড পড়া হয়ে গিয়েছে’

ফরাগ জানালেন যে, তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে বাংলা ভাষা থেকে উর্দুতে অনুবাদ করেছেন৷ এ জন্য বেছে নিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে৷ তেমনই উর্দু সাহিত্যও অনুবাদ করছেন বাংলায়৷ এভাবেই একে অপরের সংস্কৃতিকে চেনার ও জানার চেষ্টা করছেন তাঁরা৷ তাই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা'  উর্দু অনুবাদে হয়ে দাঁড়ায় ‘শাহে বেলিবাস'৷ রাজশেখর বসু, সমরেশ বসু, বনফুলের ছোট গল্পও হয়েছে উর্দুতে অনুবাদ৷

কিন্তু এইসব অনুবাদ করতে গিয়ে বাংলার সংস্কৃতি বা আচার চিনতে অসুবিধা হয়? অনুবাদক সাব্বির আহমেদ বললেন, ‘‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়' তো তখনকার বাংলা সমাজ নিয়ে লেখা৷ এই বাংলাতেই তো আমরা আছি৷ অচেনা লাগবে কেন? ইদানিংকার অনেক কবি সাহিত্যিকরা উর্দুতে অনুবাদের জন্য বলেন৷ সেটাও করব৷''

তাহলে কি বাংলা সাহিত্যের চাহিদা রয়েছে? সাব্বির বলেন, ‘‘হ্যাঁ, উত্তরপ্রদেশ, বিহারে এমনকি পাকিস্তানে এই উর্দু অনুবাদের জনপ্রিয়তা আছে৷ উর্দু আকাডেমি এসব কাজে উৎসাহ দিচ্ছে৷ রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি বা ছোট গল্প উর্দুতে খুব সমাদৃত৷ তাই এবার আমরা ৪০০ পাতায় ছোটদের রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছিলাম৷ সবাই খুব ভালোবেসেছে৷''

অনুবাদের ভরসায়

নিজের ধর্মের পাশাপাশি পড়শীর ধর্মকে জানতে অনুবাদই ভরসা৷ বাংলায় যা আছে, তা উর্দুভাষীরা জানছেন উর্দুর মাধ্যমে৷ আর উর্দুর রত্নভাণ্ডার উন্মোচিত হচ্ছে বাংলায়৷ এসব শুধু আজকের কাজ নয়৷ অনেক আগে থেকেই এসব কাজ যে শুরু হয়ে গেছে, তার বহু নমুনা ছড়ানো রয়েছে মহম্মদ আলি লাইব্রেরিতে৷ লাইব্রেরির এদিক-ওদিক তাকালেই চোখে পড়বে নানা অনুবাদকের অনূদিত রামায়ণ, বেদ৷ এসবের খোঁজেই কি সব পাঠক আসেন? লাইব্রেরিতে উপস্থিত দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া মহম্মদ ফৈজ বললেন, ‘‘আমি খবরের কাগজ পড়তে আসি৷ এখানে সিলেবাসের কিছু পাওয়া যায় না৷ ম্যাগাজিনও পড়ি৷ আমি জানি না এখানে কি অনুবাদের বই আছে৷ পড়ার বইপত্র তেমন দেখি না৷''

অডিও শুনুন 04:35

‘সাহিত্য আমাদের নিজেদের দেশ, সংস্কৃতি চিনতে ও জানতে শেখায়’

৫২ বছর ধরে সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকায় থাকা মহম্মদ খলিল বলছিলেন, ‘‘মূলত গবেষক, অনুসন্ধিৎসুরাই আসেন দুষ্প্রাপ্য বইয়ের খোঁজে৷ রিসার্চের জন্য অনেক জায়গা থেকে এমনকি দিল্লী, বোম্বে থেকেও লোকজন আসেন৷ আগে এই লাইব্রেরিতে আরও অনেক বেশি লোক আসতেন৷ এখন পাবলিক ইন্টারেস্টের সাথে পাবলিক লাইব্রেরিও শেষ৷ কলকাতার সব উর্দু লাইব্রেরির এই একই অবস্থা৷''

কেন? এই প্রজন্ম কি এসব দুষ্প্রাপ্য বইয়ের খোঁজে আসে না? খলিল বলেন, ‘‘ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি আসে৷ অনেকে বই নিয়ে যান, কিন্তু আর ফেরত দেন না৷ এতে ক্ষতি হয়৷ তার ওপরে ইন্টারনেট এসে গেছে৷ সব ওখানেই পাওয়া যায় বলে তারা মনে করে৷''

লাইব্রেরির হাল হকিকত

সারি সারি লোহার তাকে রয়েছে উর্দু বেদের পাশে রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত, বৌদ্ধদের ত্রিপিটক ও জৈন ধর্মগ্রন্থের উর্দু অনুবাদ৷ চোখে পড়ল রাম-সীতার ছবি দেওয়া উর্দুতে লেখা রামায়ণের পকেট সংস্করণও৷ লাইব্রেরির বিপুল মণিমানিক্যের মধ্যে পাঠক খুঁজে পাবেন মহাত্মা গান্ধীর গীতাজ্ঞানের অনুবাদ ও লালা লাজপত রায়ের আর্যসমাজ৷ সম্প্রীতির এমন নিদর্শন তৈরি করে আজ কেমন আছে এই ৮৮ বছরের লাইব্রেরি? দাঙ্গা-দেশভাগ, ভারত-পাক যুদ্ধর কারণে মাত্র দুবারই এই লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু সাহিত্যপ্রেমীদের উৎসাহে ফের চালু হয়েছে এই লাইব্রেরি৷

খলিল বললেন, ‘‘একফোঁটাও সরকারি সাহায্য পাই না৷ কিছু অনুদান আর চাঁদার ওপর নির্ভর করেই লাইব্রেরি চলছে৷ আমরা মাঝে মাঝে কবি সম্মেলন করি, তাতে কিছু খরচা ওঠে৷ বার্ষিক সদস্য এখন ৩৫ জন৷ মাসিক সদস্য ২৫ জন৷ আমার বয়স হয়েছে, তাই দৌড়ঝাঁপ করতে পারি না৷ ফলে যেটুকু অনুদান আসত, সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে৷''

এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলার রেহানা খাতুন ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘আমাদের এলাকায় ২৫ শতাংশ মাত্র বাঙালি৷ আর বাকি সবাই উর্দুভাষী৷ আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি৷ এখানে এই একটিই লাইব্রেরি৷ আমরা চেষ্টা করেছিলাম, যাতে লাইব্রেরির কিছু উন্নতি করা যায়৷ প্রচার করা যায়৷ কিন্তু ওঁরা রাজি হননি৷ ওঁরা নিজেদের হাতেই লাইব্রেরি রাখতে চেয়েছেন৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন