‘উচ্ছেদ করে পিয়নের চাকরি দিলে কি লাভজনক হবে?’ | আলাপ | DW | 13.11.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘উচ্ছেদ করে পিয়নের চাকরি দিলে কি লাভজনক হবে?’

বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেলসহ পর্যটনকেন্দ্র করতে গিয়ে বেশ কিছু ম্রো জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ হচ্ছেন৷ পাহাড়িদের সঙ্গে আলোচনা করে কি এই প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়? উচ্ছেদ হওয়া জনগোষ্ঠী কি সুবিধা পাবে?

যখন কাপ্তাই বাঁধ হয়েছে তখন এক হাজার ম্রো উচ্ছেদ হয়েছে৷ সেখানেও দেখা গেছে যথার্থভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি৷

যখন কাপ্তাই বাঁধ হয়েছে তখন এক হাজার ম্রো উচ্ছেদ হয়েছে৷ সেখানেও দেখা গেছে যথার্থভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি৷

এসব বিষয় নিয়ে ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেছেন, জমি লিজ দেয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বান্দরবান থেকে বিপুল পরিমাণ ম্রো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা হয়েছে৷ তাদের কেউই ক্ষতিপূরণ পাননি৷ আর এখন পর্যটনকেন্দ্র করে চাকরি-উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে৷ আমাদের অস্তিত্বই যদি না থাকে তাহলে চাকরি-উন্নয়ন দিয়ে কি হবে?

ডয়চে ভেলে: বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে একটি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ হচ্ছে? বিষয়টা কি আপনি জানেন?

গৌতম দেওয়ান: হ্যাঁ আমরা জেনেছি৷ বেশ কিছুদিন থেকেই বিষয়টি আমাদের কানে এসেছে৷ গত ৭ অক্টোবর ম্রো জনগোষ্ঠীর লোকজন ডিসির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা স্মারকলিপি দিয়েছে৷ শুধু হোটেল নয়, সেখানে পর্যটন কমপ্লেক্স হবে৷ সেখানে প্রত্যক্ষভাবে তিনটি গ্রাম এবং পরোক্ষভাবে পাঁচটি গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন৷

এর আগেও টংকাবতি পাহাড় থেকে ম্রো জনগোষ্ঠীকে চলে যেতে হয়েছে৷ বিভিন্ন সময় পার্বত্য এলাকায় জমি লিজ দেওয়া হচ্ছে৷ এতে কী পরিমাণ জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ হয়েছে? 

বান্দরবানে বিভিন্ন সময় সবচেয়ে বেশি উচ্ছেদ চালানো হয়েছে৷ পার্বত্য চুক্তি ও আইন অনুযায়ী সেগুলো হয়নি৷ এই উচ্ছেদকে বেআইনি বলা যেতে পারে৷ ম্রোরা বান্দরবানে জনগোষ্ঠীর দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে৷ তাদের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের মতো৷ তাদের জায়গাগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি, চিম্বুক পাহাড়ের পশ্চিমাংশে সেনাবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জের জন্য ১১ হাজার একর জমি নেওয়া হয়েছে৷ সেখান থেকে অনেক ম্রো উচ্ছেদ হয়ে গেছে৷ নীলগিরি যেটা সেটাও ম্রোদের ছিল৷ সেখান থেকেও তারা উচ্ছেদ হয়েছে৷ রাবার বাগানসহ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের নামে প্রচুর জায়গা দখল করা হচ্ছে৷ পার্বত্য চুক্তিতেও আছে, লিজ নেওয়ার পরও যে জমিগুলো অব্যবহৃত আছে সেগুলোর লিজ বাতিল করতে হবে৷ প্রমোদ মানকিন যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন তখন তিনি সেখানে গিয়ে অনেক অব্যবহৃত জমির লিজ বাতিল করেন৷ পরে দেখা গেল, সেই জমিগুলো আবার অন্যকে লিজ দেওয়া হয়েছে৷

আপনারা কি এটা নিয়ে কখনও প্রতিবাদ করেছেন?

আমরা সবসময়ই বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করে আসছি৷ আমাদের নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে নীতি নির্ধারকদের সবসময় আমরা বিষয়গুলো জানিয়েছি৷

বলা হচ্ছে, চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেলসহ পর্যটনকেন্দ্র হলে স্থানীয় উন্নয়ন ও অধিবাসীদের চাকরির সুযোগ হবে? 

আপনাকে উচ্ছেদ করে পিয়ন বা দারোয়ানের চাকরি দেওয়া হলো, সেটা কি লাভজনক হবে? তাদের জীবিকার মাধ্যম জুমভূমিই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে৷ এখন একজনকে উচ্ছেদ করা হলে তিনি আদৌ বাঁচতে পারবেন কি-না তারই ঠিক নেই৷ চাকরি, উন্নয়ন দিয়ে কি হবে?

অডিও শুনুন 11:10

‘‘উচ্ছেদ করা হলে তিনি আদৌ বাঁচতে পারবেন কি-না তারই ঠিক নেই৷ চাকরি, উন্নয়ন দিয়ে কি হবে?’’

ম্রো জনগোষ্ঠীর দাবি, পাঁচ তারকা হোটেলের জন্য এক হাজার একর জমি নেওয়া হচ্ছে৷ তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩০ একর জমি নিচ্ছেন তারা৷ কোনটি আসলে সত্যি?

আমরা যতদূর জানি সেনা কল্যাণ সংস্থার নামে ১৬ একর জায়গা বন্দোবস্ত করা আছে৷ এখন আমরা যে, ৮০০ থেকে এক হাজার একর বলছি এই কারণে যে, তারা যে প্ল্যানটা করেছে তাতে শুধু হোটেল নয়, ১২টি পাহাড়ে তারা পর্যটনকেন্দ্র করবে৷ একটা পাহাড়ের সঙ্গে আরেকটা পাহাড়ে তারা সংযোগ স্থাপন করবে৷ তারা যে এলাকাগুলো চিহ্নিত করেছে বা যেভাবে সীমানা নির্ধারণ করছে তাতে আমরা গুগল ম্যাপ নিয়ে দেখেছি সেটা ৮০০ থেকে এক হাজার একর জমি হবে৷ প্রত্যক্ষভাবে তিনটি গ্রাম আক্রান্ত হবে৷ পরোক্ষভাবে হবে পাঁচটি গ্রাম৷ পরোক্ষভাবে এই কারণে বলছি, তাদের জুমের জমি নষ্ট হয়ে যাবে৷ তাদের পানির উৎস বন্ধ হয়ে যাবে৷ এখন যে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে সেখানে কিন্তু তাদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না৷ নিজের এলাকাতেই তারা পরবাসী হয়ে আছে৷ তাদের চলাফেরা সীমিত হয়ে যাচ্ছে৷

বলা হচ্ছে, এই পর্যটনকেন্দ্র করতে গেলে ৭০ থেকে ১১৬টি পাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ পাড়াগুলোর মধ্যে ১০ হাজারের মতো জুমচাষি উদ্বাস্তু হতে পারেন? আসলে কি সংখ্যাটা এমন? 

এখানে কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা৷ সেখানে ক্যাবল লাইন যাবে, মানুষের আসা-যাওয়ার পথ তৈরি করতে হবে৷ শত শত কর্মচারী সেখানে থাকবেন, তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে৷ তাদের পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে হবে৷ এগুলো করতে গিয়ে তারা যেটা করার পরিকল্পনা করেছে, তারা ঝিঁড়িতে এবং ঝরনাতে বাঁধ দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করছে৷ এগুলো তো গ্রামবাসীর জলের একমাত্র উৎস৷ সেগুলো তো বন্ধ হয়ে যাবে৷ তাদের ফলজ বাগানগুলো নষ্ট হয়ে যাবে৷

জমি নেওয়া হলে ওই এলাকায় যারা বসবাস করেন তাদের কি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়?

না৷ আমরা কোনোদিন শুনিনি৷ সেখানেই তো আমাদের আপত্তি৷ সরকারি প্রয়োজনে আপনি জমি নিতে পারেন৷ কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রথম যে কাজটি হচ্ছে যারা সেখানে আছেন আগে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে৷ এই ধরণের কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই৷ আমরা দেখেছি, যখন কাপ্তাই বাঁধ হয়েছে তখন এক হাজার ম্রো উচ্ছেদ হয়েছে৷ সেখানেও দেখা গেছে যথার্থভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি৷

জমিগুলো চলে গেলে যারা জুম চাষ করে যারা জীবন নির্বাহ করেন, তারা কী করবেন? 

তাদের তো কোনো বিকল্প উপার্জনের উৎস নেই৷ বান্দরবানে সমতল ভূমি নেই৷ সবই পাহাড়ি জমি৷ সমতল ভূমি যা আছে সেগুলো কিন্তু পাহাড়িদের হাতে নেই, বেদখল হয়ে গেছে৷ সেখানে জীবিকার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে জুম চাষ৷ জুম ভূমি কিন্তু সমতল ভূমির মতো না৷ সেখানে প্রতি বছর চাষ করা যায় না৷ আগে তো ১৫ বছর পরপর জুম চাষ করতে হতো৷ এখন জমির স্বল্পতার কারণে তিন বছর পরপর তারা চাষ করেন৷ 

এই সিদ্ধান্তগুলো কি পার্বত্য এলাকায় যারা দায়িত্বে আছেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হয়?

না৷ আপত্তি হচ্ছে সেখানেই৷ পার্বত্য চুক্তি এবং সেখানে যে আইনগুলো আছে সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, কোনো জায়গা নিতে গেলে কিছু প্রক্রিয়া মেনে নিতে হবে৷ আন্তর্জাতিক যে আইন আছে, সেখানেও কিন্তু বলা আছে, আদিবাসীদের জায়গা নিতে গেলে তাদের অনুমতি নিতে হবে৷ এটা তো সারা বিশ্বেই ফলো করা হয়৷ বিশ্বব্যাংক বা এডিবি যে অর্থ দেয়, সেখানে কিন্তু তারা বলে দেয় আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জমি নিতে হলে তাদের অনুমতি নিয়েই কাজটা করতে হবে৷ 

আপনি কী মনে করেন, এর মাধ্যমে উপনিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে?

ঠিক সেভাবে না হলেও বুঝতে হবে, পাহাড়িরা তো এদেশেরই নাগরিক৷ সেখানে কোনো প্রকল্প নিতে গেলে যারা সেখানকার অধিবাসী তাদের স্বার্থ তো দেখতে হবে৷ তাদের স্বার্থ না দেখে, মতামত না নিয়ে কিছু করলে সেটা উচ্ছেদের অংশই হয়ে যায়৷ এভাবে যখন করা হয় তখন তো উপনিবেশের মতো করা হচ্ছে৷ 

পরিবেশের উপর কেমন ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে? 

পরিবেশের তো অবশ্যই ক্ষতি হবে৷ সেখানে স্বাভাবিক যে গাছপালা আছে সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে৷ ঝিঁড়ি-ঝরনা যেগুলো আছে সেখানে যদি বাঁধ দেওয়া হয় তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে৷ এখানে যারা বসবাস করে তাদের সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা সবই তো নষ্ট হয়ে যাবে৷ শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে তা নয়, তাদের সংস্কৃতিসহ সবকিছু বিপন্ন হয়ে যাবে৷

প্রজেক্টগুলো তো হচ্ছেই৷ এখন তাহলে আপনারা কী করবেন?

আমরা তো প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক মাস আগে স্মারকলিপি দিয়েছি৷ কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যক্রম দেখছি না৷ যেহেতু এখানে মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে, তাদের বাঁচা মরার প্রশ্ন আছে, এটা তো ছেড়ে দেওয়া যায় না৷ তারা তো দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে৷ এখন শান্তিপ্রিয়ভাবে করছে৷ সেটা যদি না হয়, তাহলে পরিবেশ তো এভাবে থাকবে না৷ অশান্ত হয়ে উঠবে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়