ঈদে তারা নীরবে চোখের পানি ফেলবেন, কেউ যাতে টের না পায় | আলাপ | DW | 03.07.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

ঈদে তারা নীরবে চোখের পানি ফেলবেন, কেউ যাতে টের না পায়

অর্থবিত্তের নৈমিত্তিক টানাটানির মধ্যে ছাপোষা মধ্যবিত্তের জীবনে সবকিছু পজিটিভ হতে হয়, কারণ, পজিটিভ মানেই ভালো৷ কিন্তু করোনাকালেও তাই কি?

করোনাকালে সীমিত আকারে হলেও নিম্নবিত্তের জন্য রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা, ত্রাণ ও ব্যক্তি উদ্যোগের সহায়তা আছে৷ উচ্চবিত্তের প্রণোদনা আছে, সবচেয়ে বেশি আছে সংকট আর্থ-রাজনৈতিক মোকাবেলার ক্ষমতা৷ এই দুই শ্রেণিবৃত্ত বিপদে-আপদে ব্যক্তি অথবা রাষ্ট্রের সহায়তা প্রার্থনা করতে পারে৷

বিত্ত যাদের বেশি বা কম নয়, তারাই মধ্যবিত্ত৷ যদিও মধ্যবিত্তের কোনো সর্বমান্য সংজ্ঞা নেই৷ অর্থবিত্তের নৈমিত্তিক টানাটানির মধ্যে ছাপোষা মধ্যবিত্তের জীবনে সবকিছু পজিটিভ হতে হয়, কারণ, পজিটিভ মানেই ভালো৷ জীবনভর যে মধ্যবিত্ত নেগেটিভ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে চেয়েছে, এখন এই করোনাকালে টেস্ট রিপোর্টে নেগেটিভ শব্দ দেখার ইচ্ছেটাই তার অভীষ্ট৷ এই ইচ্ছের সাথে করোনার উপজাত হিসেবে আরো অসংখ্য নেগেটিভ মধ্যবিত্তের সমাজজীবনে প্রবেশ করেছে৷ শহুরে মধ্যবিত্ত ভালো নেই, এই কথাটাও সে জোরে বলতে পারে না, পাছে প্রতিবেশী জেনে যায়৷ আর কে না জানে, সবকিছু চলে গেলেও মধ্যবিত্ত কেবল মর্যাদা ও মূল্যবোধ ধরে বেঁচে থাকতে চায়৷

ঢাকা শহরকে মধ্যবিত্ত আপন ভাবেনি কখনো, এ শহরও তাকে আপন ভাবে না৷ উপরের অংশ বাদ দিলে মধ্যবিত্তের উঠতি অংশই এ নগরের উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা৷ চাকরি, ব্যবসা, উদ্যোগ, সেবা, বেকারত্ব, কেনাকাটা, রাজনীতি, সংষ্কৃতি সবকিছুতেই তাদের অপার অংশগ্রহণ৷ দুই বেড রুমের সাধারণ কক্ষে বছরের পর বছর ভাড়া থেকে যাদের স্বপ্ন শেষজীবনে একটি মোটামুটি ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া৷ এ শহরে হররোজ বসবাস করলেও প্রত্যেকের একটা করে ‘দেশের বাড়ি' থাকে৷ দুই ঈদে অদ্ভুতভাবে ঝুলে গাদাগাদি করে মর্মান্তিকভাবে জলে, স্থলে সে গ্রামে ফিরতে চায়, এ শহর যেন তাকে জোর করে আটকে রেখেছিল৷

 করোনাকালে শারীরিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিজেকে ঘরে বন্দি করেও শেষ রক্ষা হয়নি৷ ২০-৩০ বছর বসবাস করেও উঠতি মধ্যবিত্ত ঢাকাবাসীকে এক করোনার রাতে ছোট্ট পিকআপে সওয়ার হয়ে গ্রামে চলে যেতে হয়৷ বাড়ি ভাড়া তাকে দিতে হবে না, পকেটের বাকি টাকাগুলো ফুরোলে আত্মীয়স্বজন হয়ত দিনকতক তার ডাল-ভাতের জোগান দেবে৷ কিন্তু করোনাকাল আরো দীর্ঘায়িত হলে কী হবে তা কি আপাত গ্রামে ফিরে যাওয়া উঠতি মধ্যবিত্ত জানে? গ্রামে তো সুযোগ কম৷ সে কি আবার ফিরতে পারবে ফেলে যাওয়া ঢাকায়, নতুন করে পাততে পারবে সংসার?

লকডাউন, ওরফে সাধারণ ছুটির ফলে কাজ বন্ধ বা কমে গেলে নিম্নবিত্তঢাকা শহরে একমাসও টেকেনি৷ পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা বেতনের আশায়, কিংবা চাকরিতে যোগ দিতে মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে কোনোটাই না পেয়ে একবার ফিরে গেছে গ্রামে, আবার পরে এসেছে৷ উঠতি মধ্যবিত্ত এপ্রিল মাসটা কায়ক্লেশে কাটিয়ে দিতে পারলেও মে-জুন মাসে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে৷ কেন এই উঠতি মধ্যবিত্ত তিনমাস ঢাকা শহরে টিকে থাকতে পারে না? কারণ, প্রত্যেককে তার আয়ের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ খরচ করতে হয় বাড়িভাড়া মেটাতে৷ পরিসংখ্যান মতে, গত ২০ বছরে অনেকগুণ বাড়িভাড়া বেড়েছে৷ ন্যূনতম খাবার খরচ, শিক্ষা, যাতায়াত, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ বিল, গ্রামে থাকা মা-বাবার দেখভাল করে আর মোবাইল বিল খরচ করে আর কীই বা থাকে তাদের পকেটে? প্রতিমাসের শেষ ক'টা দিন ধারদেনা করে চলে, কোনো সঞ্চয় নেই, জমানো টাকা থাকে না৷ রাষ্ট্র বাড়িভাড়ার লাগামে হাত দিলে এদেরও সঞ্চয় থাকতো, নিদেনপক্ষে কয়েকমাস টিকে থাকার৷ এক হিসেব বলছে, এরই মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি লোক ফিরে গেছে গ্রামে৷ উঠতি মধ্যবিত্তের একটা অংশ কম ভাড়ার বাসায় চলে যাচ্ছেন৷ কেউ কেউ পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে কম ভাড়ার মেসে গিয়ে  উঠেছেন৷ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাড়িগুলোর ফটকে ঝুলছে অজ¯্র

 টু-লেট৷ উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত বাড়িওয়ালা ব্যাংক লোনের সুদের কিস্তি টানতে বাড়িভাড়া কমিয়েও ভাড়াটে পাচ্ছেন না৷ এই বাসাগুলোতে কারা ছিলেন, এখন নেই?  এরা সেই বাংলা ছবির আটপৌড়ে উঠতি মধ্যবিত্ত, লোকাল বাসের হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতে এখন এই করোনাকালে দারিদ্র্যসীমার হাতল ধরে ঝুলছেন৷ যাদের চাকরি এরই মধ্যে চলে গেছে, বা যাই যাই করছে কিংবা আপাততত আর কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই৷ এই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যাদের পোশাকি নাম হতে পারে ‘কোভিড পুওর' বা ‘কোভিড দরিদ্র'৷ আমরা যাদেরকে আরবান পুওর বা নগর দরিদ্র বলে চিনি, যাদের অধিকাংশের বাস ঢাকার বস্তিসমূহে, তাদের থেকে এই কোভিড দরিদ্ররা একদম আলাদা৷

সরকারি চাকুরেদের বেতন আছে, বেসরকারি চাকুরেদের কারো কারো কমে গেলেও বেতন আছে, কারো কারো চাকরি চলে গেছে৷ যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করতেন, কিংবা স্বাধীন ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসা তারা টিকতে পারেননি৷ যারা চাকরিপ্রত্যাশী ছিলেন, তাদের চাকুরি পাওয়া পিছিয়ে যাবে, এর সাথে যুক্ত হবে চাকরি চলে যাওয়াদের বাড়তি চাপ৷ উঠতি মধ্যবিত্তদের চাল, ডাল, তেল, নুনের হিসাব মিলছে না৷ মাস্ক, গ্লাভস, সাবান, স্যানিটাইজার কেনার বাড়তি খরচ কীভাবে জোগাড় হবে? করোনা পরীক্ষার টাকা, অন্যরোগের চিকিৎসা, শুধু টাকা দিয়েও হাসপাতালে জায়গা মিলছে না, এ হাসপাতাল সে হাসপাতাল ঘুরে গলদধর্ম হয়ে মরে যাওয়ার শঙ্কা৷ সন্তানের স্কুলের বেতনের সাথে অনলাইন ক্লাসের জন্য ল্যাপটপ নিদেনপক্ষে স্মার্ট ফোন লাগছে, সাথে ডাটা কেনার বাড়তি চাপ৷ কিছু পরিবারে যাদের একাধিক সন্তান স্কুলে পাঠরত, তাদের বাসায় ইন্টারনেট ব্যবহার উপযোগী ডিভাইস কিনতে বাড়তি খরচ হচ্ছে৷ শিক্ষার্থী না থাকায় মধ্যবিত্তের আবাসস্থল মোহাম্মদপুরে বাংলা মিডিয়াম স্কুল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে৷

Dr. Debashis Kumar Kundu der Dhaka Universität Bangladesch (Sazzad Sumon)

ড. দেবাশীষ কুমার কুন্ডু, শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এতসব চাপের মধ্যেও এই উঠতি মধ্যবিত্ত দরিদ্র আত্মীয়স্বজন, পরিচিত-অপরিচিত মানুষের পাশে দাঁড়ায়৷ গৃহকর্মীকে যতটা সম্ভব বেতন পাঠায়৷ একসময় টাকা ফুরিয়ে গেলে লজ্জায় ফোন ধরা বন্ধ করে দেয়৷ ঘরের গৃহকর্মী না থাকায় পরিবারের নারী সদস্যদের কাজের চাপ দ্বিগুণ বেড়েছে৷ বাড়িতে থাকা সন্তানদের দেখভাল আর করোনা দিনের স্বাস্থ্য পরিচর্যা তো রয়েছেই৷ বেশকিছু জ্বরের ওষুধ, ভিটামিন সি, জিঙ্ক ট্যাবলেট, মাস্ক, স্যানিটাইজার বাসায় মজুদ করে উঠতি মধ্যবিত্ত টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা ফেসবুকে চোখ রেখে করোনা পরিস্থিতি, সরকারের ভূমিকা ও টিকা আসতে কত দেরি সংক্রান্ত আলোচনায় মনোযোগ দিয়ে একখন্ড আকাশ দেখার আশায় জানালায় চোখ রাখে৷ সুযোগ বুঝে দু-একটা সেলফি তোলে৷ এই অবসরে সে টের পায় ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঢাকা শহরে বায়ুদূষণ কমেছে, পাখিরা ফিরেছে, সবুজ বেড়েছে, চিরসাথী ট্রাফিক জ্যাম নেই৷  তবুও এই শহর ধরে রাখতে পারছে না বছরের পর বছর ধরে সেবা দেয়া এই উঠতি মধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে, টাকা নেই বলে৷  

মধ্যবিত্তের বড় ভয় অনিশ্চয়তা৷ যেখানে আছে সেখান থেকে নেমে যাওয়ার ভয়৷ করোনাকালে সেই অনিশ্চয়তা প্রকট আকারে হাজির হয়েছে মধ্যবিত্তের সামনে, তাকে সাথে করেই পাড়ি দিতে হবে অন্তহীন ভবিষ্যৎ৷ হয়ত ক্ষয়ে যাবে সংখ্যায়৷ নেমে যাবে নিঃশব্দে দারিদ্রসীমার একটু নীচে৷ সংসার চালানোর জন্য পোড় খাওয়া স্ত্রী গভীর রাতে স্বামীর হাতে তুলে দেবেন বিয়ের গয়না কিংবা ঘুরতে যাওয়ার জমানো টাকা৷ সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার জন্য হয়ত বাবা ভিটেটা বন্ধক রাখবেন৷ আরো এক প্রজন্ম পরে হয়ত আবার তারা মধ্যবিত্তে উন্নীত হবেন, অথবা হবেন না৷ খাবারের তালিকায় আমিষ কমতে থাকবে, তার জায়গা নেবে কমদামী সবজি কিংবা শর্করা৷ সামনের বেশকিছু ঈদে হয়ত আর নতুন জামা-কাপড় কেনা হবে না৷ নীরবে চোখের পানি ফেলবেন কেউ কেউ৷ তবুও কেউ যেন টের না পায়৷ মধ্যবিত্ত তো এমনই৷ উঠতি মধ্যবিত্তের আর্থ-সামাজিক আর মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা মাত্র শুরু হয়েছে৷ করোনাকালে সামাজিক স্তরবিন্যাসের উলম্ব সরলরেখা ধরে নামতে নামতে কোথায় সে আটকে যেতে পারবে-তার উত্তর সম্ভবত উঠতি মধ্যবিত্তের জানা নেই৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন