‘ইসলামিক স্টেটের′ শীর্ষ সন্ত্রাসীর স্ত্রী জার্মানিতে থাকেন! | বিশ্ব | DW | 17.04.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

জার্মানি

‘ইসলামিক স্টেটের' শীর্ষ সন্ত্রাসীর স্ত্রী জার্মানিতে থাকেন!

ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর নিহত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর স্ত্রী ওমাইমা এ.জার্মানিতে নিরিবিলি জীবনযাপন করছেন বলে লেবাননের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন৷ এই জার্মান নাগরিক আইএস-এ যোগ দিয়ে ডেনিস ক্যুস্পার্টকে বিয়ে করেছিলেন৷

আরব টিভি চ্যানেল আল আয়ান-এর যুদ্ধসাংবাদিক জেনান মুসা যখন এক ‘বিশ্বস্ত সূত্র' থেকে একটি স্মার্টফোনের কন্টেন্ট পেয়েছিলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছেন তিনি৷ ফোনটি ওমাইমা এ. নামে এক নারীর ছিল, যিনি টিউনিশীয় বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক৷ আর ফোনের কন্টেন্ট বলতে বোঝানো হচ্ছে হাজার হাজার ক্ষুদেবার্তা, ছবি এবং বিভিন্ন উড়ালের সময়সূচি ও বিভিন্ন দাপ্তরিক কাগজপত্রের স্ক্রিনশট৷ মুসার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ওমাইয়া এ.-র জার্মানি থেকে সিরিয়া যাত্রা ও ইসলামিক স্টেটের তথাকথিত ‘খেলাফতে' বসবাসের ‘আনসেন্সরড' সব কন্টেন্ট রয়েছে ফোনটিতে৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটি দখলকৃত এলাকায় খেলাফত প্রতিষ্ঠার কয়েকমাস পরেই সেখানে গিয়েছিলেন এই জার্মান নারী৷

আইএস-এর অধীনে জীবন যেমন ছিল

স্মার্টফোনটিতে থাকা বিভিন্ন তথ্য কয়েকমাস ধরে যাচাইবাছাই করেছেন মুসা৷ এরপর চলতি সপ্তাহে এক লম্বা ভিডিও প্রতিবেদনের সাথে ফোনটিতে পাওয়া কিছু ছবি এবং তথ্য প্রকাশ করেছেন তিনি৷ যদিও ডয়চে ভেলের পক্ষে স্বাধীনভাবে সেসব ছবির সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়নি, তবে সেগুলো দেখে আইএস-এর অধীনে জীবনযাপন সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব৷

১৯৮৪ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির হামবুর্গ শহরে জন্ম নেয়া ওমাইমা এ. সম্ভবত নাদের হাদ্রা নামে এক ব্যক্তির প্রেমে পড়েন ও তাকে বিয়ে করেন৷ নাদের জার্মানির প্রথম সারির ইসলামি উগ্রপন্থিদের ঘনিষ্ট ছিলেন৷ মুসা জানান, ওমাইমা এ. এবং তার তিন সন্তান নাদের হাদ্রার সঙ্গে সিরিয়া পাড়ি জমিয়েছিলেন৷

ফোনটিতে পাওয়া ২০১৫ সালের শুরুর দিককার ছবিতে আইএস দখলকৃত অঞ্চলে গোষ্ঠীটির কালো পতাকা এবং প্রচারণামূলক বিভিন্ন পোস্টার দেখা যায়৷ কিছু শিশু-কিশোরের ছবিও সেখানে রয়েছে, যেগুলোতে ওমাইমা এ.-র সন্তানদের দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন মুসা৷ ছবিতে তাদের আইএস-এর বিভিন্ন প্রতীক এবং বন্দুক নিয়ে খেলতে দেখা গেছে৷ একটি ছবিতে ওমাইমা এ.-কে একটি কালাশনিকভ রাইফেল বহন করতেও দেখা গেছে৷

যদিও সেই সময় ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে এবং নারীদের দাসীতে পরিনত করতে ব্যস্ত ছিল, তা সত্ত্বেও স্মার্টফোনে তাদের দখলকৃত অঞ্চলের এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে৷ ফোনটিতে একটি জুসবারে এবং নদীর ধারে বিভিন্ন পরিবারের ঘোরাঘুরি এবং হাসিখুশি মানুষের অনেক সেলফি পাওয়া গেছে৷

সেসব ছবির মধ্যে মুসা আইএস-এর প্রচারণামূলক এক ছবি দেখেছেন, যেটি জার্মানির সংসদ ভবনের সামনে দুই মুখোশধারী যোদ্ধার ‘মেম' ছিল৷ জার্মান ভাষায় ছবিটিতে একটি ক্যাপশনও দেয়া ছিল, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘তোমার দোরগোড়াতে প্রতিশোধ নেয়া হবে৷'

তিনি কি শুধুই এক গৃহিনী ছিলেন?

কোবানিতে যুদ্ধে স্বামী নাদের হাদ্রা মারা যাওয়ার পর, ওমাইমা এ.-কে আইএস দৃশ্যত আনুষ্ঠানিক শহিদ ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল এবং তিনি তখন পুনরায় বিয়ে করেন৷ মুসার ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনের ছবিগুলো দেখে এটা পরিষ্কার যে তার নতুন স্বামী হয়েছিলেন জার্মানির সবচেয়ে কুখ্যাত উগ্রপন্থি ইসলামিস্ট ডেনিস ক্যুস্পার্ট৷ ব়্যাপার থেকে আইএস যোদ্ধায় পরিণত হওয়া এই ব্যক্তি ‘দেসো ডগ' নামেও পরিচিত ছিলেন৷

ক্যুস্পার্টকে ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সন্ত্রাসী তালিকায় যোগ করেছিল৷ তিনি ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সিরিয়ায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়৷

এক সময় জার্মানিতে ওমাইমা এ.-র দুই সন্দেহভাজন স্বামী'র উগ্রপন্থি সালাফি সার্কেলের সদস্য ছিলেন, এমন এক ব্যক্তি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওমাইমা এ. অপরিচিত কেউ নন৷'' তিনি জানান যে, যদিও তিনি তাকে কখনো সরাসরি দেখেননি, তবে তিনি যে জার্মানিতে এবং সিরিয়ায় থাকতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন, তা তিনি জানেন৷

‘‘এই নামটি আমি অনেকবার শুনেছি,'' বলেন তিনি৷

স্মার্টফোনে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মুসাও জানিয়েছেন যে, ওমাইমা এ. সিরিয়ায় থাকাকালে আইএস-এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো চালিয়েছেন৷

ফোনটা কি হারিয়ে গিয়েছিল?

এটা নিশ্চিত নয় যে, ওমাইমা এ. ফোনটি ২০১৫ সালের শেষের দিকে হারিয়ে ফেলেছিলেন, নাকি সিরিয়াত্যাগের আগে ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে রেখে এসেছিলেন৷ ফোনটিতে মোট ৩৬ গিগাবাইট কন্টেন্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুসা৷ ঠিক কবে তিনি সন্তানদেরসহ জার্মানিতে নিজের শহর হামবুর্গে ফিরে এসেছিলেন, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি৷ তবে মুসার অনুসন্ধান বলছে, সম্ভবত ২০১৬ সালের শেষের দিকে তিনি ফিরে আসেন৷

লেবাননের এই সাংবাদিক এটা জেনে বিস্মিত যে, জার্মানিতে সেই নারী সম্ভবত যেকোনোভাবেই হোক, ফৌজদারি মামলা এড়াতে সক্ষম হয়েছেন৷ তবে এটাও সত্যি যে, সহ সিরিয়া এবং ইরাক থেকে ফিরে আসা অনেককেই জার্মানির নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারিতে রাখা হয়েছে৷

ফোন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ওমাইমা এ.-র মুখোমুখি হতে হামবুর্গে গিয়েছিলেন লেবাননের সাংবাদিক মুসা৷ তবে তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি শুধুমাত্র ওমাইমা এ.-র অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয়েছিলেন, যে দাবি করেছে, তার পরিবার কখনোই সিরিয়ায় যায়নি৷ মুসা পরবর্তীতে দু'বার ওমাইমা এ.-কে ফোন করতে সক্ষম হলেও কথা বলতে পারেননি৷ ডয়চে ভেলেও তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে৷

সেই সময় মুছে ফেলা লিংকডইন-এর একটি প্রোফাইলে, যেটি ওমাইমা এ.-র বলে মনে করেন মুসা, সতর্কভাবে নিজেকে আধুনিক হিসেবে উত্থাপন করা এক নারীর ছবি দেখা গিয়েছিল, যিনি ‘পনিটেইল'-এর মতো করে তাঁর চুল বেঁধেছিলেন এবং নিজেকে অনুবাদক ও ইভেন্ট সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন৷ মুসা বলেন, ‘‘তিনি নতুন এক জীবন বেছে নিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে বসবাস করেছেন এবং কর্তৃপক্ষ কখনোই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার করেনি৷''

তবে জার্মান কর্তৃপক্ষ সম্ভবত জানতো যে, ২০১৫ সালে ওমাইমা এ. সিরিয়ার উদ্দেশ্যে জার্মানি ত্যাগ করেছিলেন৷ এ সংক্রান্ত এক দাপ্তরিক চিঠির সন্ধান পাওয়া গেছে, যাতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বিদেশে (সিরিয়া) চলে যাওয়ায় জার্মান কর্তৃপক্ষ তার সামাজিক সুবিধাদি প্রত্যাহার করে নিয়েছে৷ তবে চিঠিটির সত্যতা ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি৷

ফৌজদারি মামলা হয়নি কেন?

প্রশ্ন হচ্ছে, জার্মান কর্তৃপক্ষ যদি জানতো যে, ওমাইমা এ. সিরিয়া গিয়েছিলেন, তাহলে তাকে ফিরে আসার পর গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন?

জার্মান আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেবল তখনই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যায়, যখন নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তিনি আসলেই কোনো অপরাধ করেছেন৷ নিকট অতীতে জার্মানির আদালতের অবস্থান এমন ছিল যে, শুধুমাত্র আইএস-এর দখলকৃত অঞ্চলে বসবাসের দায়ে কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যেতো না৷ বরং কৌঁসুলিদের এটা প্রমাণ করতে হতো যে, ওমাইমা এ.-র মতো ব্যক্তিরা সক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটিকে সহায়তা করেছিলেন৷

আর সেক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে, আইএস-এ যোগ দেয়া অধিকাংশ নারীই প্রকাশ্যে তাদের স্বামীদের তুলনায় বেশি কিছু করেননি৷ তাদের বিরুদ্ধে স্বামীদের কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মহিমান্বিত করা ছাড়া গোষ্ঠীটিকে প্র্ত্যক্ষ সহায়তার সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ প্রমাণ করা বেশ কঠিন৷

ডেনিস ক্যুস্পার্টকে আইএস-এর অনেক প্রচারণামূলক ভিডিওতে দেখা গেছে৷ সেসবের একটিতে তিনি এক ছিন্ন করা মস্তক হাতে ধরে ছিলেন৷ তিনি সম্ভবত ওমাইমা এ.-র দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন৷

আইএস-এর এলাকা থেকে ফিরে আসা অনেক নারী দাবি করেছেন, তাদেরকে তাদের স্বামীরা নিগৃহীত এবং প্রতারিত করেছেন৷ এবং তারা কখনোই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না৷

২০১৮ সালে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ৮৬৫টি আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল  জার্মানির কেন্দ্রীয় কৌঁসুলির কার্যালয়৷ কিন্তু সেগুলোর মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুবই কম ছিল৷ আইএস ফেরত নারীদের মধ্য থেকে সেবছর মাত্র পাঁচ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল৷ আর মাত্র দু'টি ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হয়েছিল৷

‘অপরিচিত কেউ নয়'

যে দু'টি ঘটনার বিচার চলছে, তার একটি জেনিফার ডাব্লিউ. নামের জার্মানিতে জন্ম নেয়া এক নারীর বিরুদ্ধে, যিনি ইরাকে বসবাসকালে পাঁচ বছর বয়সি এক ইয়াজিদি ‘শিশু দাসীকে' তৃষ্ণায় মরে যেতে দিয়েছেন৷ রাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা মিউনিখে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, হত্যা এবং বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য হওয়ার অভিযোগ এনেছেন৷

ওমাইমা এ.-র বিরুদ্ধে মুসার উত্থাপিত তথ্যপ্রমাণ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় কৌঁসুলির কার্যালয় সম্ভবত এই বিষয়ে তদন্ত করবে৷ স্মার্টফোনে পাওয়া ছবিগুলোতে এটা পরিষ্কার যে, তিনি স্বেচ্ছায় আইএস-এর মতাদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন৷ আর যেসব নথিপত্র পাওয়া গেছে তাতে তিনি উগ্রপন্থি ইসলামিস্ট গ্রুপের জন্য অর্থসংগ্রহ করেছেন বলেও ইঙ্গিত রয়েছে৷

ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে  জার্মানির বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি৷ তবে নতুন তথ্য পেলে কৌঁসুলিরা নতুন করে তদন্তের সুযোগ পান৷ আর একটি সূত্র ডয়চে ভেলেকে নিশ্চিত করেছে যে ‘‘ওমাইমা এ. আমাদের কাছে অপরিচিত কেউ নন৷''

দ্রষ্টব্য: ডয়চে ভেলে জার্মানির প্রেস কোড মেনে চলে , তাই কোন সন্দেহভাজন অপরাধী বা ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা বজায় রাখতে তার পূর্ণ নাম প্রকাশে  করে না৷

 

প্রতিবেদন: নওমি কনরাড, জাফর আব্দেল করিম, সান্দ্রা পেটার্সমান/এআই  

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন