ইলিশ শিকার নির্বিচারে, রুপালি শস্যের বিলোপের আশঙ্কা | বিশ্ব | DW | 02.08.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

ইলিশ শিকার নির্বিচারে, রুপালি শস্যের বিলোপের আশঙ্কা

ইলিশ বাঙালির বড় আবেগের জায়গা৷ তাই বর্ষা আসতে না আসতেই বাজার যখন ইলিশে ছেয়ে যায়, তখন বাঙালির মুখের হাসি আটকায় কে? কিন্তু যে হারে মৎসজীবীদের জালে ও খাওয়ার পাতে ছোট ইলিশের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে এ হাসি আর কতদিন?

পশ্চিমবঙ্গের একটি বাজারে ইলিশ

পশ্চিমবঙ্গের একটি বাজারে ইলিশ

সাময়িক লাভের খোঁজে কম দামের খোকা ইলিশের দিকে ঝুঁকেছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা৷ এপার বাংলার মৎস্যজীবীদের জালে যা ইলিশ পড়ে, তার ৫০ ভাগের বেশিই ছোট মাপের৷ ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রুলস্ ১৯৮৫'-এর বিধি অনুযায়ী, ২৩ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের ইলিশ মাছ ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ৷ ধরলে সেই জেলের জেলও হতে পারে৷ শুধু তাই নয়, ইলিশ মাছ ধরার জন্য ৯০ মিলিমিটার কম ফাঁসের জালও ব্যবহার করা যাবে না৷ জালের ফাঁক বড় হলে তার ভিতর দিয়ে ছোট ইলিশ গলে যাবে, ধরা পড়বে না৷ এ সব নিয়ম সত্ত্বেও বাজারে খোকা ইলিশের অঢেল জোগান৷ ৫০০ গ্রামের নীচে তো বটেই, ১৫০-২০০ গ্রামের ইলিশও হাজির৷ খয়রা মাছ বলেও বিকোচ্ছে খোকারা৷

ইলিশকে ঘিরে যে উদ্বেগ ও প্রশ্ন, তা নিয়ে ডয়চে ভেলে হাজির হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎসবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শিবকিঙ্কর দাসের কাছে৷ ইলিশ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণারত অধ্যাপকের বক্তব্য, ছোট ইলিশে বাজার ছেয়ে যাওয়ার পিছনে দু'টো বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ৷ একটি হলো আর্থ-সামাজিক৷ দ্বিতীয়টি অনেকাংশে সচেতনতামূলক৷ আর্থসামাজিক দিকটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অধ্যাপক বলেন, ‘‘যাঁরা মাছ ধরতে সমুদ্রে যান, তাঁদের লক্ষ্য থাকে দিনের শেষে কিছু উপার্জন করা৷ এই ইলিশের মরশুমের জন্য তাঁরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন৷ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই বেআইনি জেনেও ছোট ছিদ্রের জাল দিয়ে মৎসজীবীরা মাছ ধরছেন৷ আর সেগুলো বাজরেও আসছে৷’’

অডিও শুনুন 08:59

‘বাজারে যদি ছোট ইলিশ আসে, তাহলে ক্রেতাদের তা বয়কট করতে হবে’

তাই ‘‘বাজারে যদি ছোট ইলিশ আসে, তাহলে ক্রেতাদের তা বয়কট করতে হবে৷’’ এমনই মত অধ্যাপক দাসের৷ সচেতনতা প্রসারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘উভয়পক্ষকেই ভাবতে হবে ভবিষ্যতের কথা৷ মৎসজীবীদের মাথায় রাখতে হবে যে, এভাবে খোকা ইলিশ ধরতে থাকলে ভবিষ্যতে জালে আর ইলিশ পড়বেই না৷ যাঁরা সেই মাছ বিক্রি করছেন, তাঁদের বুঝতে হবে যে, ছোট ইলিশ বেচলে তিনি ভবিষ্যতে বড় মাছ বেচে আরও বড় মুনাফা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করবেন৷ আর আমরা যাঁরা ক্রেতা, তাঁরা যদি ছোট ইলিশ কিনি, তাহলে আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে৷ এগুলো ভেবে ছোট ইলিশ মাছ ধরা, বিক্রি করা এবং খাওয়া বয়কট করতে হবে৷ এর জন্য প্রয়োজন গণ-আন্দোলনের৷’’

খোকা ইলিশের রাজ্যপাট কতটা, তা সরেজমিনে দেখতে একাধিক বাজারে পৌঁছে গিয়েছিল ডয়চে ভেলে৷ ৫০০ গ্রামের কম ওজনের ইলিশ ধরা, বিক্রি ও কেনা বেআইনি৷ একটি বাজারে ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ দেখাই গেল না৷ এমনকি এক বিক্রেতা নিজে ওজন করে দেখালেন, তিনি যে মাছ বিক্রি করছেন, তার ওজন মেরেকেটে ৪০০ গ্রামও হবে না৷ বিভিন্ন বাজারে একই ছবি৷ এর ফলে কি ইলিশ সত্যিই বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে? অধ্যাপক দাসের কথায়, ‘‘ইলিশ সত্যিই কমছে৷ আজ থেকে ১০ বছর আগে যে পরিমাণ ইলিশ বাজারে আসত, এখন কি তা আর আসে? গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে ফারাকটা বুঝতে পারবেন৷ ইলিশ বড় না হলে তা প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে না৷ ছোট অবস্থায় তা জল থেকে তুলে ফেললে ইলিশের সংখ্যা বাড়বে কী করে? এছাড়া দূষণও প্রভাব ফেলছে প্রজননে৷ থাবা পড়েছে স্বাদ-গন্ধেও৷ শিবকিঙ্করবাবুর বক্তব্য, ইলিশ যে জলজ উদ্ভিদ খায়, জলে দূষণের জেরে তাতে জৈবিক পরিবর্তন হচ্ছে৷ এর প্রভাব পড়ছে ইলিশের স্বাদেও৷

অডিও শুনুন 04:52

‘ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার ফলে পদ্মা যতটা ইলিশ পায়, আমরা পাই না’

ইলিশের প্রশ্নে প্রতিবেশী বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক জায়গায় আছে বলে মনে করেন অধ্যাপক দাস৷ তাঁর কথায়, ‘‘বাংলাদেশের ইলিশের জোগান আমাদের তুলনায় বেশি৷ ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার ফলে পদ্মা যতটা ইলিশ পায়, আমরা পাই না৷ বাংলাদেশের মাথাপিছু রোজগার আমাদের থেকে কম৷ এর ফলে সেখানে চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য এপার বাংলার তুলনায় বেশি৷ তাই সে দেশে ক্রেতাদের সাধ্য অনুযায়ী অপেক্ষাকৃত বড় মাপের ইলিশের জোগান থাকে৷ তাছাড়া বাংলাদেশে ইলিশ ধরার আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়৷’’   

বাংলার রসনা সাহিত্যে যাঁর লেখা সমাদৃত, সেই সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তীও এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রশংসা করছেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে মাস দুই-তিনেক ইলিশ না ধরার যে আইন রয়েছে, সেটা ওরা কড়াভাবে বলবৎ করে এবং তার সুফল পায়৷ আমাদের দেশে আইন থাকলেও, সেটা কার্যকর হয় না৷ অথচ সরকার চেষ্টা করলেই পারে৷ কড়া নজরদারির ফলে কচ্ছপ তো এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না৷ তাহলে ইলিশের ক্ষেত্রে নজরদারি নয় কেন?’’

পশ্চিমবঙ্গ সরকার অবশ্য খোকার বাড়বাড়ন্তের অভিযোগ মানতে চাইছে না৷ রাজ্যের মৎসমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেন, খোকা ইলিশে যে বাজার ছেয়ে গেছে, এটা ঠিক নয়৷ পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে৷ খোকা ইলিশের বিপণনে যাতে আরও লাগাম টানা যায়, তার চেষ্টা চলছে৷

দীর্ঘদিন আকাশবাণী কলকাতার বিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্বে থাকা স্বপ্নময় চক্রবর্তী অবশ্য মন্ত্রীর কথায় এতটা ভরসা পাচ্ছেন না৷ ইলিশের বিলুপ্তির আশঙ্কা তাঁর মনেও৷ বললেন, ‘‘যেখানে পরিযায়ী পাখিদের খুব বেশি হারে শিকার করা হয়, সেখানে তাদের আনাগোনা ক্রমশ কমতে থাকে৷ ইলিশের ক্ষেত্রেও সেটা হতে পারে৷ হয়ত ইলিশের এমন জিনগত পরিবর্তন হলো, তার ফলে আমাদের জলসীমায় ইলিশের সংখ্যা কমে গেল৷’’

অধ্যাপক দাসের মতো স্বপ্নময়বাবু জনতার সচেতনতায় ভরসা রাখতে পারছেন না৷ তাঁর সরস মন্তব্য, ‘‘দু'শ টাকা কেজিতে যদি ঝোলে ইলিশের গন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে সেটা খোকা না ধেড়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার স্বাদ পাবে কিনা, পরের বছর ইলিশ পাবো কিনা — এ সব আর কে ভাবতে চায় বলুন?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন