আয়ারাম গয়ারাম বিশ্বাস | আলাপ | DW | 25.09.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

আয়ারাম গয়ারাম বিশ্বাস

কারো কাছে যাওয়া যাবে না, কারো সঙ্গে মেশা যাবে না, কাউকে ছোঁয়া যাবে না- এই করোনাকালের পৃথিবীতে বেড়ে যাচ্ছে শুধু অবিশ্বাসের বাতাবরণ৷

নেই নেই করেও মানুষের মধ্যে যেটুকু বিশ্বাস বেঁচে ছিল, করোনাকালে সেটাও গেল৷ নিজের ছায়াকেও মানুষ বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছেন৷ অন্য লোক পাশে এসে দাঁড়ালেই সন্দেহ৷ করোনার বাহক নয় তো! সাবধানের মার নেই, এই প্রবাদবাক্যকে আঁকড়ে ধরে শুধু অবিশ্বাসের বাতাবরণে বেঁচে থাকা৷ যে সামাজিক নৈকট্য এতদিন মানুষকে স্বস্তি দিত, সেটাও উধাও৷ কারণ, অনবরত সব জায়গা থেকে বলা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে৷ অন্তত ছয় ফুটের দূরত্ব৷ না হলেই বিপদ৷ কারো কাছ থেকে ধাওয়া করে আসতে পারে করোনার ভাইরাস৷ রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকার গানের মতো-- ‘ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছি’৷  শুধু এই অস্পৃশ্যতার এবং অবিশ্বাসের বাতাবরণে বেঁচে থাকা৷

এভাবেই বিশ্বাসের ভিতরে ঢুকে পড়ে অবিশ্বাসের ঘুনপোকা৷ কুরে কুরে খেতে থাকে সম্পর্ক৷ মানুষের সঙ্গে মানুষের৷ স্বামী-স্ত্রী, বাবা-ছেলে, শাশুড়ি-বউ, চিকিৎসক-রোগী, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর, সব সম্পর্কের মধ্যে আরো বেশি করে ঢুকে পড়ে অবিশ্বাসের বিষ৷

এমন নয় যে, বিশ্বাসহীনতার দুনিয়া আগে ছিল না৷ করোনাকালে হুশ করে চলে এলো৷ আগেও ছিল৷ বহালতবিয়তে ছিল৷ সেই বিশ্বাসহীন অবিশ্বাসের কাহিনি তো কম নেই৷ যে ক্ষেত্রের দিকে তাকানো যাবে, কান পাতলেই সেখানে শোনা যাবে রাশি রাশি ঘটনা৷ কলকাতা ময়দানের ঘটনা তো রূপকথাসম৷ আগের দিন এক ক্লাবে সই করার পরের দিনই অন্য ক্লাবের জার্সি পরে মাঠে নেমে পড়া, কলকাতা ফুটবলে এমন ঘটনা হাতে ধর্ষণ করোনাণে শেষ করা যাবে না৷ একটা ক্লাবকে টোকেন জমা দিয়ে আগাম নেয়ার পর সোজা অন্য ক্লাবের কাছে চলে যাওয়া৷

আর রাজনীতির কথা তো অমৃতসমান৷ ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করলেন৷ ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের কালো অধ্যায় ছিল সেটা৷ শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা জরুরি অবস্থা তুলেও নিলেন৷ জরুরি অবস্থা সমর্থন করার পর হাওয়া বুঝে জগজীবন রামের মতো নেতা কংগ্রেস ছেড়ে ভিড়ে গেলেন জনতা পার্টিতে৷ হরিয়ানার রাজনীতিক গয়া লালের কাহিনি তো আরো চমকপ্রদ৷ ১৯৬৭ সালের কথা৷ গয়া লাল নির্দল হয়ে জিতে এসেছিলেন৷ তিনি তারপর কংগ্রেসে যোগ দিলেন৷ তারপর কংগ্রেস ছেড়ে চলে গেলেন ইউনাইটেড ফ্রন্টে৷ সেখান থেকে আবার কংগ্রেসে৷ নয় ঘণ্টার মধ্যে ফের ফ্রন্টে৷ এই যাওয়া-আসা হয়েছিল মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে৷ তখন কংগ্রেস নেতা বীরেন্দ্র সিং দ্বিতীয়বার গয়া লালকে কংগ্রেসে যোগদান করিয়ে বলেছিলেন, গয়া রাম এখন আয়া রাম৷ মানে কংগ্রেসে এসে গেছেন৷ সেই থেকে চালু হয়ে গেল আয়ারাম গয়ারাম বাক্যবন্ধ৷ এরকম দলবদলানো রাজনীতিককে বলা হয় আয়ারাম গয়ারাম৷

তা অত দূরের কথা বলারও দরকার নেই৷ হালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপি-তে যোগ দিলেন গোয়ালিয়র রাজপরিবারের সন্তান জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া৷ এতদিন উঠতে বসতে বিজেপি তথা মোদীর সমালোচনা করে সেই বিজেপি-তে যোগ দিয়ে বললেন, ‘টাইগার আভি জিন্দা হ্যায়’৷ নিঃসন্দেহে জিন্দা, কিন্তু মৃত্যু তো হলো বেচারা বিশ্বাসের৷ তাঁর পুরনো দলের, সাধারণ লোকের৷ রাজস্থানে শচিন পাইলটই বা কী করলেন৷ যে দলকে তিনি জিতিয়ে আনতে প্রাণপাত করেছেন, তাকেই ক্ষমতাচ্যূত করার চেষ্টা করলেন, না পেরে আবার সেই দলে ফিরলেন৷ কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যে এভাবেই তো কংগ্রেস সাংসদরা ভোটদাতার বিশ্বাসভঙ্গ করে বিজেপি-তে যোগ দিয়ে দলের সরকার ফেলে দিলেন৷ নীতীশ কুমারও তো সেই দলেই পড়েন৷ জিতে এলেন বিজোপি বিরোধী প্রচার করে এবং মহাজোট গঠন করে৷ তারপর কিছুদিনের মধ্যেই রাতারাতি বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন সরকার গঠন করলেন৷

তাই বলছিলাম, বিশ্বাসহীনতা আগেও ছিল৷ হয়তো বা মানব চরিত্রের কারণে৷ করোনার সময় সেই বিশ্বাসের মধ্যেই আরো বেশি করে  ঢুকে গেল অবিশ্বাসের বিজ৷ শুধু সন্দেহ, শুধু অবিশ্বাস৷ লোকের ছোঁয়া এড়িয়ে চলা৷ লোকের থেকে দূরে থাকা৷ এটাই বিশ্বাস করা যে, যে কোনো মানুষ আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারেন করোনা ভাইরাস৷ ফলে অবিশ্বাস মাত্রাছাড়া জায়গায় পৌঁছে গেল৷ রাতে চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসাকর্মীদের বাহবা দিয়ে থালা-বাটি বাজিয়ে, টর্চের আলো জ্বালিয়ে রেখে তাঁদের সম্মান দেখানোর পরের দিন সকালে সেই চিকিৎসক বা চিকিৎসাকর্মীরাই বাড়ি ফিরলে সদলে গিয়ে হামলা সোজা বলে দেয়া, ‘আপনার তো এখানে থাকা যাবে না৷ করোনার চিকিৎসা করছেন৷ এখানেও করোনা এনে ফেলবেন৷’ হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে গেলে শুনতে হলো, আগে করোনার পরীক্ষা করতে হবে, তারপর ভর্তি৷ হার্ট অ্যাটাকের রোগী পথেই মারা গেলেন৷ অবিশ্বাস কোন পর্যায়ে গেলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়৷

Goutam Hore

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে

এই অবিশ্বাসই আরো বেশি করে ছড়িয়ে গেল বিভিন্ন জায়গায়৷ পশ্চিমবঙ্গে শয্যাশায়ী শাশুড়িকে বিছানা থেকে টেনে ফেলে দিলেন বধূ৷ স্ত্রীর ওপর স্বামীর অত্যাচার বেড়ে গেল৷ গার্হস্থ হিংসার ঘটনা হু হু করে বাড়তে লাগল৷ ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এমনকী করোনা রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে ধর্ষণ করা হলো৷ রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে ওঠে তখন বিশ্বাস কি টিকে থাকে? থাকা সম্ভব? আমরা তো সমানে দেখি এই বিশ্বাসহীনতার নিদর্শন৷ কাদের উস্কানিতে হিংসা হয়, আর কাদের নামে অভিযোগ করা হয়৷ বাংলা টিভি সিরিয়ালের দিকে চোখ ফেরান৷ দেখবেন শুধু বিশ্বাসহীনতার গল্প৷ এক স্ত্রী থাকতে আবার বিয়ে করছেন নায়ক৷ বা স্ত্রী ঘরে এলেন, অমনি তাঁকে অপদস্থ করার, বিয়ে ভাঙার চক্রান্ত শুরু করলেন আত্মীয়রা৷ স্বামীর, শ্বশুর, শাশুড়ির মনে ঢুকিয়ে দেয়া হতে থাকল অবিশ্বাস৷ সেটাই গিলছে আমজনতা৷ আর তাদের ভিতর সজ্ঞানে বা অজান্তে  ঢুকে যাচ্ছে অবিশ্বাসের বিষ৷ শুধু সন্দেহ৷ সহকর্মীকে, আত্মীয়কে, বন্ধুকে, সবাইকে৷

এই অবিশ্বাসই বাড়িয়ে দিল করোনা৷ করোনা আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়েছে৷ আমাদের একা করে দিয়েছে৷ আর ভিতরে আরো বেশি করে ঢুকিয়ে দিয়েছে অবিশ্বাসের পৃথিবী৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন