আসুন ঘুরে দাঁড়াই নিজের যত্ন করি, প্রিয়জনেরও | আলাপ | DW | 11.02.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

আসুন ঘুরে দাঁড়াই নিজের যত্ন করি, প্রিয়জনেরও

বাংলাদেশে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শতাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে৷ খবরটি পড়ে চমকে উঠেছিলাম৷ কেন এত প্রাণের অপচয়? কী এর কারণ? সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপ, একাকিত্ব, বিষাদ, হতাশা, প্রেম, প্রতারণা নাকি অন্যকিছু৷

কেন পৃথিবীতে বেঁচে থাকা এতটাই অর্থহীন মনে হয় যে মানুষ নিজের হাতে নিজের জীবন নিয়ে নেয়৷

পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে৷ সংসার-ছোট্ট দুই বাচ্চা-অফিস একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে খানিকটা দিশেহারা আমিও সেসব খবরে বারবার থমকে গিয়েছি, মেলাতে বসেছি অংক৷ বুঝতে চেয়েছি কেনো এমনটা করেছেন তারা, কোন না পাওয়া থেকে তাদের মনে এত ‍অভিমান জমা হয়েছিল৷

কয়েকদিন আগে আবু মহসিন খান নামে একজন ব্যবসায়ী ফেসবুকে লাইভে এসে নিজের লাইসেন্স করা বন্দুক দিয়ে আত্মহত্যা করেন৷ দেখবো না দেখবো না করেও সেই লাইভ ভিডিওটি দেখেছি৷

ভিডিও দেখে যা বুঝেছি তাতে মনে হয়েছে, এক সময়ের সফল ব্যবসায়ী আবু মহসিন এখন আর্থিকভাবে প্রতারিত একজন মানুষ, ব্যবসাও হারিয়েছেন৷ কাছের মানুষরাই তারা টাকাপয়সা মেরে দিয়ে তাকে নিঃস্ব করেছে৷ স্ত্রী আগেই মারা গেছেন৷ ছেলে বিদেশে, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে৷ ছিলেন ক্যান্সার আক্রান্ত৷ দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো মানুষটি কোভিড মহামারির কারণে সেটাও করতে পারছিলেন না বলে জানিয়েছেন তার ভাই৷ গত দুই বছর ধরে বাসায় একাই থাকতেন আবু মহসিন৷

তবে কী অসুস্থ শরীরে একাকিত্বের চাপ আর নিতে পারছিলেন না তিনি৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী সেটাই মনে করেন৷ একটি দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক কামাল বলেছেন, কথা বলার এবং তার কথা শোনার লোক পেলে আবু মহসিন হয়তো আত্মহত্যা করতেন না৷

প্রযুক্তির উন্নয়নে পৃথিবী যেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে, তেমনি আমরা এখন একক পরিবার গড়ে তুলছি৷ বাবা-মা আর সন্তান, এই নিয়েই পরিবার৷ সেই সন্তান যখন উন্নত জীবনের আশায় বা বিয়ে করে দূরে চলে যায় তখন বাবা-মা একা হয়ে পড়েন৷ সঙ্গীহীন হয়ে পড়লে তো কথাই নেই৷ তখন তারা চরম একাকিত্বে ভোগেন৷

আবু মহসিনের আত্মহত্যা শহুরে মানুষদের অন্তরআত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছে৷ কেউ কেউ বাবাকে সময় না দেওয়ার জন্য তার ছেলে-মেয়ের বিচার করতে বসে গেছেন৷ ভুল আসলে কার কিংবা আদপে কারো ভুলে এ ঘটনা ঘটেছে কিনা আমি সে বিতর্কে আর না যাই৷

কারণ, আমিও চাই আমার সন্তানরা উন্নত জীবন পাক৷ জানি তার বিনিময়ে আমাদের অপেক্ষায় আছে একাকিত্ব৷ সে একাকিত্ব সামাল দিতে পাবো কিনা, সময় তার উত্তর দেবে৷

এখনো পর্যন্ত নিজেকে আমি একজন শক্ত মনের নারী বলেই জানি৷ তবে কী যারা আত্মহত্যা করেন তারা মানসিকভাবে দুর্বল? নিজের অতীত ঘেঁটে জোর দিয়ে এ কথাও বলতে পারছি না৷ অসময়ে বাবার পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া, হঠাৎ করেই নিষ্ঠুর পৃথিবীর নগ্ন চেহারা সামনে চলে আসা, প্রেমে টানাপড়েন বা শুরুতে সংসার জীবনে মানিয়ে নেয়ার লড়াইতে বেসামাল আমার কাছেও এ জীবন অর্থহীন মনে হয়েছিল৷ বিষন্নতা কাটাতে টানা দুই বছর চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেয়েছি৷

এই বিষন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকা; আত্মহত্যার পেছনের বড় কারণগুলো অন্যতম৷

২০১৮-১৯ সালের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১৭% বা দুই কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত৷ তাদের ১০০ জনের মধ্যে ৭ জন ভুগছেন বিষণ্ণতায় এবং তাদের ৯২ শতাংশই রয়েছেন চিকিৎসার আওতার বাইরে৷

আমাদের দেশ মনরোগ এখনো ট্যাবু৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলে এটা নিয়ে আমরা মুখ খুলতে চাই না, চিকিৎসা তো দূরের কথা৷ মহামারির ধাক্কায় মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা মনের স্বাস্থ্য আরো খারাপ করে তুলেছে৷

গত বছর অগাস্টে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদনান সাকিবের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়৷ লাশের পাশে পড়ে থাকা চিরকুট থেকে জানা যায় ‘মানসিক চাপের' কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন৷

পরের মাসেই ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহদী অপুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয় ঢাকার একটি মেস থেকে৷ লেখাপড়া শেষ করে যিনি চাকরির পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন৷ আমার একজন সহকর্মী ব্যক্তিগতভাবে অপুকে চিনতেন৷ অপুর আত্মহত্যা খবরে মুষড়ে পড়া ওই সহকর্মী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, কতটা বুদ্ধিদীপ্ত ছিলেন অপু৷ প্রচুর পড়তেন, তাই জানতেও অনেক৷ ছিলেন প্রতিবাদী, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিয়মিত যোগ দিতেন৷ তার মৃত্যুর পর জানা যায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদে পরীক্ষায় এমসিকিউ এবং লিখিত পরীক্ষায় তিনি প্রথম হয়েছেন৷

তবে কেন তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিলেন৷ সহপাঠীরা জানান, অপু সম্মান প্রথম বর্ষে থাকার সময়ও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন৷ তবে কি মানসিক কোনো রোগে ভুগছিলেন অপু? তার মধ্যে কী আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল৷

সাকিবের আত্মহত্যা বা অপুর আগেও একবার আত্মহত্যা চেষ্টা সবই মানসিক চাপ থেকে৷ কে তাদের উপর এই মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল? পরিবার, সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় নাকি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা৷

সন্তানের ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে গিয়ে বাবা-মা তাদের উপর এতটাই ‍চাপ দেয় যে পরীক্ষার ফল ‍খারাপ হলে কেউ কেউ লজ্জায় ভয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়৷ এক যুগের সাংবাদিকতায় আমি দেখেছি, বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন যেমন ছাত্রছাত্রীদের উল্লাসের খবর-ছবি মহাসমারোহে প্রকাশ পায়৷ তেমনি পরীক্ষায় ফেল করে লজ্জায় আত্মহত্যার খবরও ছোট করে প্রকাশ করতে হয়৷ বুকের মানিক হারিয়ে বাবা-মা বুক চাপড়ে কাঁদে৷

কিংবা স্বামী ঘরে নির্যাতিত মেয়েটি যখন নিজ বাড়িতে ফিরে আসার আকুতি জানায়৷ সমাজের চাপে বাবা-মা তাকে মানিয়ে নিতে বলে৷ নির্যাতিত হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মেয়েটি আত্মহত্যা করলে মৃতদেহ নিয়ে বিলাপ করে তার পরিবার৷ অথচ তাকে ফিরতে দিলে হয়তো সে বেঁচে যেত৷ আমার ছোট ফুপুকে আমরা এভাবেই হারিয়েছি৷ আড়াই বছর আর ছয় ‍মাসের দুইটি বাচ্চা রেখে ফুপু বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন৷ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাদীকে মেয়ের জন্য চোখের পানি ফেলতে দেখেছি৷ সমাজের চাপেই হয়তো দাদা-দাদী মেয়ের অবস্থা জেনেও তাকে ফিরে আসতে দেননি৷

প্রেমঘটিত কারণেও অনেক উঠতি বয়সের ছেলে মেয়ে আত্মহত্যা করছে৷ তবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এই প্রবণতা বেশ খানিকটা কমে এসেছে৷ বিয়ে নিয়ে অভিভাবকরা এখন অনেক বেশি উদার৷ তারা ছেলে-মেয়ের পছন্দের সম্মান দিচ্ছেন৷

নানা গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যা করা মানুষদের ৯০ শতাংশই সে সময়ে মনরোগে ভোগেন; বিষন্নতা যার অন্যতম৷ নানা কারণে তার মধ্যে বিষন্নতার সৃষ্টি হতে পারে৷

শীত প্রধান উন্নত দেশগুলোতে আবহাওয়ার কারণেও অনেক মানুষ বিষন্নতায় ভোগে৷ তাদের কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেন৷ সেখানে সমাজ ব্যবস্থা অনেক উদার, পরিবার থেকেও তেমন চাপ নেই৷ রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব নেয়, নিরাপত্তা দেয়৷ কিন্তু আত্মহত্যা ঠেকাতে পারে না৷

শামীমা নাসরিন, সাংবাদিক

শামীমা নাসরিন, সাংবাদিক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যায় করেন৷ শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মহত্যার এ হার অনকেটা কমিয়ে আনা সম্ভব৷

আত্মহত্যা করার আগে সেই মানুষের মধ্যে নানা রকম লক্ষণ দেখা যায়৷ গবেষকেরা এমনটাই বলেছেন৷ কাছের মানুষরা একটু খেয়াল করলে তা বুঝতে পারবেন৷ সে লক্ষণ হতে পারে, স্বভাববিরুদ্ধভাবে চুপচাপ বা খিটখিটে হয়ে পড়া৷ নিজেকে দোষারোপ বা নিজের ক্ষতির চেষ্টা৷ রাগ, জেদ, অভিমান বেড়ে যাওয়া, বিনা কারণে কান্না করা বা খুশি হয়ে ওঠা৷ নিজের সব কিছু গোছাতে বা কাউকে সব দেখে রাখতে বলা ইত্যাদি৷

আসুন স্বজন, প্রিয়জন, বন্ধু বা প্রতিবেশী কারো মধ্যে এই লক্ষণ দেখতে পেলে এগিয়ে যাই৷ তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনি৷ শত ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত তার খোঁজ রাখি৷ তাকে বোঝাই, সব পরিস্থিতিতে তার পাশে আছি৷ শক্ত করে তার হাতটা ধরি৷

করোনা মহামারীর এ বন্দি সময়ে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে৷ বাংলাদেশে এই প্রথম এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ১০১ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা সেটা প্রমাণ করেছে৷ প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসবে এক একটি বেদনা কাব্য৷

দুঃখ, কষ্ট, রোগ-শোক, বিপর্যয়, অবহেলা-অপমান সব মানুষের জীবনেই থাকে৷ শুধু আমি কষ্টে আছি, বাকি দুনিয়া হাসছে বিষয়টা কখনোই তেমন নয়৷ তাই আসুন ঘুরে দাঁড়াই৷ নিজের যত্ন করি৷ শরীরের পাশপাশি মনের যত্ন করি৷ যখন মনে হবে এ জীবন আর বইতে পারছি না তখন কারো সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি৷ প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই৷ মনোরোগ মানেই আমি পাগল নই বা পাগল হয়ে যাচ্ছি না‌৷ সমাজের এই ট্যাবু ভেঙ্গে বেরিয়ে আসি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়