আসামে ভিত্তিবর্ষ নিয়ে বিতর্ক, ক্ষুব্ধ বাঙালিরা | বিশ্ব | DW | 13.08.2020

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

আসামে ভিত্তিবর্ষ নিয়ে বিতর্ক, ক্ষুব্ধ বাঙালিরা

আসাম নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্যানেলের সুপারিশ, ১৯৫১ বা তার আগে থেকে যাঁরা সেখানে আছেন, তাঁরাই মূল বাসিন্দা। এই সুপারিশ মানা হলে আসামে বিপুল সংখ্যক বাঙালি চরম বিপাকে পড়বেন।

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

আসাম নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্যানেলের সুপারিশ, ১৯৫১ বা তার আগে থেকে যাঁরা সেখানে আছেন, তাঁরাই মূল বাসিন্দা। এই সুপারিশ মানা হলে আসামে বিপুল সংখ্যক বাঙালি চরম বিপাকে পড়বেন।

আসাম চুক্তি অনুযায়ী কাট অফ ইয়ার বা ভিত্তিবর্ষ হলো ১৯৭১ সাল। সেই বছর ২৪ অগাস্টের আগে যাঁরা আসামে এসেছেন, তাঁরা সকলেই নাগরিকত্ব পাবেন। নাগরিকত্ব আইনেও ১৯৭১-কেই ভিত্তিবর্ষ হিসাবে মানা হয়েছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্যানেলের সুপারিশ হলো, অসমীয় হিসাবে (অসমীয়, অর্থাৎ যারা আসামে বসবাস করেন) তাঁদেরই স্বীকৃতি দেওয়া হবে, যাঁরা ১৯৫১ বা তার আগে থেকে আসামে আছেন। আর তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন। জমি কেনার পূর্ণ অধিকার তাঁদেরই থাকবে। ভোটে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ সংরক্ষণ তাঁদের জন্য থাকবে। এই সব সুপারিশ নিয়েই ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছে আসামে।

আসাম চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, সেখানকার লোকেদের ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক পরিচয় রক্ষা করার জন্য আইনগত, প্রশাসনিক, সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকবে। কিন্তু অসমীয় কারা, তাঁদের জন্য কী রক্ষাকবচ থাকবে, তা বলা হয়নি। সেটা চিহ্নিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক একটা প্যানেল তৈরি করেছিল। তারা গত ফেব্রুয়ারিতে সরকারকে রিপোর্ট দেয়। সরকার তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছিল না। দিন কয়েক আগে কমিটির চারজন সদস্য এই রিপোর্টের সুপারিশ ফাঁস করে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সুপারিশ রূপায়নে এত দেরি হচ্ছে দেখে তাঁরা তা জনসমক্ষে নিয়ে এলেন।

তারপরেই শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক এবং আতঙ্ক। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ এক্সাইজ অ্যান্ড কাস্টমসের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং পারিবারিকসূত্রে শিলচরের মানুষ সুমিত দত্ত মজুমদার ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ''১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ হিসাবে নেওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা রয়েছে। সে সময়ে আসামে কারা ছিলেন তা ঠিক হতে পারে ১৯৫১ সালের এনআরসি-র ভিত্তিতে। কিন্তু সেই এনআরসিতে আসামের অনেক এলাকা ধরা নেই।''

সমস্যাটা আরো গভীর। ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ করলে সেই সময় থেকে শুরু করে ১৯৭১ পর্যন্ত যাঁরা আসামে গেছেন, থাকছেন, তাঁদের কী হবে? এঁদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষই বাঙালি। হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষই আছেন। আসাম চুক্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৪ অগাস্ট পর্যন্ত যাঁরা এসেছেন, তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সুপারিশ মানলে নাগরিক থাকলেও তাঁরা আসামে সরকারি চাকরি পাবেন না। ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। জমির মালিকানা নিয়েও সমস্যা হবে। তা হলে তাঁদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? যোজনা কমিশনের প্রাক্তন উচ্চপদস্থ আমলা, লেখক এবং আহোম রাজাদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করা অমিতাভ রায় ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ''যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা মানলে আসাম চুক্তি থেকে সরে যেতে হবে। এর ফলে আসাম আবার অগ্নিগর্ভ হবে।''

অসমীয়া প্রতিদিনের প্রবীণ সাংবাদিক আশিস গুপ্তও মনে করেন, এর ফলে নিঃসন্দেহে আসামে উত্তেজনা বাড়বে। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেছেন, ''বরাক উপত্যকায় ইতিমধ্যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ৭১-কে ভিত্তিবর্ষ হিসাবে মেনে নিয়েই তো আসাম চুক্তি হয়েছিল। তারপর এখন অসমীয় কারা তা নির্ধারণ করতে ভিত্তিবর্ষ কুড়ি বছর পিছিয়ে দেওয়া মানে আসামে আগুন জ্বলার রাস্তা পরিষ্কার করা।'' 

সুমিতবাবুর মত হলো, ''বরাক উপত্যকায় এর ফলে হয়ত পৃথক রাজ্যের দাবি জোরদার হবে। সেটা হলে ব্রহ্মপুত্র ভ্যালিতে যে বাঙালিরা আছেন, তাঁদের অবস্থা আরও খারাপ হবে।'' আশিস গুপ্তের মতে, ''আসামে আর এক বছর পরে ভোট। তার আগে এই বিষয়টি এইভাবে নিয়ে আসার মানে এর ভিত্তিতেই ভোট করার চেষ্টা। সরকারের ব্যর্থতা ধামাচাপা দিয়ে লোকের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রয়াস।''

আসামে বারবার বাঙালি মুসলিমদের নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। সুমিতবাবু জানিয়েছেন, ''মুসলিমরা আসামে এসেছেন ১৬১৫ সাল থেকে এবং প্রথম দফায় তাঁদের আসামে আসা বজায় থাকে ১৬৬২ সালে মীরজুমলার সময় পর্যন্ত। তারপর স্যার সৈয়দ সাহদুল্লাহ ১৯৩০-এর দশকে মুসলিমদের আসামে এসে বসবাস করার জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে আসামে মুসলিমদের আসার একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে।''

কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্যানেলের রিপোর্ট মানলে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম সকলেই বিপাকে পড়তে বাধ্য বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাছাড়া আসামে রাজবংশী, বোড়ো থেকে শুরু করে প্রচুর জনজাতি আছে, যাঁদের ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, পরিচয় আলাদা। তাঁদের কী হবে?

 প্রশ্ন হলো, এই সুপারিশ কি সরকার গ্রহণ করবে? সেই জবাব ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মানছেন, এই বিতর্কের ফলে আসাম আবার অশান্ত হতে পারে। সেটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়।