আর কোনোদিন আদালতে যাবেন না অজয় রায় | বিশ্ব | DW | 09.12.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

আর কোনোদিন আদালতে যাবেন না অজয় রায়

পুত্র হত্যার বিচার চেয়েছিলেন৷ বয়স হয়েছে, শরীর কাহিল হতে হতে চলার শক্তি হারাতে বসেছে, অথচ বিচারকাজ এগোচ্ছে না দেখে বলেছিলেন, ‘‘আমি আর আদালতে যাবো না৷’’ সত্যিই আর কোনোদিন বিচার চাইতে আদালতে যাবেন না অজয় রায়৷

সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধ্যাপক অজয় রায় মৃত্যুবরণ করেন৷ শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা, পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা অজয় রায়ের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর৷ ফুসফুসের সংক্রমণের পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি৷

বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় হতাশ হয়ে কয়েকমাস আগে বলেছিলেন, ‘‘আমি আর আদালতে যাবো না৷ সন্তান হারানোর বেদনা নতুন করে মনে জাগাতে চাই না৷'' তার এই বক্তব্যের পর অভিজিতের বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়৷ মামলাটি চলছে সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে৷ গত ১০ অক্টোবর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে অপসারণ করা হয়৷ তবে সেই পদে এখন পর্যন্ত নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি৷ সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটাররা মামলাটি চালাচ্ছেন৷ 

অডিও শুনুন 02:21

‘‘প্রায় ৫ বছরেও শেষ হয়নি বিচার’’

অধ্যাপক অজয় রায়ের মৃত্যুর পর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত ছেলের বিচার দেখে যেতে পারলেন না অধ্যাপক অজয় রায়৷ প্রায় ৫ বছরেও শেষ হয়নি বিচার৷ এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জ্বার৷ আমিও ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারব এটা বিশ্বাস করি না৷ আমিও আদালতে যাচ্ছি না৷ তবে আদালত যদি মনে করে, আমাকে যেতে হবে, আমি যাবো৷ কিন্তু আমি বিচার চাই না৷ শুধু চাই অপশক্তির বিরুদ্ধে মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক৷''

অধ্যাপক অজয় রায়ের মতো অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও সন্তানহারা৷ অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায় ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জঙ্গিদের হাতে খুন হন৷ আবুল কাশেম ফজলুল হকের ছেলে ফয়সাল আরেফীন দীপনও জঙ্গিদের হাতে খুন হন একই বছরের ৩১ অক্টোবর, আজিজ সুপার মার্কেটে নিজের প্রতিষ্ঠানে৷ অধ্যাপক হক বলেন, ‘‘বিচার চেয়ে কী হবে? কে বিচার করবে? তবে রাষ্ট্রের জন্য বিচারের প্রয়োজন৷ আমরা চাই, রাষ্ট্র এই কাজটা করুক৷ অপশক্তি পরাজিত হোক৷'' 

 

বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে পরিত্রাণের উপায় জানতে চাইলে ব্যারিস্টার সারা হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অধ্যাপক অজয় রায় তো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বিচার ব্যবস্থার অবস্থা৷ এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার৷ মৃত্যুর আগে আমরা তার ছেলে হত্যার বিচার করতে পারলাম না৷ শুধু উনি নন, এমন বহু উদাহরণ আমাদের আছে৷ শুধুমাত্র রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি কোনো হত্যার বিচার দ্রুত করতে বলা হয়, তখন সেটা হচ্ছে৷ কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হচ্ছে না৷ আরেকটি কথা বলি, কাল আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু হচ্ছে৷ সেখানে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে৷ আমার প্রশ্ন, এই বিচারে বাংলাদেশের আগ্রহ আছে, কিন্তু দেশের মধ্যে যে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটার তো বিচার হচ্ছে না৷ আমরা চাই সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হোক, সবাই বিচার পাক৷''

একুশের বইমেলা থেকে বেরিয়ে জঙ্গিদের হামলায় মারা যান অভিজিৎ৷ তারপর তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অজয় রায় বাদী হয়ে মামলা করেন৷ হত্যাকাণ্ডের চার বছর পর গত ১৩ মার্চ ছয় জঙ্গিকে আসামি করে এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দেন তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)-র পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম৷ গত ১ অগাস্ট আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার৷

না যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত গত ২৯ অক্টোবর আদালতে সাক্ষ্য দেন অজয় রায়৷ বিচারকের এজলাসে চেয়ারে বসে জবানবন্দি দেন তিনি৷ তাকে জেরাও করা হয়৷ জেরার এক পর্যায়ে অজয় রায় বিরক্তি প্রকাশ করেন৷ তিনি আসামিপক্ষের আইনজীবীদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করার কারণ জানতে চান৷ পরে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে বলেন, ‘‘আমি বয়স্ক৷ আমি আর আদালতে আসতে পারবো না৷'' এ সময় বিচারক বলেন, ‘‘আপনার সাক্ষ্য দেওয়া আজকেই শেষ হবে৷ আর আসতে হবে না৷'' পরে আইনজীবীরা জেরা শেষ করেন৷

অভিজিৎ হত্যার পর ওই বছরেই তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা ফেসবুকে দীর্ঘ পোষ্ট দিয়ে বলেন, ‘‘আমিও বিচার চাই না৷'' বন্যা লিখেছিলেন, ‘‘দীপনের বাবার মতো আমিও বিচার চাই না৷ আমি নিশ্চিত জানি, টুটুলের স্ত্রী, দীপনের স্ত্রী, অনন্তের বোন, রাজিব, বাবু, নীলয়ের বন্ধুরাও আর বিচার চান না৷ বাবাকে (ড. অজয় রায়) ফোন করলে উনি এখনো আশার কথা বলেন, জীবন যে থেমে থাকে না সেটা বলেন, আমাকে অনুপ্রেরণা দেন যাতে আমি থেমে না যাই, আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে বলেন৷ আশি বছরের একজন সন্তানহারা পিতার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যাই, নিজেকে বলি, ওনারা এরকম ছিলেন বলেইতো একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলেন৷ কিন্তু আমরা পারিনি, আমাদের প্রজন্ম পারেনি, সংখ্যায় ওরা ক্রমাগত বাড়ছে, খালি মাঠে যেভাবে আগাছা বেড়ে ওঠে প্রবল উদ্যমে৷ আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতাই ওদের এভাবে আগাছার মতো বাড়তে দিচ্ছে৷''

অডিও শুনুন 03:48

‘‘মৃত্যুর আগে আমরা তার ছেলে হত্যার বিচার করতে পারলাম না’’

 

সরকারের সমালোচনা কলে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘এই সরকারের কাছ থেকেও কিছু চাওয়ার নেই আমাদের, একটাই অনুরোধ ওনাদের কাছে, দয়া করে দিনরাত আর ‘আমরা সেক্যুলার পার্টি' বলে গলা ফাটিয়ে নিজেদের এনার্জি নষ্ট করবেন না৷ আপনারা আপনাদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চুপ করেই থাকুন৷''  

বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় কিনা জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই তো মানুষ বিচার বঞ্চিত হচ্ছেন৷ আমাদের দেশে তো বিচারে শাস্তির হার খুবই কম৷ এর প্রধান কারণ দীর্ঘসূত্রিতা৷ রাষ্ট্র চাইলে যে দ্রুত বিচার হতে পারে, তার প্রমান নূসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা৷ ৫ সপ্তাহের মধ্যে কিন্তু পুলিশ চার্জশিট দিয়ে দিয়েছে৷ এরপর বিচারের রায়ও বের হয়েছে৷ আমি চাই বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে বের হতে সরকারের যে যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তার ব্যবস্থা করা হোক৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন