আর্সেনিক দূষণে মৃত্যু পরোয়ানা পশ্চিমবঙ্গে | বিশ্ব | DW | 24.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

আর্সেনিক দূষণে মৃত্যু পরোয়ানা পশ্চিমবঙ্গে

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশের জল আর্সেনিকে দূষিত৷ সেই জল পান করে ক্যানসারের মতো মারণরোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ৷ অনেকটা অগোচরে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়েছে আর্সেনিক৷

পোলিওর টিকা থেকে এইডস, এসব রোগ নিয়ে সরকারি স্তরে প্রচারের অভাব নেই৷ কিন্তু এটা কতজন মানুষ জানে যে, পশ্চিমবঙ্গের ১২টি জেলা আর্সেনিকে আক্রান্ত৷ সেটা এখন নয়, বহু বছর ধরেই৷ এই তথ্য উঠে এসেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায়৷ তবুও এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য নেই কোনো মহলে৷ ইদানীং আর্সেনিক কবলিত এলাকার মানুষেরা সচেতন হয়েছেন৷ তাঁরা জেনেছেন, জলে আর্সেনিকের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি হলে তা মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়৷ তবুও বিকল্প উপায় না পেয়ে গ্রামবাসীরা ওই পানিই পান করে চলেছেন৷ কার্যত অজান্তেই এগিয়ে যাচ্ছেন সর্বনাশের দিকে৷ 

অডিও শুনুন 01:28

‘‘আর্সেনিকের প্রভাবে ১,২০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন’’

আর্সেনিকের প্রকোপ

আর্সেনিক নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগের ছবি ধরা পড়েছে৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ২২টি ব্লকের মধ্যে ২১টি ব্লকই আর্সেনিক কবলিত৷ মুর্শিদাবাদের রানিনগর ব্লকের কাতলামারি, নদিয়ার করিমপুর, উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা ব্লকের অবস্থা খুবই করুণ৷ আবার আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ কমিটির তথ্য বলছে, এসব এলাকার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ যে জল পান করেন, তাতে আর্সেনিকের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি৷ এর ফলে তিলে তিলে, দিনের পর দিন ধীর গতিতে এখানকার মানুষজনের শরীরে বাসা বাঁধছে আর্সেনিকের বিষ৷ যে জলের অপর নাম জীবন, তা কীভাবে মৃত্যু ডেকে আনছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডাব্লিউএইচও বা  হু-র মতে, আর্সেনিকের স্বাভাবিক মাত্রা পানীয় জলে লিটার প্রতি ০ দশমিক ০১ মিলিলিটার এবং সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা ০ দশমিক ০৫ মিলিলিটার‍ প্রতি লিটার৷ অর্থাৎ, এর বেশি মাত্রায় আর্সেনিক থাকলে তা মানুষের কাছে বিষবৎ৷ আর আর্সেনিক জলে কত পরিমাণে রয়েছে, তা না জেনেই তো গ্রামবাসীরা খেয়ে চলেছেন দিনের পর দিন৷ এই ‘স্লো পয়জন'রূপী আর্সেনিক কমপক্ষে ৫-৬ বছর ধরে গ্রহণের ফলে শরীরে বাহ্যিক পরিবর্তন শুরু হয়৷ ততদিনে ভেতরে বড় ক্ষতি শুরু হয়ে যায়৷      

পশ্চিমবঙ্গ আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ কমিটির রাজ্য সম্পাদক অশোক দাস জানান, আর্সেনিকের প্রভাবে আজ পর্যন্ত ১,২০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন৷ আদতে এই সংখ্যাটা আরো বেশি৷ আর্সেনিক থেকে সবচেয়ে বেশি হয় ক্যানসার৷ তাই কোনো রোগীর ক্যানসার যে আর্সেনিকের ফলশ্রুতি, সেটা হিসাবের বাইরে থেকে যায়৷ সাধারণ চিকিৎসকরা এটাকে আর্সেনিকজনিত মৃত্যু বলে চিহ্নিত করতে পারেন না৷ তবু এই কমিটি নানা তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আর্সেনিকের শিকার মানুষদের সংখ্যা বের করেছেন৷ 

আর্সেনিকে লক্ষাধিক মানুষ অসুস্থ৷ আরো বেশি মানুষের অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গের ১২টি জেলার ২ কোটি মানুষ আর্সেনিক কবলিত এলাকায় বসবাস করে৷ এর মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের বসবাস গুরুতরভাবে আর্সেনিক দূষিত অঞ্চলে৷ অর্থাৎ, এই ১০ লক্ষ মানুষ যে কোনো সময় আর্সেনিকজনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে৷ যে এলাকায় আর্সেনিক রয়েছে, সেখানকার সব্জি, দুধ, মাছ, সবকিছুই বিষাক্ত হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে৷ সেই বিষ ছড়িয়ে পড়ছে অন্যত্র৷

কী বলছেন ভুক্তভোগীরা

কথা হচ্ছিল গাইঘাটার সংগ্রামপুর অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হেমেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের সঙ্গে৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের সবেতেই আর্সেনিক৷ ইদানীং কেনা জলই খাচ্ছি৷ আগে তো টিউব ওয়েলের জলই খেতাম৷'' তবে স্কুলে মিড ডে মিলের রান্না কীসে হয়? শিক্ষক জানালেন, ‘‘একটু কম আর্সেনিকের জলের যে কল, তা থেকেই মিড ডে মিলের রান্না হয়৷'' 

শিক্ষকের কথার অর্থ, স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জেনেশুনেই বিষ পান করাতে হচ্ছে৷ কয়েকদিন আগে উত্তর ২৪ পরগনারই দেগঙ্গার একটি স্কুলে মিড-ডে মিল রান্নার জলে আর্সেনিক নিয়ে ধুন্ধুমার হয়েছিল৷ সেটা নিছকই হিমশৈলের চূড়া মাত্র৷ সারা রাজ্যব্যাপীই এই ছবি৷ এই সমস্যার সমাধানে ব্যাপক চল হয়েছে বোতলজাত পানীয় জলের৷ এই জল কিনে খাচ্ছেন গ্রামবাসীরা৷ গাইঘাটা সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতিতে কাজ করেন সুকান্ত দেবনাথ৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘যতই বাড়িতে ফিল্টার লাগানো থাক, কিনে জল খাচ্ছি৷ আর্সেনিকের ব্যাপারে পঞ্চায়েত থেকে যা করার করে৷ কিছু টিউব ওয়েলে দেখছি লাল রং দেওয়া আছে৷ ট্যাপ লাইনের জলও আছে, সেটার ব্যাপারে বলতে পারব না৷ মাঝে মাঝে পরীক্ষা হয় দেখেছি৷'' কিন্তু বাস্তবে সকলের পক্ষে জল কেনার সামর্থ্য নেই৷

কেউ প্রশ্ন তোলেন, ‘‘জেনেশুনে মদ খেয়ে মরলে টাকা পাওয়া যায়, অজান্তে আর্সেনিক শরীরে ঢুকলে তো পুরো পরিবারটাই ভেসে যায়৷ দায়টা কার?'' কেউবা বলেন, ‘‘আমাদের বাড়ির মাটির নীচে সোনা পাওয়া গেলে সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকত? এখন বিষ পাওয়া যাচ্ছে, তাই বুঝি দায়টা আমাদের?''

আর্সেনিক যখন বিভীষিকা

আর্সেনিকের ছোবলের প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে রাজ্যের গ্রামে গ্রামে৷ একের পর এক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে আর্সেনিক কবলিত এলাকায়৷ যেমন, অশোকনগরের বাবুলাল তপাদার ক্যানসারে মারা গিয়েছেন৷ পরিবারে তিনি আর্সেনিকের পঞ্চম শিকার৷ আবার গাইঘাটার রবীন বিশ্বাসের বাড়ির জলে ৮৪ গুণ বেশি আর্সেনিক ছিল৷ ক্যানসারে মারা গিয়েছেন তিনি৷ পরিবারে চারজনের মৃত্যু হয়েছিল এই মারণ ব্যাধিতে৷ এখন একজনই বেঁচে রয়েছেন৷ তিনিও ক্যানসার আক্রান্ত৷ এছাড়া আর্সেনিকে আক্রান্ত অনেকের শরীরেই গুটি ওঠে, কিডনি, ফুসফুস বা লিভারে সংক্রমণ হয়৷

আর্সেনিক কতটা বিভীষিকা হয়ে উঠেছে, তার বর্ণনা করছিলেন নদিয়ার করিমপুরের বাসিন্দা শেখ আজাদ রহমান৷ ৫৩ বছরের এই প্রৌঢ়ের শরীরে অসংখ্য ছিটছিটে দাগই আর্সেনিকের প্রমাণ দিচ্ছিল৷ তাঁর গ্রামের নাম যাত্রাপুর৷ তিনি বলেন, ‘‘গত বছর গ্রামে ৩০ জন মারা গিয়েছেন৷ এ বছরেও চোখের সামনে মানুষ মারা যাচ্ছে৷ ডাক্তাররা বলছেন, বাঁচতে চাইলে জমিজমা বেচে বাইরে থাকুন৷ কিন্তু সেটা কি সম্ভব?''   

অডিও শুনুন 02:38

‘‘এ গ্রামের মেয়েদের তো বিয়ে দিতেও সমস্যা’’

     

যাত্রাপুর গ্রামের মৃত্যুমিছিলে বিমল দাস, রঞ্জিৎ ঘোষ, মজিব সর্দার, শৈবাল ঘোষের মতো অনেকের নামের লম্বা সংযোজন৷ শুধু মৃত্যু নয়, হচ্ছে বিবাহিতদের দাম্পত্য উজাড়ও৷ আর্সেনিকের জন্য ওয়াজিব সর্দারের সংসার ভাঙতে বসেছিল৷ তার আগেই অবশ্য ওয়াজিব আর্সেনিকের বলি হয়৷ শেখ আজাদ রহমান জানান, ‘‘এ গ্রামের মেয়েদের তো বিয়ে দিতেও সমস্যা৷ ঝকঝকে সাদা দাঁত কালো হয়ে যাচ্ছে৷ মুখ হনুমানের মতো কালো হয়ে যাচ্ছে৷ সন্তান-সন্ততিদের বিয়েশাদি দিয়ে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিতে পারলেই মঙ্গল৷''

গাইঘাটা ব্লকের সুটিয়া বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা জগবন্ধু মণ্ডল অভিযোগ করেন, ‘‘আগে পিজি হাসপাতালে আর্সেনিক রোগীদের চিকিৎসা হতো, এখন তো তা-ও হয় না৷ সরকারি মহলে তদ্বির বা পঞ্চায়েত ঘেরাও করতে গেলেও যে সময় লাগে, সেটাই বা পাই কোথা থেকে? সকলের পেটের ভাত জোগাড় করাটাই তো আগে৷''

রাজনীতির কারবারে আর্সেনিক

অতীত ও বর্তমান সরকারের আমলে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অনেক জল প্রকল্পের ফিতে কাটা হয়েছে কিংবা বিজ্ঞাপন দিয়ে আর্সেনিকমুক্ত জলের প্রচারে নলকূপও বসানো হয়েছে৷ সে সবে কোনো কাজই হয়নি৷ এমনই অভিযোগ শেখ আজাদ রহমানের৷ তাঁর দাবি, কোথাও কোথাও আর্সেনিক রুগীরা আর্সেনিকমুক্ত জলটুকুও পাচ্ছেন না৷ সেটা পৌঁছে যাচ্ছে প্রভাবশালী মানুষদের স্নানঘরে৷ তবে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মত আলাদা৷ গাইঘাটা সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতির সম্পাদক দিব্যেন্দু রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘আর্সেনিকের প্রকোপ এখন আর আগের মতো নেই৷ অনেকটাই ভালো৷ গঙ্গার জল পরিশ্রুতকরণের কাজ হচ্ছে৷ সবাই জল কিনে খাচ্ছেন৷ যাঁরা কিনতে পারছেন না, তাঁরা এটিএমের জল খাচ্ছেন৷ আর্সেনিক রুগীরা সরকারি চিকিৎসা পাচ্ছেন৷ সমস্যা নেই৷'' 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন