আরসিইপি চীনের রাজনৈতিক বার্তা! | বিশ্ব | DW | 18.11.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বিশ্ব

আরসিইপি চীনের রাজনৈতিক বার্তা!

বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সাম্প্রতিক আরসিইপি চুক্তিকে অ্যামেরিকার প্রতি চীনের রাজনৈতিক বার্তা বলে মনে করছেন।

চীনকে সামনে রেখে বিশ্বের সব চেয়ে বেশি দেশের বাণিজ্য চুক্তি সই করল এশিয়া প্যাসিফিকের ১৫টি দেশ। যা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এই চুক্তি কি আসলে এশিয়া প্যাসিফিকে চীনের শক্তি বৃদ্ধি করল? বস্তুত, কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে অ্যামেরিকা বিরোধী একটি ব্লক তৈরি করে রাখল চীন। ফলে চুক্তিটি যতটা অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক চুক্তিটি আসলে কী? চুক্তিটির নাম রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)। চীন-সহ এশিয়া প্যাসিফিকের ১৫টি দেশ এতে সই করেছে। যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন্সের মতো দেশগুলি যেমন আছে, তেমন লাও, কাম্বোডিয়ার মতো অপেক্ষাকৃত গরিব দেশগুলিও আছে। অন্য দিকে ফার ইস্ট বা অতি পূর্বের অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং নিউজিল্যান্ডও এই চুক্তিতে সই করেছে। রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রুনেইয়ের মতো দেশ। বলা হচ্ছে, দুই দশমিক দুই বিলিয়ন মানুষের অর্থনীতি নির্ভর করবে এই চুক্তির উপর। লেনদেন হবে প্রায় ছয় দশমিক তিন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে চুক্তিটি এক ব্যাপক অর্থনৈতিক চুক্তি, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

ইতিহাস এবং বাণিজ্য

তাকানো যাক ইতিহাসের দিকে। দক্ষিণ এশিয়ায় 'টিমপস'এর ভূমিকা অনেকেই জানেন। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন্স এবং সিঙ্গাপুরকে নিয়ে তৈরি টিমপস এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্র। পরবর্তীকালে ব্রুনেইয়ের রাজাও তাতে যোগ দেন, ফলে তখন তাতে বলা হতো বিটিমপস। এই দেশগুলি বাণিজ্যের জন্য দক্ষিণ চীন সাগর ব্যবহার করতো। যেখানে চীনের একাধিপত্য রয়েছে। ফলে বরাবরই তারা চীনের সঙ্গে এক ধরনের সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। যদিও এই প্রতিটি দেশের সঙ্গেই চীনের বিতর্কও আছে বিভিন্ন বিষয়ে। অন্য দিকে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের সঙ্গে চীনের বিতর্ক রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরের আধিপত্য নিয়ে। কিন্তু বাণিজ্যিক প্রয়োজনে তাদেরও দক্ষিণ চীন সাগর ব্যবহার করতে হয়। সাম্প্রতিক চুক্তিতে সেই বিষয়টিকেই মাথায় রাখা হয়েছে বলে প্রতিটি দেশেরই দাবি। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং জাপান এই কারণেই চুক্তিটিকে নেহাতই একটি অর্থনৈতিক বিষয় হি,সেবে উল্লেখ করছে।

চীনের রাজনীতি

দক্ষিণ চীন এবং এশিয়া প্যাসিফিকে চীনের এখন চূড়ান্ত আধিপত্য রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে চীন কার্যত একাই রাজা। এই পরিস্থিতিতে অ্যামেরিকা চীনের আধিপত্য কমানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে গত কয়েক মাস। ট্রাম্পের সরকার এশিয়া প্যাসিফিকে ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের সঙ্গে আলাদা ব্লক তৈরির চেষ্টা চালিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই চীন তা ভালো চোখে দেখেনি। চার দেশের বৈঠককে অনৈতিক বলে দাবি করেছে বেজিং। তারই মধ্যে ঘটে গিয়েছে মার্কিন নির্বাচন। রিপাবলিকান ট্রাম্প পরাজিত হয়েছেন। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। ট্রাম্প এখনো হার স্বীকার করেননি। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনে একপ্রকার অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছে, এই সময়টাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে চীন। অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক চুক্তির আড়ালে এশিয়া প্যাসিফিকে আরো একবার প্রমাণের লক্ষ্যেই এই বিশাল আয়োজন করা হলো। এবং সেখানে তথাকথিত মার্কিন বন্ধু অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং নিউজিল্যান্ডকেও আসতে বাধ্য করা হলো। নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থেই এই দেশগুলি এই চুক্তিতে সই করেছে। অর্থাৎ, এত দিন ধরে অ্যামেরিকা এশিয়া প্যাসিফিকে যে ব্লক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিল, তার পাল্টা একটি ব্লক তৈরি করে দেখালো চীন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ভারতীয় সেনার সাবেক লেফটন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ''এই চুক্তি যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। মার্কিন নির্বাচনের সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে চীন। এশিয়া প্যাসিফিকে নিজেদের আধিপত্য আরো একবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে।'' উৎপলবাবুর বক্তব্য, এই চুক্তিতে যে বিষয়গুলির কথা বলা হয়েছে, তার বাস্তবায়নের এখনই কোনো সুযোগ নেই। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, চুক্তিটি করে আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

আউটলুক পত্রিকার কূটনৈতিক সম্পাদক প্রণয় শর্মা ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ভারতের এই চুক্তিতে না থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক সময় এই ডিল নিয়ে আলোচনায় ভারতও ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বেরিয়ে যায়। এ বারের চুক্তির সময়েও ঠিক হয়েছে, ভারত পরবর্তীকালে এই চুক্তিতে যোগ দিতে চাইলে, তার সুযোগ থাকবে। যদিও চীন ভারতকে এই চুক্তির মধ্যে রাখতে প্রথমে বিশেষ আগ্রহী ছিল না। কিন্তু জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া ভারতকে রাখতে আগ্রহী। প্রণয়বাবুর বক্তব্য, ''যে কোনো চুক্তিরই একটি রাজনৈতিক দিক থাকে। এই চুক্তির ক্ষেত্রেও সেই ভূরাজনৈতিক দিকটি আছে। একসময় অ্যামেরিকা এশিয়া প্যাসিফিকে ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ তৈরি করে চীনকে বার্তা দিয়েছিল। গত কয়েক বছরে তা আর তত গুরুত্ব পায়নি। নতুন এই চুক্তির পর বাইডেনের অ্যামেরিকা সেই টিপিপি মডেলকে গুরুত্ব দিতে পারে।''

ভারত সেই মডেলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কারণ, একদিকে ভারত এবং অন্যদিকে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে রেখে অ্যামেরিকা সে ক্ষেত্রেএশিয়া প্যাসিফিকে চীনের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করতে পারে। অতীতেও তারা এমনই করেছে।

বিজ্ঞাপন