আমার শৈশবের ঝড়ের বয়স বেড়ে গেছে | আলাপ | DW | 24.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

আমার শৈশবের ঝড়ের বয়স বেড়ে গেছে

ঝড় মানেই মৃত্যু, বাস্তুহারা মানুষের মিছিল৷ উপকূল জুড়ে হাহাকার৷ এই প্রাকৃতিক নির্মমতা শুধু ঝড় আর মৃত্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়৷ এর রেশ থেকে যায়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে৷

ছোটবেলার ঝড়ের স্মৃতি মানেই কালবৈশাখি৷ মফস্বলের বাড়ির উঠোন কালো করে ঝড় আসত৷ দূরে পুরোনো সরকারি ক্যাম্প৷ তার সামনের মাঠের ওপারে বড় বড় নারকেল গাছগুলো মাথা ঝাঁকাতো মাতালের মতো৷ মনে হতো গল্পের বইয়ের একেকটা ডাইনি পাগলের মতো করছে৷

ঝড়ের সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি৷ বাতাসের তোপ কিছুটা কমলে বৃষ্টিতে ভিজে আম কুড়ানো৷ কী অদ্ভুত জীবন ছিল!

তবে কখনো কখনো ঝড়ের তোপ এতটাই থাকত যে, দরজা, জানালা পর্যন্ত খোলা যেত না৷ সব বন্ধ করে বসে বসে আকাশের গুড়গুড় শব্দ শোনা৷ টিনের চালে শিলা পড়ার শব্দ৷ এ সবই শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি৷ তখন ঝড় মানেই ছিল এই৷ আর যে দৃশ্য মনে পড়ে তা হলো, পরদিন সকালে দীঘির পড়ে গাছ উপড়ে পড়ে থাকা কিংবা ডাল ভেঙে পড়ার দৃশ্য৷ এসবই শৈশবের রোম্যান্টিকতা৷

পরে একটু বড় হয়ে জানলাম ঝড়ের আরেক দিকের কথা৷ জানলাম, ঝড়ে মানুষ মরে৷ ঘর বাড়ি উজার হয়৷ ঝড়ের বন্যায় নদীর পাড় ভাঙ্গে৷ ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম৷

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষদের ত্রাণ দিতে যাওয়াকে একটা বড় কাজ হিসেবেই দেখতাম৷ নৌকায় করে পানিবদ্ধ মানুষদের কাছে কাছে যাওয়া, ত্রাণের জন্য মুখিয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখ দেখে বড় মায়া হতো৷ আমরা ত্রাণ দিতাম শুকনো খাবার, কাপড় আর ঔষধ৷

নৌকায় একেক ধরনের ত্রাণের জন্য একেক জনের ওপর দায়িত্ব থাকতো৷ একবার হয়েছে কী, আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল ঔষধ বিলি করার৷ খুবই সাধারণ ঔষধ – পানি পরিষ্কার করার ট্যাবলেট, প্যারাসিটামল, স্যালাইন – এগুলোই৷

নৌকা ভেড়াতেই অনেকে ভাবল আমি ডাক্তার৷ এসে নানান অসুখের কথা বলা শুরু করলো৷ যাই হোক, কোনোমতে কিছু ঔষধ বিলি করে পার পেলাম৷ কিন্তু ফিরতে ফিরতে মনে হলো, একজন ডাক্তার নেয়া যেত৷

২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর এলো৷ আমার পেশা সাংবাদিকতা৷ উপকূল এলাকায় গেলেন আমার সহকর্মীরা৷ তাদের ক্যামেরায় দেখলাম এর ভয়াবহতা৷ শত শত মানুষ মরে পড়ে আছেন উপকূলজুড়ে৷ এ দৃশ্য দেখা যায় না৷

একবার এক সিনিয়র সহকর্মী প্রশ্ন করেছিলেন, প্রকৃতি কখন সুন্দর? আমি উত্তর দিতে পারিনি৷ তখন তিনি বললেন, যখন সে শান্ত থাকে৷ কিন্তু এই শান্ত সুন্দর প্রকৃতির মাঝেই কী ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে, তা না দেখলে কেউই বিশ্বাস করবে না৷ ঠিক তাই৷

দু'বছর পর এলো সাইক্লোন আইলা৷ এবার আমি ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে নিজেই ছুটে চললাম উপকূলে৷ যত কাছে এগোই ততই যেন প্রকৃতির কাঁপন টের পাই৷ রাতভর গাড়িতে করে ছুটে চলেছি৷ দু'পাশে নেই আলো৷ বড় বড় গাছগুলো যেন প্রকৃতির কাছে নুয়ে সেলাম ঠুকছে৷

আইলায় সিডরের মতো দশ হাজার মানুষ মারা না গেলেও প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েকশ' জন৷ কিন্তু পানির উচ্চতা ছিল অনেক বেশি৷ জলোচ্ছ্বাসে ধ্বংস হয়ে যায় উপকূলের ৭৬ কিলোমিটারেরও বেশি বাঁধ৷ আরো সাড়ে তিনশ' কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ তিন লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়৷ দু'লাখ একর কৃষিজমি তলিয়ে যায় নোনা পানিতে৷

পটুয়াখালির আন্ধার মানিক নদীর ভয়াবহতা আমি দেখেছি স্বচক্ষে৷ কালো কালো পাহাড়ের মতো ঢেউ৷ বাঁধ ভেঙ্গে আততায়ীর মতো ঢুকে পড়ে ভাসিয়ে নিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম৷

ট্রলারে করে অনেক জায়গায় গিয়েছি৷ দেখেছি পানিবন্দি মানুষের কী নির্মম পরিণতি৷ নিরাপদ নয়, তাই অনেক দুর্গম জায়গায় যেতেই পারিনি, বা আমাকে যেতে দেননি স্থানীয় সহকর্মীরা৷ যত দুর্গম, ভয়াবহতা তত বেশি৷ সাহায্য পাবার সম্ভাবনাও তত কম৷ কী যে এক দুর্বিষহ ব্যাপার৷ খুলনা, সাতক্ষীরা সব জায়গাতেই মানুষের পরিণতি কত নির্মম৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

পরের বছর আবার গেলাম৷ সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে৷ বাগেরহাটের শরণখোলায় বেড়িবাঁধ ধরে হেটে গিয়েছি মাইলের পর মাইল৷ নোনা বাতাসে শরীরে সাদা সাদা ছোপ পড়ে গেছে৷ সেখানে গিয়ে টের পেলাম একটা ঝড়ের ভয়াবহতা শুধু মানুষের মৃত্যুর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়৷ ঝড়ের তাণ্ডবে স্বজনহারা মানুষগুলোর মন যেন কুঁকড়ে গেছে৷

একজন বলছিলেন কিভাবে তিনি সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া তাঁর স্ত্রীর হাত ধরতে পারেননি৷ কয়েক ঘণ্টা একটা খুঁটিকে একহাত দিয়ে এবং আরেকহাত দিয়ে শিশু সন্তানকে বুকে চেপে ধরে ছিলেন৷ ঝড়ের তাণ্ডব শেষ হলে দেখতে পান শিশু সন্তানটিও বেঁচে নেই৷ এমন সব নির্মম ঘটনা ঘরে ঘরে৷

এ তো গেল মানসিক ক্ষতি৷ কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণটিও কম নয়৷ ঘুরতে ঘুরতে এক জেলেমাঝির সঙ্গে দেখা হলো৷ তিনি বললেন, সিডরে তাঁর আয়ের একমাত্র পথ, একমাত্র সম্বল নৌকাটি ভেঙে যায়৷ এরপর ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে আরেকটি নৌকা বানান৷ কিন্তু আইলায় সেটাও ভেসে যায়৷ এখন না খেয়ে হলেও ২০ ভাগের চড়াসুদে নেয়া সেই ঋণ তো পরিশোধ করতেই হবে৷ আবার আয়ের পথটিও বন্ধ৷

এমন ঘটনা এসব এলাকায় ভুড়ি ভুড়ি৷ এক বাড়িতে তালাবন্ধ দেখে কৌতূহল হলো৷ প্রতিবেশীরা জানালেন, ঋণদাতার কিস্তি পরিশোধের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন সবাই৷ আরেক নারীর স্বামী পালিয়েছেন৷ কিন্তু তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে পালাতে পারেননি সেই নারী৷ তাঁকে এখন যে করেই হোক ঋণ পরিশোধ করতে হবে৷ কারণ মানবিক সহায়তার নাম করে চড়া সুদে যারা ঋণ দিচ্ছেন, তাঁরা ছাড়বার পাত্র নন৷

এ সব দেখে শৈশবের ঝড়ের রোমান্টিকতা কবেই উবে গেছে৷ হাজারো লাশ আর পরিবেশ শরণার্থীর মিছিল কোনোভাবেই আম কুড়ানোর রোম্যান্টিকতাকে মনে ঠাঁই দিতে দেয় না৷

ঝড় নিয়ে আপনার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে? লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন