আমাদের নিত্যদিনকার পাখিহীন শাস্ত্র | আলাপ | DW | 21.01.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

আমাদের নিত্যদিনকার পাখিহীন শাস্ত্র

জীবন যখন কেবল ঠাকুরমার ঝুলি দিয়ে শুরু হয়েছিল, তখন পাখি বলতে চিনি কেবল টুনটুনি পাখিকে৷ পথে কুড়িয়ে পাওয়া পয়সা নিয়ে টুনটুনি পাখি বলে উঠেছিল, ‘‘রাজার কাছে যে ধন আছে, আমার কাছে সে ধন আছে৷''

এটি একদমই ছেলেবেলার গল্প৷ বড় হতে হতে প্রকৃতিতে আর টুনটুনি পাখি দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি৷

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে থেকে ঠাকুরমার ঝুলি আর টুনটুনি পাখি একসঙ্গে উধাও হয়ে যাচ্ছে৷ 

ছোটবেলার একটা স্মৃতি ভীষণ নাড়া দেয় এখনো – মা রুটি বানাচ্ছেন, সেখান থেকে আটার গোলা নিয়ে কাক খাওয়াচ্ছি, মিনিট দশেকের মধ্যে কাকের আওয়াজে আর কানপাতা দায়, আর ঠোকরের ভয়ে হাত থেকে ফেলে দিয়েছি আটার গোলা৷ সেই নিয়ে কাকদের মধ্যে চলছে লড়াই৷

ছোটবেলার সেই কাক আর কবিময় ঢাকা শহরে কবিরা রয়ে গেলেও কাক একদম নেই বললেই চলে৷ সেই কাকগুলো কোথায় গেছে? গ্রামে যায়নি এটি নিশ্চিত৷ গ্রামে সাবান আগলে রাখা হতো৷ কখন কাক নিয়ে উড়াল দেয়৷ শুধু কী সাবান, শুটকি, আঁচার, নিত্যদিনকার সংসারের জিনিস কাকের নজর থেকে আড়ালে রাখার সে কী প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল! এখন তেমন করে কাকের মিছিল চোখেই পড়ে না৷ সে কী গ্রাম, কী ঢাকা শহর!

অর্থাৎ, পাখি কমছে৷ গল্পের কাহিনিতে পাখির বিচরণ কমার সঙ্গে সঙ্গে  বাস্তবজীবনে পরিবেশ প্রকৃতিতে পাখির সংখ্যা কমছে৷ গল্পের হীরামন পাখিরা এখন যেমন ঘুম পারায় না, তেমনি সকালে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙে না৷ শেষ কবে পাখির ডাকে ঘুম ভেঙেছে নগরবাসীর? কিংবা গ্রামেই কী এখন কেউ মাঝরাতে প্যাঁচার ডাকে ঘুম ভেঙে আঁতকে ওঠে? 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সারা দেশে পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে৷ রীতিমতো ভীতিকর একটি সংখ্যা জানিয়েছে পাখি জরিপকারী সংস্থাগুলো৷ প্রতিবছরই পাখির সংখ্যা কমছে৷  বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন ২০১৮ সালের জুন মাসে একটি যৌথ  জরিপ প্রকাশ করে৷ সেখানে দাবি করা হয়, এক বছরে পাখির বিচরণ কমেছে প্রায় ৪০ হাজার৷ বিশেষ করে উপকূল ও দ্বীপ এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাখি কমেছে৷ এর মধ্যে সোনাদ্বীপ উল্লেখযোগ্য৷

২০১৮ সালের ১৫ জুন প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে প্রথম যখন পাখি জরিপ করা হয়, তখন পাখি পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ৮ লাখ। ২০১৭ সালে পাখি দেখা গেছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৩২টি, যা ২০১৮ সালে নেমে এসেছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ২১টিতে৷ ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছর আরো পাখি কমবে৷ আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়ের মতো বিষয়কে পাখি কমার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা৷

সেই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, ‘‘বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যরা চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাসের বিভিন্ন সময়ে পাখি বেশি থাকে দেশের এমন পাঁচটি এলাকায় শুমারিটি করেছেন৷ ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর একই সময়ে তাঁরা জরিপটি করে থাকেন৷ এ বছর দেশের উপকূলীয় এলাকার ভোলা ও নোয়াখালীর চর সোনাদিয়া দ্বীপ, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, সিলেট ও মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর ও বাইক্কার বিলে জরিপটি করা হয়৷ শীতের এই সময়টাতে ওই এলাকাগুলোতে পাখি বেশি থাকে বলে জরিপটি করা হয়৷’’

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভারিক্কী বিষয়ের সঙ্গে ব্যক্তি-দায় উল্লেখ করলে ভীষণ ক্লিশে হয়ে যাবে বিষয়টি৷ কিংবা, গুরুত্ব হারাবে৷ তবে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে ব্যক্তি-দায় উল্লেখ না করে পারছি না৷ আমরা মানুষ সবচেয়ে সভ্য প্রজাতি হলেও আমাদের আচরণগত কিছু ত্রুটিপূর্ণ কর্মকাণ্ড আমাদের পাখিদের থেকে বিচ্যুত করেছে৷ নয়তো সেই গল্প তো খুব বেশিদিনের পুরানো নয়, যখন আমাদের ইট-কাঠের দালানেও পাখি বাসা করতো৷

শহরে আধুনিক জীবন যাপনের নামে আর গ্রামে উন্নয়নের নামে আমরা পাখির আবাস ধ্বংস করেছি৷ নিজেরাই তো মনে করতে পারি না শেষ কবে প্রচণ্ড দাবদাহে বাড়ির বাইরে মাটির খোলায় পানি রেখেছিলাম পাখির জন্য৷ কিংবা কবে শেষ ভাত ছড়িয়েছিলাম কাকের জন্য? আমাদের উচ্ছিষ্ট খাবার এখন যায় ডাস্টবিনে পলিথিনে প্যাকেট হয়ে৷ অথচ চাইলেই আমরা সানসেটে কিংবা বারান্দায় পাখির জন্য একটু খাবার ছড়িয়ে রাখতে পারতাম৷ এইটুকু মানবিক আচরণ আমরা পাখির জন্য করতে পারি না বলেই পাখিগুলো কমে যাচ্ছে৷

ফাতেমা আবেদীন নাজলা

ফাতেমা আবেদীন নাজলা, ডয়চে ভেলে

এখনো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখি আসে প্রতি শীতে৷ তবে কতদিন আসবে সেটা প্রশ্নযোগ্য৷ কারণ, পাখি দেখতে গিয়ে যে হারে চিপসের প্যাকেট, কোকের ক্যান, বর্জ্য লেকের পানিতে ফেলে আসি, তাতে প্রতি বছর বিদ্যুৎগতিতে পাখি না কমার কোনো কারণ নেই৷ এ বছরের এখনো এক মাস যায়নি, এরমধ্যেই প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমে খবর এসেছে, শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলে পাখি কমেছে৷ বাইক্কা বিল  পাখিদের জন্য অভায়শ্রমই ছিল৷

এখানকার কচুরিপানা, নলখাগরা পাখিদের খাবার ও আশ্রয়স্থল৷ পাখিরা এগুলো খায়, এখানেই  থাকতো৷ কিন্তু নদীর দুধারে গড়ে ওঠা বাড়িঘর ও ফিশারি পাখিদের ভীত করছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা৷ অন্যদিকে ফিশারি মালিকরা দুইদিন পরপর বিল পরিষ্কারের নামে কচুরিপানা, নলখাগড়া পরিষ্কার করছেন৷ এতে পাখির খাদ্য এবং আবাস দুইই নষ্ট হচ্ছে৷

এইতো কদিন আগেই চারপাশে শালিকের এত আনাগোনা দেখেছি৷ এক শালিকে বিপদ, দুই শালিকে সুখ৷ শেষ কবে শালিক দেখেছেন ভেবে দেখুন তো? কিংবা হলুদ রঙের ইষ্টি পাখি, বাড়ির গাছে যে পাখি বসলে সবাই মনে করতো আজ মেহমান আসবে৷

ঢাকা শহরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক কিংবা বলধা গার্ডেনেও এখন সেই কলকাকলিমুখর পরিবেশ নেই৷ এখন আর লাল টুকটুকে তেলাকচু ফল খেতে টিয়া পাখি বসে না৷ গাছের কাঁচামরিচ গাছেও জাল দিয়ে ঢাকা দিতে হয় না৷ আমাদের প্রতিদিনকার জীবন থেকে হারিয়েই যাচ্ছে পাখি৷ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের গল্পে আর লেখা হবে না পাখির কথা৷

ফাতেমা আবেদীন নাজলার এ লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? জানান নীচের ঘরে৷  

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

বিজ্ঞাপন