আফ্রিকার কাঠকয়লা, বিক্রি হচ্ছে ইউরোপে | বিশ্ব | DW | 31.12.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

আফ্রিকা-ইউরোপ

আফ্রিকার কাঠকয়লা, বিক্রি হচ্ছে ইউরোপে

কাঠ কেটে কাঠকয়লা তৈরি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যের পক্ষে ভালো খবর না হতে পারে, কিন্তু রুজি-রোজগারের পক্ষে ভালো৷ নয়ত নাইজেরিয়ার কাঠকয়লা জার্মানিতে বারবেকিউ-এর গ্রিলে পুড়বে কী করে?

সপ্তাহের পর সপ্তাহ জঙ্গলে থেকে গাছ কেটে, সেই গাছের গুঁড়ি টেনে নিয়ে গিয়ে স্তূপ করে সাজিয়ে চুল্লি তৈরি করে, তবে কাঠকয়লা তৈরি হয়৷ দু'মিটার উঁচু কাঠের স্তূপ মাটি দিয়ে ঢাকার পর বাকি থাকে আগুন ধরানো৷ ১১ দিন ধরে সেই আগুন ধিকি ধিকি করে জ্বলবে, চুঁইয়ে ধোঁয়া বেরবে, তবে বিক্রি করার মতো কাঠকয়লা তৈরি হবে৷

দক্ষিণ নাইজেরিয়ার নাইজার নদীর ব-দ্বীপ একটি তেল সমৃদ্ধ এলাকা – আবার ৯,০০০ হেক্টার ব্যাপি এডুমানম ফরেস্ট রিজার্ভ ঠিক এখানেই, যে অভয়ারণ্যে নাইজেরিয়ার শেষ বনমানুষদের বাস৷ এখানকার নাজুক প্রকৃতি ও পরিবেশ শুধু খনিজ তেল নিষ্কাশনের দরুণই নয়, কাঠ কাটার ফলেও বিপন্ন৷ প্রথমত গাছ কাটা; তারপর সেই কাঠ পুড়িয়ে কাঠকয়লা করার সময় যে ধোঁয়া বের হয়, তা মানুষ ও পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর৷ কাঠকয়লা তৈরি থেকে ভূগর্ভস্থ পানি ও চারপাশের মাটি দূষিত হয় – কার্বন নির্গমনের কথা না হয় বাদই থাকল৷

জঙ্গলের কাঠকয়লা শেষ অবধি বিক্রি হবে বাড়ির রান্নার জন্য মানুষজনের কাছে, অথবা পাঁউরুটি তৈরির কারখানায়, কিংবা ব্যবসায়ীদের কাছে যারা সেই কাঠকয়লা বড় শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবে৷ কাঠকয়লা তৈরি করাটা যাদের জীবিকা, তারা সেই কাঠকয়লা বেচে ৫০ কিলোর বস্তা প্রতি তিন ইউরো পরিমাণ দামে৷ শহরে ব্যবসায়ীরা স্বভাবতই অনেক বেশি দাম পায় – এমনকি সেই কাঠকয়লা কাগজের প্যাকেটে পুরে ইউরোপ অথবা এশিয়া অবধি বিক্রি হয়৷ সেরা কাঠকয়লা নাকি রপ্তানি হয়ে যায়, বাকিটা নাইজেরিয়াতেই বিক্রি হয়৷

‘আকাশেতে ঝুল ঝোলে, কাঠে তাই গর্ত'

সুকুমার রায়ের কাঠবুড়ো থাকলে জাতিসংঘের হিসেবের প্রয়োজন পড়ত না, কিন্তু ২০০৭ সালে নাইজেরিয়া প্রায় আড়াই কোটি ইউরো মূল্যের ৮০,০০০ টন কাঠকয়লা রপ্তানি করেছে – অর্থাৎ নাইজেরিয়া বিশ্বের বৃহত্তম কাঠকয়লা রপ্তানিকারক দেশগুলির মধ্যে গণ্য৷ অপরদিকে জার্মানি ইউরোপের কাঠকয়লা আমদানিকারক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম৷ জার্মানি প্রতিবছর আড়াই লাখ টন কাঠকয়লা আমদানি করে থাকে৷

খুব কম জার্মানই জানেন, তাদের বারবেকিউ-এর কাঠকয়লা আসছে কোথা থেকে: সেই কাঠকয়লা যে বস্তুত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমির এক টুকরো পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া অংশ, এটা শুনলে তারা নিশ্চয় খুব অবাক হতেন৷ ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ট্রাস্ট পরিবেশ সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জার্মানিতে যে কাঠকয়লা আমদানি করা হয়, তার ৩৪ শতাংশ পোল্যান্ড থেকে আসে বটে, কিন্তু নাইজেরিয়া ও প্যারাগুয়ে থেকেও ১৫ শতাংশ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যের গাছ পুড়িয়ে তৈরি কাঠকয়লা জার্মানিতে আসে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

পোল্যান্ডে আবার সারা বিশ্ব থেকে আসা কাঠকয়লা নতুন করে প্যাক করে প্রতিবেশী দেশগুলিতে বিক্রি করা হয়, কাজেই পোল্যান্ডের কাঠকয়লাতেও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যের কাঠ থাকে৷ ইউরোপিয়ান টিম্বার রেগুলেশানে ফাঁক থাকার ফলেই এ ধরনের ঘটনা সম্ভব হয়৷ ১০১৩ সালে এই কাষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ বিধি প্রণীত হয়; উদ্দেশ্য ছিল, ইউরোপে বেআইনি কাঠ বা কাগজের পণ্যের প্রবেশ রোধ করা৷ কিন্তু এই বস্তুত বিশেষভাবে কড়া নিয়মাবলীতে কাঠকয়লার উল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি!

‘‘কেন যে বিশেষ বিশেষ কাঠের পণ্যকে এই বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তা আমার কাছে একটা রহস্য,'' ডয়চে ভেলেকে বলেছেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডাব্লিউডাব্লিউএফ)-এর ইওহানেস সানেন৷ ‘‘বহ পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের পণ্যগুলি বিধিসম্মত৷''

সানেন ও তাঁর সতীর্থরা এই ধরণের ২০টি কাঠকয়লার পণ্য নিয়ে জরিপ চালিয়েছেন৷ এই সব পণ্য জার্মানি জুড়ে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প, সুপারমার্কেট ও হার্ডওয়্যার স্টোরে বিক্রি করা হয়ে থাকে৷ জরিপে দেখা গেছে যে, ৮০ ভাগ পণ্যের ক্ষেত্রে প্যাকেট বা বস্তার উপর কাঠকয়লার উৎপত্তি সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া রয়েছে৷ কোনো কোনো প্যাকেটে সংরক্ষিত প্রজাতির গাছের কাঠও রয়েছে৷ একটি ক্ষেত্রে বস্তার উপর লেখা ছিল যে, এই কাঠকয়লায় কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কাঠ নেই, কিন্তু দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট কাঠকয়লার প্রায় পুরোটাই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কাঠ থেকে এসেছে৷

অরণ্যে রোদন?

জাতিসংঘের বিবৃতি অনুযায়ী সারা বিশ্বে যতো গাছ কাটা হয়, তার অর্ধেকের বেশি যায় রান্নার কাঠ বা কাঠকয়লা তৈরিতে৷ বিশ্বব্যাপী কাঠকয়লার তিন-চতুর্থাংশ তৈরি হয় আফ্রিকায়, তার ৯৮ শতাংশ আফ্রিকাতেই ব্যবহৃত হয় – তার কারণ, আফ্রিকাবাসীরা রোজকার রান্নার জন্য কাঠকয়লা ব্যবহার করে থাকেন; অপরদিকে ইউরোপীয়রা প্রধানত গরমকালে বারবেকিউ-এর জন্য কাঠকয়লা ব্যবহার করেন৷

আফ্রিকায় কাঠকয়লার দাম কেরোসিনের চেয়ে কম; তাছাড়া মানুষজন গাছ কাটার পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কেও পুরোপুরি সচেতন নন – গাছ কাটলে, আবার জন্মাবে, এই হল মনোভাব৷ নাইজেরিয়াও তার ব্যতিক্রম নয়৷ বিশেষ করে সাধারণ চাষিরাও গ্রীষ্মে জঙ্গলে গিয়ে কাঠকয়লা তৈরি করে কিছু রোজগার করে থাকেন৷ অথচ এর ফলে বিশ্বের উষ্মায়নবাড়ছে, নাইজেরিয়ায় মরুকরণ ও মাটির ক্ষয় বাড়ছে বছরে ৩৫০,০০০ হেক্টার হারে৷ নাইজেরিয়ার জাতীয় পরিবেশ পরিষদের বিবৃতি অনুযায়ী দেশের মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে এখনও জঙ্গল আছে৷ ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে পরিষদ কাঠকয়লার রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সুপারিশ দেয়৷

পরিবেশ সংরক্ষণকারীদের সুপারিশও অনেক: কাঠকয়লা তৈরির জন্য গাছের খামার তেমন একটি ‘টেকসই' প্রস্তাব; অথবা সরাসরি কাঠ পুড়িয়ে রান্না করার মাটির উনুন৷ কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

গোয়েন্ডোলিন হিলজে/এসি

বন্ধু, প্রতিবেদনটি নিয়ে আপনার কোনো বক্তব্য থাকলে লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন