আফগান নারী অধিকারের লড়াইয়ের ইতিহাস | বিশ্ব | DW | 24.01.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তান

আফগান নারী অধিকারের লড়াইয়ের ইতিহাস

শতক পেরিয়ে আফগান নারীদের বারবার শুনতে হয় কী করবে, কী করবে না৷ নারীদের কণ্ঠস্বর কখনোই খুব একটা জোরালো ছিল না আফগানিস্তানে৷ শাসক এবং গোষ্ঠীনেতাদের মধ্যে নারীদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক চলছেই৷

কেমন আছেন আফগানিস্তানের নারীরা৷ আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার আগে ওয়ার্দাকের রাজধানী ময়দান-সেহরের সাবেক মেয়র ছিলেন জারিফা ঘাফারি৷ তালেবান দেশ  দখলের সময় আফগানিস্তান থেকে পরিবার নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছেন এই নেত্রী৷ তার কথায়, ‘‘বর্তমানে আফগান নারীদের এ দেশে কী পরিমাণ ঝুঁকি রয়েছে তা আমি জানি৷ খুব খারাপ পরিস্থিতি৷ আত্মগোপনের জায়গা খোঁজা কিংবা মৃত্যুর অপেক্ষা-এই তো অবস্থা এ দেশের মেয়েদের৷’’ কোনও নারীকে আর মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে দেখা যায় না৷

জারিফার বন্ধুরা তাকে জানিয়েছেন, তিনটি শিশুকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে গিয়েছে তাদের মা৷ ওদের দেখার ক্ষমতা নেই সে মায়ের৷ তার কারণ একাই সন্তানদের মানুষ করছেন এমন মায়েদের কাজ নেই৷  রুটিরুজির ভার যেসব পরিবারে নারীদের তারা আর খেতে পাচ্ছে না৷ কারণ তালেবান নারীদের কাজে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে৷

বিজ্ঞাপন এবং টেলিভিশন সহ সমস্ত মাধ্যমে নারীদের মুখ দেখানো নিষিদ্ধ করেছে তালেবান৷ মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ পরিবারের কোনও পুরুষ ছাড়া কোনও নারীর বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই৷

প্রথম দিকের নারীবাদ

সান দিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমা আহমেদ ঘোষ ২০০৩ সালে ‘আ হিস্ট্রি অফ উইমেন ইন আফগানিস্তান’-এ একটি স্টাডিতে দেখিয়েছেন, ১৯০০ সাল থেকে নারীদের অধিকার আফগানিস্তানের শাসকদের কাছে একটা জরুরি ব্যাপার৷

১৯২০ সাল নাগাদ কিন্তু দেশের স্বার্থে নারী ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে৷ হাবিবুল্লাহের মৃত্যুর পর তার ছেলে আমানুল্লাহ খান দায়িত্ব নেন৷ তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে ব্রিটিশদের উৎখাত করেন তিনি৷ কামাল আতাতুর্কের আমলে তুরস্ক যেমন ছিল, তা দেখে তিনি আধুনিকীকরণে উদ্যোগী হন৷ এক বিবাহ, শিক্ষার প্রসার এবং আপাদমস্তক ঢাকা বোরখা তুলে দেওয়ার মতো বদলগুলি শুরু করেন৷ ফলে নারীদের অধিকার খানিকটা হলেও সুরক্ষিত হওয়া শুরু হল৷

যদিও অনেক গোষ্ঠীর নেতারা চরম বিরোধিতা করেন আমানুল্লার এসব প্রস্তাবের৷ বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ২১ করে এক বিবাহ প্রথা চালুর বিষয়ে তীব্র আপত্তি ছিল তাদের৷ উপজাতীয় নেতাদের  চাপে আমানুল্লাহ দেশ ছেড়ে ইউরোপে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন৷

রাজতন্ত্রের অবসানের পর এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উন্নয়নমূলক সহায়তা বেড়ে যাওয়ার ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীশক্তির চাহিদাও বাড়ে৷ চিকিৎসা, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন আফগান নারীরা৷ ১৯৭০ নাগাদ, নারী অধিকার রক্ষায় একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়৷ নারীদের বিবাহের বয়স বৃদ্ধি এবং শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়৷ আবারও উপজাতি নেতারা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন৷

হুমা আহমেদ ঘোষ লিখছেন, পরে মুজাহিদদের উত্থান ঘটে৷ তারপর এল তালেবান৷ চিরকাল ধরে চলে আসা ইসলামি বিধি কার্যকর করা এবং নারীদের ঘরবন্দি করায় জোর দেওয়া বেড়ে গেল৷ রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের নারীরাও ওয়েস্টার্ন বা আধুনিকদের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ মনে করেন৷

বর্তমানে আফগান নারীদের অবস্থা

চরম পুরুষতান্ত্রিক দেশ আফগানিস্তান৷ মিউনিখে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল কমপারিজনস অ্যান্ড মাইগ্রেশন রিসার্চে কর্মরত অর্থনীতিবিদ ব্রিটা রুড লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কাজ করছেন৷ তার মতে, ‘‘বাইরে গিয়ে নারীদের কাজ এখানে সমর্থনযোগ্য নয়৷ শ্রমের বিভাজন একেবারে প্রাচীন আমলের মতো৷ নারীরা বাড়ির সমস্ত কাজ করে৷ পুরুষেরা বাইরে গিয়ে কাজ করে৷ শিশু এবং বয়স্কদের যত্ন নেয় নারীরাই৷ এই রীতি আফগান পুরুষদেরও পছন্দ৷’’

সংবাদসংস্থা রয়টার্স জাতিসংঘের একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে জানায়, মাত্র ১৫ শতাংশ আফগান পুরুষ বিশ্বাস করে, বিবাহিতাদের বাইরে গিয়ে কাজ করা উচিত্৷ দুই তৃতীয়াংশের দাবি, আফগান নারীদের একটু বেশিই স্বাধীনতা দেওয়া হয়৷

পরিবারের মূল্যবোধ এবং নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন কিছু করাকে অনেক নারী তার পরিবারের জন্য অসম্মানের বলে মনে করেন৷ নারীদের আচরণের প্রতি এত মনোযোগ, তাদের ঘরে আটকে রাখার মূল কারণ সেই পরিবারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা৷

রুড জানাচ্ছেন, মূল্যবোধ পুরুষদের দ্বারা নির্ধারিত হয় আফগান মুলুকে৷ নারীরা সেই নিয়ম শুধু অনুসরণ করবে তা না হলে পরিবারের সম্মানে প্রভাব পড়বে৷ আফগানিস্তানে এখনও অনার কিলিং হয়৷

উপজাতিরা নিজস্ব নিয়মকানুন বানিয়েছে৷ তারা সরকারি আইনগুলিকে বাতিল করে নিজেদের তৈরি করা আইনে শাস্তি দিতে চায়৷

সুদূর ভবিষ্যতে থাকলেও আগামী দিনে অধিকার ফিরে পাওয়ার আশা নেই

সাবেক মেয়র জারিফা বলছেন, আরও বেশি করে নারীবিরোধী আইন আনা হচ্ছে তালেবান জমানায়৷ আফগান সংস্কৃতি ৬০-৭০ বছরের যুদ্ধের আগে দারুণ ছিল৷ নারীদের অধিকার সুরক্ষিত ছিল৷ তার নিজের দাদীর বয়স এখন ১০০৷ তিনি জারিফাকে বলেন, তাদের সময় মেয়েরা পছন্দসই পোশাক পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারত৷

জারিফার মতে, ‘‘আফগান সংস্কৃতি হল মালালা মায়ওয়ান্দির সংস্কৃতি, রাবিয়া বলখির সংস্কৃতি৷ ২০২০ সালে জালালাবাদে বন্দুকবাজেরা হত্যা করে মালালকে৷ বলখি ছিলেন দশম শতকের কবি৷ ক্রীতদাস প্রেমিক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছিলেন বলখি৷ কারণ তাদের বিয়েতে অনুমতি মেলেনি৷’’

ইসলামি সংস্কৃতিতে হিজাব পরার সময় স্বাচ্ছন্দ্যের দিকটি খেয়াল রাখতে হয়৷ এটি তালেবানের কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঠিক বিপরীত৷ প্রেস এজেন্সি এএফপি জানুয়ারির শুরুতে রিপোর্ট করেছিল যে তালেবানের ধর্মীয় পুলিশ কাবুলের চারপাশে পোস্টার লাগিয়েছে৷ পোস্টারে নারীদের আপাদমস্তক আবৃত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷

জারিফার বক্তব্য, নির্বোধের মতো যারা ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা করে, তারা বলে এটা করলে জাহান্নামে যাবে এটা করলে জাহান্নামে যাবে না৷ তালেবানের উপরে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে  এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রগুলিকে বারবার আফগান মুলুকের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে হবে৷

মানসী গোপালাকৃষ্ণন/আরকেসি

নির্বাচিত প্রতিবেদন