1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে জিম্মি বসুরহাট

১২ মার্চ ২০২১

নোয়াখালির কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌর এলাকায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুই দফায় সংঘর্ষে দুই জন প্রাণ হারিয়েছেন৷ দুই পক্ষের সংঘাতে এখনো জিম্মি সাধারণ মানুষ৷

https://p.dw.com/p/3qYD9
নোয়াখালী
ছবি: bdnews24.com

দুই দফায় সংঘর্ষের সময় অন্তত দুই ডজন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হলেও একটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী৷ শুধু ২৮ জনকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে৷ 

বসুরহাটের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে গিয়েছেন যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি মাহবুব আলম লাবলু৷ সেখানে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠার নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আসলে রাজনৈতিক কারণেই এখানে সংঘাত৷ একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন ওবায়দুল কাদেরের ভাই আব্দুল কাদের মির্জা এবং অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল৷ আসলে নোয়াখালি-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর হয়েই কাজ করেন বাদল৷ বিবাদমান দু'টি পক্ষই ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট৷ আর বিবাদের কারণ যেটা বলছিলেন, সেটা হলো ঠিকাদারি কাজ, নিয়োগ, চাঁদার টাকার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি৷ দু'টি পক্ষই আওয়ামী লীগ সেক্রেটারী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট হওয়ায় পুলিশ কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না৷ আসলে এখানে পুলিশের এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা৷’’

বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনের সময় থেকেই আবদুল কাদের মির্জা বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন৷ এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে৷ এ নিয়ে দলের দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি চলতে থাকে৷ এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলার চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে৷ সেখানে গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির পরদিন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান৷ গত সোমবার নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খিজির হায়াত খানকে মারধরের অভিযোগ ওঠে৷ খিজির খানকে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে পরদিন বসুরহাট পৌর এলাকার রূপালী চত্বরে সমাবেশ চলাকালে আবার সংঘর্ষ বাঁধে৷ সেদিন সংঘর্ষের সময় আলাউদ্দিন নামে একজন সিএনজি চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন৷ তাকে বাদলের অনুসারীরা নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন৷

দুই পক্ষই ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট হওয়ায় পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না: সাংবাদিক মাহবুব আলম লাবলু

দুই দফার সংঘাতে কী পরিমাণ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে? প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন? মাহবুব আলম লাবলু বলেন, ‘‘এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে পেরেছি, অন্তত দুই ডজন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে৷ সাধারণ মানুষ দেখেছে, শত শত রাউন্ড গুলি করা হয়েছে৷ কিন্তু পুলিশ একটি অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি৷’’ পুলিশের এ ব্যর্থতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘আসলে আগে যে বলেছিলাম, পুলিশ শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থার মধ্যে আছে৷ এখানে পুলিশ তো শক্ত অবস্থানে যেতে পারছে না৷ একজন পুলিশ কর্মকর্তা তো বলেছেন, আমাদের হাত-পা বেঁধে পানিতে সাঁতার কাটতে বলার মতো অবস্থা৷’’

তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বসুরহাটের পরিস্থিতি এখন আমাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে৷ আমরা এখন পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছি৷ আমি নিজেও আগামীকাল (শনিবার) বসুরহাট যাবো৷ সেখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলবো৷ তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবো৷’’ প্রথম দফার সংঘর্ষে একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার পরও দৃশ্যত কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া এবং আরেক সংঘর্ষে আরেকজন নিহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘প্রথম দফায় সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল৷ কিন্তু হুট করেই দ্বিতীয় দফায় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে৷ এখন আমরা সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেছি৷ আমাদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে আর রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে পারবে না৷ কোনো না কোনো কর্মসূচিকে ঘিরেই তো সংঘাত, এখন সেখানে কোনো কর্মসূচি হবে না৷’’

আমাদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে আর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারবে না: চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন

বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা মিজানুর রহমান বাদলকে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় শুক্রবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ বেলা ১টার দিকে তাকে নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে তোলা হয়৷ বাদলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক শোয়েব উদ্দিন খান৷

দু পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী- জানতে চাইলে ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘আমরা যে ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছি, তাদের মধ্যেই কারো গুলিতে মৃত্যু হতে পারে৷ বিষয়টি তদন্তাধীন৷ তদন্ত শেষ হলেই বলা যাবে৷’’ ওই ২৮ জনকেই রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছে পুলিশ৷ 

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেও ফেসবুক লাইভে এসে কাদের মির্জা বলেছেন, ‘‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেরুদণ্ডহীন প্রাণী৷ তাকে দিয়ে সঠিক তদন্ত হবে না৷ তাই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বা চাঁদপুরের সুজিত রায় নন্দীকে দিয়ে তদন্ত কমিটি করা হোক৷ এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বা ঢাকা থেকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও চাইলে করতে পারে সরকার৷ এতে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে৷ নোয়াখালির সবাই ওদের দ্বারা প্রভাবিত, ফলে তারা সঠিক তদন্ত করতে পারবে না৷’’

আমরা সত্যিই বিব্রত, লজ্জিত, দুঃখিত: নোয়াখালী আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম

এতদিনেও বসুরহাটের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নোয়াখালি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন তো বসুরহাটের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে৷ সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, আমরাও ব্যবস্থা নিয়েছি৷’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছি৷ আমরা তো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারি না৷’’ কমিটি বিলুপ্ত করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না, কমিটি বিলুপ্ত করিনি৷’’ আওয়ামী লীগের কোন্দলে দুই জন মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে বলে নোয়াখালি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী দুঃখ প্রকাশ করলেন এভাবে, ‘‘আমরা সত্যিই বিব্রত, লজ্জিত, দুঃখিত৷ আমি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি৷’’ আব্দুল কাদের মির্জার বৃহস্পতিবারের ফেসবুক লাইভ সম্পর্কে তার মন্তব্য, ‘‘আসলে সে তো সবার বিরুদ্ধেই বলছে৷ মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বলেন, নিশ্চয় তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে৷ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, ইনশাল্লাহ৷’’

ডয়চে ভেলের ঢাকা প্রতিনিধি সমীর কুমার দে৷
সমীর কুমার দে ডয়চে ভেলের ঢাকা প্রতিনিধি৷