আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে জিম্মি বসুরহাট
১২ মার্চ ২০২১
দুই দফায় সংঘর্ষের সময় অন্তত দুই ডজন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হলেও একটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী৷ শুধু ২৮ জনকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে৷
বসুরহাটের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে গিয়েছেন যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি মাহবুব আলম লাবলু৷ সেখানে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠার নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আসলে রাজনৈতিক কারণেই এখানে সংঘাত৷ একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন ওবায়দুল কাদেরের ভাই আব্দুল কাদের মির্জা এবং অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল৷ আসলে নোয়াখালি-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর হয়েই কাজ করেন বাদল৷ বিবাদমান দু'টি পক্ষই ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট৷ আর বিবাদের কারণ যেটা বলছিলেন, সেটা হলো ঠিকাদারি কাজ, নিয়োগ, চাঁদার টাকার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি৷ দু'টি পক্ষই আওয়ামী লীগ সেক্রেটারী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট হওয়ায় পুলিশ কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না৷ আসলে এখানে পুলিশের এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা৷’’
বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনের সময় থেকেই আবদুল কাদের মির্জা বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন৷ এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে৷ এ নিয়ে দলের দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি চলতে থাকে৷ এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলার চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে৷ সেখানে গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির পরদিন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান৷ গত সোমবার নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খিজির হায়াত খানকে মারধরের অভিযোগ ওঠে৷ খিজির খানকে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে পরদিন বসুরহাট পৌর এলাকার রূপালী চত্বরে সমাবেশ চলাকালে আবার সংঘর্ষ বাঁধে৷ সেদিন সংঘর্ষের সময় আলাউদ্দিন নামে একজন সিএনজি চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন৷ তাকে বাদলের অনুসারীরা নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন৷
দুই দফার সংঘাতে কী পরিমাণ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে? প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন? মাহবুব আলম লাবলু বলেন, ‘‘এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে পেরেছি, অন্তত দুই ডজন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে৷ সাধারণ মানুষ দেখেছে, শত শত রাউন্ড গুলি করা হয়েছে৷ কিন্তু পুলিশ একটি অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি৷’’ পুলিশের এ ব্যর্থতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘আসলে আগে যে বলেছিলাম, পুলিশ শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থার মধ্যে আছে৷ এখানে পুলিশ তো শক্ত অবস্থানে যেতে পারছে না৷ একজন পুলিশ কর্মকর্তা তো বলেছেন, আমাদের হাত-পা বেঁধে পানিতে সাঁতার কাটতে বলার মতো অবস্থা৷’’
তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বসুরহাটের পরিস্থিতি এখন আমাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে৷ আমরা এখন পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছি৷ আমি নিজেও আগামীকাল (শনিবার) বসুরহাট যাবো৷ সেখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলবো৷ তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবো৷’’ প্রথম দফার সংঘর্ষে একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার পরও দৃশ্যত কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া এবং আরেক সংঘর্ষে আরেকজন নিহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘প্রথম দফায় সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল৷ কিন্তু হুট করেই দ্বিতীয় দফায় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে৷ এখন আমরা সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেছি৷ আমাদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে আর রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে পারবে না৷ কোনো না কোনো কর্মসূচিকে ঘিরেই তো সংঘাত, এখন সেখানে কোনো কর্মসূচি হবে না৷’’
বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা মিজানুর রহমান বাদলকে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় শুক্রবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ বেলা ১টার দিকে তাকে নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে তোলা হয়৷ বাদলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক শোয়েব উদ্দিন খান৷
দু পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী- জানতে চাইলে ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘আমরা যে ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছি, তাদের মধ্যেই কারো গুলিতে মৃত্যু হতে পারে৷ বিষয়টি তদন্তাধীন৷ তদন্ত শেষ হলেই বলা যাবে৷’’ ওই ২৮ জনকেই রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছে পুলিশ৷
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেও ফেসবুক লাইভে এসে কাদের মির্জা বলেছেন, ‘‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেরুদণ্ডহীন প্রাণী৷ তাকে দিয়ে সঠিক তদন্ত হবে না৷ তাই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বা চাঁদপুরের সুজিত রায় নন্দীকে দিয়ে তদন্ত কমিটি করা হোক৷ এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বা ঢাকা থেকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও চাইলে করতে পারে সরকার৷ এতে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে৷ নোয়াখালির সবাই ওদের দ্বারা প্রভাবিত, ফলে তারা সঠিক তদন্ত করতে পারবে না৷’’
এতদিনেও বসুরহাটের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নোয়াখালি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন তো বসুরহাটের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে৷ সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, আমরাও ব্যবস্থা নিয়েছি৷’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছি৷ আমরা তো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারি না৷’’ কমিটি বিলুপ্ত করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না, কমিটি বিলুপ্ত করিনি৷’’ আওয়ামী লীগের কোন্দলে দুই জন মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে বলে নোয়াখালি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী দুঃখ প্রকাশ করলেন এভাবে, ‘‘আমরা সত্যিই বিব্রত, লজ্জিত, দুঃখিত৷ আমি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি৷’’ আব্দুল কাদের মির্জার বৃহস্পতিবারের ফেসবুক লাইভ সম্পর্কে তার মন্তব্য, ‘‘আসলে সে তো সবার বিরুদ্ধেই বলছে৷ মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বলেন, নিশ্চয় তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে৷ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, ইনশাল্লাহ৷’’