অসহিষ্ণুতা বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে, রক্ষার উপায় কী? | বিশ্ব | DW | 09.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

অসহিষ্ণুতা বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে, রক্ষার উপায় কী?

সব মতের প্রতি সহিষ্ণুতার কথা বলে ভারতীয় সংবিধান৷ কিন্তু উগ্রতাই হয়ে উঠেছে ভারতীয় রাজনীতির পরম উপজীব্য৷  পশ্চিমবঙ্গও এর বাইরে নেই৷ গঠনমূলক সমালোচনার বদলে সোশ্যাল মিডিয়ায় হিংসা, ঘৃণাই হয়ে উঠেছে বিরোধীকে ঘায়েল করার অস্ত্র৷ 

সম্প্রতি রানিগঞ্জ-আসানসোল কাণ্ডে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়র নাম৷ নেটদুনিয়ার দরবারে এবার শুধু তাঁকে নয়, তাঁর মেয়েকেও পড়তে হলো হুমকির মুখে৷ এর কয়েকদিন আগে আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমাম ইমদাদ উল্লাহ রশিদিকে নিয়ে গান বেঁধেছিলেন কবীর সুমন৷ সেই গানের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, গানটির জন্য তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ব্লক হতে পারে৷ ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গার রাজনীতি যে অন্যখাতে বইতে শুরু করেছে এবার তা স্পষ্ট৷ এর আগে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল প্রকাশ্যে কটুক্তির রাজনীতি৷ সে তালিকায় বাম জমানার অনিল বসু থেকে শুরু করে হাল আমলের তাপস পাল, অনুব্রত মন্ডল সকলেই আছেন৷ আবার কারণে-অকারণে সোশ্যাল মিডিয়া নামক প্রকাশ্য স্থানে চলছে খুন জখমের হুমকি৷ বোঝাই যাচ্ছে, এবার শুরু হয়েছে হুমকির রাজনীতি৷ এইভাবে চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বাংলার রাজনীতি?

রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে ফের সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এলো৷ সর্বমতের সমন্বয় যেখানে মূল মন্ত্র, তার জায়গায় ঘাঁটি গাড়ছে উগ্র কট্টরপন্থা৷ প্রশ্ন উঠছে, শুধুই কি উগ্র কট্টরপন্থা? নাকি রাজনীতি থেকে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়া জীবনের সব স্তরেই ক্রমশ আধিপত্য বাড়াচ্ছে অসহিষ্ণুতার ভাইরাস?    

হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদ হাত ধরাধারি করে এগোচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে, একে অপরকে পুষ্ট করছে৷ এসবই প্রমাণ করে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনাস্থা ক্রমশ আমাদের ভেতর জাঁকিয়ে বসছে৷ এটাই আসলে হিংসা আর উগ্রতার উৎস৷ রাজনীতি একেই অবলম্বন করছে, কখনও তার জন্ম দিচ্ছে ভোটের স্বার্থে৷

তাঁর মেয়েকে হত্যার হুমকির কথা বলার জন্য ডয়চে ভেলে বাবুল সুপ্রিয়র সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল৷ কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি৷

অডিও শুনুন 18:59
এখন লাইভ
18:59 মিনিট

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রশংসা করায় লেখা হয়েছে ‘মোল্লা সুমনের ফাঁসি চাই': কবীর সুমন

তৃণমূলের নির্বেদ রায়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে, তিনি জানালেন, সোশ্যাল মিডিয়ার এ ধরনের কোনো ব্যাপারকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেওয়াকে সমর্থন করতে পারি না৷ যে কেউ যা খুশি বলতেই পারেন৷ তাছাড়া পরিস্থিতির আগে বা পরে, কোন প্রসঙ্গে কিছুই বিচার করা যাচ্ছে না৷ গোটা ঘটনাটা একতরফা হয়ে যাচ্ছে৷ তাই আমার মনে হয়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া টিভি বা খবরের কাগজের মতো পাবলিক মিডিয়ায় দিতে পারতেন!''

কবীর সুমনও একই কথা মনে করেন৷ তাঁর মতে, অধিকাংশ ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুক যে বারো ভূতের রাজ্য হয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ ডয়চে ভেলেকে কবীর সুমন এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও জানালেন৷ বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের প্রশংসা করায় ভারতবিরোধী  ‘মোল্লা সুমনের ফাঁসি চাই' বলে ফেসবুকে তাঁর সচিত্র বিজ্ঞপ্তিও বের হয়েছে৷ তাঁর নিজের আগের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ‘ভুয়া' বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ তাছাড়া এ রাজ্যের এক বাসিন্দাকে রাজস্থানে হিন্দুত্ববাদীরা লাঙল দিয়ে মেরে ফেলা এবং পোড়ানোর বীভৎস দৃশ্যকে ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে দিয়েছে, সেটার কথাও উল্লেখ করেন তিনি ৷  

কিন্তু  সোশ্যাল মিডিয়ার এই পৃথিবীকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা কত অসীম! মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুক যে উসকানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচার করেছিল, সেটার অভিযোগ যেখানে খোদ ফেসবুক কর্তা স্বীকার করেছেন৷ ভুলে গেলে চলবে না এই ফেসবুক থেকেই শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বাদুড়িয়ার কাণ্ড৷

ফেসবুক যে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ কিন্তু অসহিষ্ণুতা কেবল ভার্চুয়াল জগতেই তো নয়, সাম্প্রতিক অতীতে উগ্রতা ও ঔদ্ধত্যের রাজনীতি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাত ধরে শুরু৷ এটা বললে অত্যুক্তি হয় না৷ ২০০৭ সালের লভেন্বরে ১১ মাস ঘরছাড়া হয়ে থাকার পর সিপিএম নেতা কর্মীরা নন্দীগ্রাম পুনর্দখল করেছিল৷ একে রাজ্যের নেতৃত্ব সূর্যোদয় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন৷ সেই সময় বুদ্ধদেব বলেছিলেন ‘অপোজিশন পেইড ব্যাক ইন দ্য মেন কয়েন'৷ বিরোধীরা সমুচিত জবাব পেয়েছে তাঁদের ভাষায়৷ সে সময়ে ফেসবুকের আধিপত্য থাকলে ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়াত, অনুমান করা যায়৷ সেই ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছে বিজেপিও৷ তাঁদের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বেঁফাস, উগ্র মন্তব্যে নজিরবিহীন৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী ছাত্রী থেকে বাংলার বিদ্বজন, এমনকী নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকেও তিনি অপরিসীম ঔদ্ধত্যে আক্রমণ করেছেন৷ তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি ছড়াচ্ছে তার বাইরেও৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

তবে কবীর সুমনের মতে প্রতিহিংসার জায়গায় ব্যাপারটা যায়নি৷ তাঁর মতে, হিন্দুত্ববাদীরা যা করছে, সেটা একতরফা৷ নাৎসীরা যেমন ইহুদিদের সঙ্গে একতরফা আক্রমণ করেছেন এখানে তা-ই হচ্ছে৷ তাঁর দাবি, বাংলার রাজনীতিতে কিছু হচ্ছে না, হচ্ছে সারা ভারত জুড়ে৷ বাংলায় দু'জন ইমামের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পরবর্তী শান্তি ও সহাবস্থান  প্রমাণ করছে, ব্যাপারটা দাঙ্গার পর্যায়ে যায়নি৷ ইমামদের সঙ্গে এই আচরণ দাঙ্গা উসকাতে চেয়েছিল৷

তবে কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মেয়েকে হুমকি দেওয়ার নজির খুব কম৷ মেয়েকে নিয়ে তিনিও এমন হুমকি বামফ্রন্ট আমলে পেয়েছেন বলে দাবি করলেন কবীর সুমন৷ হুমকি রাজনীতিতে অনুব্রত মণ্ডলের নাম বহুবার উঠে এসেছে৷ বীরভূম জেলা তৃণমূল সভাপতি হিসেবে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘‘বিজেপি বাজপাখি৷ পশ্চিমবঙ্গে খাবার শিকার করতে এসেছে৷ ওদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷'' বীরভূমের পাড়ুইয়ের সাগর ঘোষ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই অনুব্রতের নাম জড়িয়েছিল পুলিশকে বোমা মারার মতো উক্তি দিয়ে৷ ঘটনাচক্রে তেমনই হুমকি দেওয়ার চল এবার সামাজিক মাধ্যমেও গণহারে ছড়িয়ে পড়ছে৷ রাজনৈতিক দল থেকে যে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, তার প্রমাণ অনুব্রতর বারবার এমন মন্তব্য করা৷ বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা ব্যাপারটি ‘বাবুলের ব্যক্তিগত' বলে আর দলের তরফে কোনও মন্তব্য করতে চাননি৷  নির্বেদ রায় বললেন, খুব কম নেতাই আছেন, যাঁরা উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারেন৷ বেশিরভাগই উল্টোপাল্টা কথা বলে ফেলেন৷

কবীর সুমন মনে করেন, বাবুল সুপ্রিয়ও আসানসোল এলাকায় যা বলেছেন, সেটাও নিন্দনীয়৷ বাবুলকে আগামীদিনে সতর্ক থাকতে হবে বলেও মনে করেন তিনি৷

কিন্তু শুধু সতর্কতা কি পারবে এই হিংসা আর বিষোদগারের রাজনীতি বন্ধ করতে? ফেসবুক তো নেহাত মাধ্যম৷ আসলে আমরা সেটা বন্ধ না করলে ফেসবুককে দোষ দিয়ে লাভ কী?

আপনার মন্তব্য লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও