অভিজাতদের কবল থেকে মুক্ত হোক ক্রিকেট | আলাপ | DW | 28.05.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

অভিজাতদের কবল থেকে মুক্ত হোক ক্রিকেট

সেই ১৯৯৪ কি ৯৫ সালের কথা৷ ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কেনিয়া৷ এর আগে আইসিসির সহযোগী দলগুলোর মধ্যে থেকে দুটি দলকে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ দেয়া হলেও সেবারই প্রথম সেই সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয় তিনটি৷

বিশ্বকাপে খেলার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করেও কেনিয়ার কাছে সেমিফাইনালে হেরে হাতছাড়া হয় স্বপ্ন৷

সিলেটের বিভাগীয় স্টেডিয়াম তখন কেবল তৈরি হচ্ছে৷ গ্যালারিতে তখনও কংক্রিটের কাঁচা গন্ধও শুকোয়নি৷ পাশেই মেডিকেল কলোনিতে আদর্শ স্কুল৷ ৮টায় ক্লাস শুরু হয়ে ১১টায় টিফিন ব্রেক৷

টিফিন ব্রেকে সাধারণত দুই দলে ভাগ হয়ে চোর-পুলিশ খেলেই কাটতো সময়৷ বিশাল খোলা মাঠ আর পুরনো ঘর-বাড়ি আমাদের সে আনন্দে যোগ করতো নতুন মাত্রা৷ কিন্তু একদিন বন্ধু আশিক আর জোবায়ের খেলা বাদ দিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে গেল সেই নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামে৷ সেখানে নাকি বাংলাদেশের সঙ্গে কেনিয়া  ক্রিকেট খেলবে৷ 

বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে নিজে খেলা বাদ দিয়ে বাধ্য হয়ে গেলাম ‘মানুষের' খেলা দেখতে৷ গ্যালারিই তখনও হয়নি, ফলে টিকেট বা প্রবেশমূল্যের প্রশ্নও ওঠে না৷ তার ওপর আমাদের ক্ষুদ্র আকৃতি আর গায়ে স্কুলের ইউনিফর্ম দেখে কেউ আর আমাদের নিয়ে মাথাও ঘামালো না৷

দিব্যি গ্যালারির এক কোণে বসে অনেক দূরে খেলোয়াড়দের দৌড়াদৌড়ির দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ মাঝেমধ্যেই খালি মাঠের কোনো এক কোণ থেকে হাততালি আর ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ' চিৎকার ভেসে আসছিল৷ দেখলাম, অনেক দূরে আরেক গ্যালারিতে কয়েকজন দর্শক বসে আছেন৷

আমরা ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলাম না৷ একে তো ফুটবলের চেয়ে আকারে ক্রিকেট বল অনেক ছোট, তার ওপর মাঠের মাঝখান থেকে কখন বল আমাদের দিকে ছুটে আসবে, সে অপেক্ষায় ধৈর্যচ্যূতি ঘটছে৷ এত বড় মাঠে এত ছোট বল নিয়ে এতগুলো মানুষের ছুটোছুটি আমাদের ঠিক পছন্দ হয়নি৷

একসময় ধৈর্য হারিয়ে কে জিতলো তা জানার অপেক্ষা না করে রওয়ানা দিলাম স্কুলের দিকে৷ কিন্তু তখন তো আর আমাদের হাতে হাতে ঘড়ি ছিল না৷ মোবাইল ফোন তো প্রশ্নই ওঠে না৷ যতই স্কুলের দিকে যেতে থাকলাম, আশেপাশের এলাকা খুব নীরব মনে হতে থাকলো৷ খুব কাছে গিয়ে বুঝলাম, টিফিন ব্রেক অনেক আগেই শেষ, ক্লাস শুরু হয়ে গেছে৷

তৎকালীন সময়ে মোটামুটি ভালো ছাত্র হওয়ার সুবাদে বসতাম প্রথম বেঞ্চে৷ ফলে আমার অনুপস্থিতি বেশ ভালোই নজর কেড়েছে শিক্ষকের৷ ক্লাস শেষ হওয়ার পর এক দৌড়ে ঢুকেও শেষ রক্ষা হয়নি৷ পরের ক্লাসের শিক্ষক এসেই আমাকে আমার তিন বন্ধুসহ বেশ অপমান করলেন৷ অন্যদের কথা জানি না, আমার এসব কোনো কথা গায়েই লাগেনি৷

কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো যখন শিক্ষক অপমান করে সন্তুষ্ট না হয়ে বেঞ্চে কানে ধরে দাঁড়াতে বললেন৷ আমার অধ্যাপক বাবা নিজে পাশেই এক কলেজে ক্লাস নেওয়া শেষ করে আমাকে নিয়ে যান৷ নিজের মান-সম্মান নিয়ে আমার তেমন কখনোই কোনো আশা-ভরসা না থাকলেও আমাকে ‘কানে ধরা' অবস্থায় দেখলে তাঁর মান-সম্মানের কী হবে, সেটাই ছিল চিন্তার বিষয়৷

তবে বাঁচা গেল না৷ অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও শিক্ষকের মন গলল না৷ বাবা স্কুলের সামনে এসে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েই দেখলেন, তাঁর সুপুত্র কানে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ এরপরের ইতিহাস রাগী বাবার প্রায় সকল সন্তানেরই অল্পবিস্তর একইরকম৷ ফলে আর বিস্তরিত বর্ণনায় গেলাম না৷ 

এরপর জলে জলে বেলা গড়িয়েছে৷ ১৯৯৭ সাল৷ আমিও বড় হয়েছি, বাংলাদেশ দলও বড় হয়েছে৷ এখন তো ফেসবুক, ইউটিউবে বিশ্বের যে-কোনো প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের খেলা আমরা দেখে ফেলি৷ কিন্তু তখন একমাত্র ভরসা বিটিভিরও সরাসরি খেলা দেখানোর নিজস্ব ব্যবস্থা ছিল না৷ ফলে আইসিসি ট্রফির সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল, সেটি জানতেও আমার লেগে যায় অনেক সময়৷

ফাইনালে আর সে ভুল করিনি৷ আগের দিন ৫০ ওভারে ২৪১ রান করেছিল কেনিয়া৷ স্টিভ টিকোলো একাই করেছিলেন ১৪৭ রান৷ কিন্তু এরপর বৃষ্টিতে আর বাংলাদেশ মাঠেই নামতে পারেনি৷ পরদিন খেলা হবে৷ খোঁজ-খবর নিয়ে সকাল থেকে সব কাজ গুছিয়ে বাসার লাল ট্রানজিস্টারটা ঠিকঠাক টিউনিং করে শুনছি ধারাভাষ্য৷ মালয়েশিয়ার সেই কিলাত কেলাব মাঠ৷ প্রতিপক্ষ সেই কেনিয়া৷ ডাকওয়ার্থ-লুইস মেথডে নতুন লক্ষ্য ২৫ ওভারে ১৬৬৷

তখনকার দিনে বড় সারির দলের সামনেও প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন মাত্র ২৫ ওভারে এ লক্ষ্য অতিক্রম করা খুবই দু­সাধ্য৷ কিন্তু ধীরে ধীরে নিয়মিত উইকেট হারালেও এগোতে থাকলো বাংলাদেশ৷ সারাজীবন মনে থাকবে শেষ বলটির কথা৷ ধারাভাষ্যকার যখন বললেন, এক বলে দরকার এক রান, ক্রিজে তখন হাসিবুল হোসেন শান্ত৷ সেই যে কানে ধরেছিলাম তিন-চার বছর আগে, তার সব রাগ গিয়ে পড়ল কেনিয়ার ওপর৷ উত্তেজনায় লাল হয়ে গিয়েছিল কান৷

রেডিওতে শুনলেও ঠিক যেন নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছিলাম শান্তর পায়ে লেগে বল চলে গেছে৷ এক দৌড়ে মাঠে নেমে গেছে পুরো গ্যালারি৷ ততক্ষণে আমি এক ছুটে বাড়ি ছেড়ে রাস্তায়৷ শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়৷ সেই প্রথম বাংলাদেশের ক্রিকেট-উন্মাদনা আমার গায়ে লেগেছিল৷

বাংলাদেশ এরপর অনেক এগিয়েছে৷ ওয়ানডে স্ট্যাটাস তো আগেই ঘোষণা হয়েছিল, ২০০০ সালে মিলে যায় টেস্ট স্ট্যাটাসও৷ কিন্তু কখনো কি মনে পড়ে, কী হলো সেই কেনিয়ার? কোথায় আছেন সেই মাঠ কাঁপানো স্টিভ টিকোলো, মরিস ওদুম্বে, টমাস ওদোয়ো, মার্টিন সুজি, টনি সুজি?

বাংলাদেশ যখন কেবল ক্রিকেটের কৈশোরে, তখনই দুর্দান্ত দাপটে খেলতো কেনিয়া৷ ব্যক্তিগত শতরান, দলের তিনশ' ছুঁইছুঁই স্কোরের অভাব নেই৷ ১৯৯৬ সালে ওডিআই স্ট্যাটাস পেয়েছিল সে দেশটিও৷ ১৮ বছরের লড়াইয়ে পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেছে দেশটি৷ ২০০৩ সালে সবাইকে চমকে দিয়ে সেমিফাইনালে উঠে যাওয়া সেই কেনিয়া ২০১৪ সালে এসে বাছাইপর্বে পঞ্চমস্থান পেয়ে ওয়ানডে স্ট্যাটাসই হারিয়ে ফেলে৷

কিন্তু কেন এমন হবে? জানি, এর কোনো সহজ উত্তর নেই৷ একটি দেশের অভ্যন্তরের রাজনীতি, অর্থনীতি, অনেক কিছুই প্রভাব ফেলে খেলাতেও৷ কিন্তু ফুটবল নিয়ে ফিফা যেভাবে বিশ্বব্যাপী এগিয়ে যাচ্ছে, তুলনা করলে ক্রিকেট কি সে অর্থে আইসিসির হাতে সত্যিকার অর্থে ‘ইন্টারন্যাশনাল' হয়েছে?

HA Asien | Anupam Deb Kanunjna

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

 

এখন আরব আমিরাত, হংকংয়ের মতো অনেক নতুন দল উঠে আসছে বটে, কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেসব দলের অধিকাংশই ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সে দেশগুলোতে অভিবাসী৷ সেই দেশগুলোতেও কি স্থানীয়দের মধ্যে জনপ্রিয় হতে পারছে ক্রিকেট?

এশিয়া কাপে কেন ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নামের কয়েকটা দলের আধিপত্য? কেন এশিয়া কাপে খেলার জন্য পুরো এশিয়া মহাদেশে হইহই কাণ্ড শুরু হয় না? কেন আফ্রিকার প্রায় অর্ধশত দেশ থেকে নতুন কোনো দেশ ক্রিকেটে এগিয়ে আসছে না?

বিশেষজ্ঞরা হয়তো বলতে পারবেন ভালো, কিন্তু একটা খেলায় কেন এত বাধা প্রয়োগ করে চূড়ান্ত পর্বে গুটিকয়েক দলকে সুযোগ দেয়া হবে, আর তারপর সেটাকে ‘বিশ্বকাপ' নাম দিয়ে ‘প্রহসন' করা হবে, তা-ও আমি কখনোই বুঝতে পারি না৷ আমার কাছে ফুটবল মানে বৃষ্টির মধ্যেও কাদা মাঠে ইচ্ছেমতো ছুটাছুটি, ক্রিকেট মানে ইট দিয়ে বা দেয়ালে দাগ কেটে বানানো স্ট্যাম্প দিয়ে, গাছের গুঁড়ি কেটে বানানো ব্যাট আর লন টেনিসের বল দিয়ে খেলা৷

সেদিনের অপেক্ষায় থাকবো, যেদিন অভিজাতদের কবল থেকে মুক্ত হবে ক্রিকেট৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন