অবহেলায় নয়, বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণরা আসছেন একাকিত্ব ঘোচাতে | আলাপ | DW | 10.10.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

অবহেলায় নয়, বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণরা আসছেন একাকিত্ব ঘোচাতে

শহরে কয়েকটা বড় ঘটনা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নিঃসঙ্গ প্রবীণ-প্রবীণাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে৷ দেখা গেছে, রং বা কলের মিস্ত্রি, এমনকি পরিচারিকার হাতেও খুন হচ্ছেন তাঁরা৷ নিরাপত্তার মতো তাঁদের প্রয়োজন সাহচর্যও৷

তাই অনেকেই বৃদ্ধাশ্রম বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছায়৷ আবার ইলেকট্রিক বিল জমা দেওয়া, কলমিস্ত্রিকে খবর দেওয়া– এসব গেরস্থালির কাজে জেরবার হয়ে যাচ্ছিলেন মধুজা সরকার৷ অবিবাহিতা, বছর পঁচাত্তরের এই বৃদ্ধা নির্ঝঞ্ঝাটে থাকতেই বেছে নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রম৷ কেমন আছেন এঁরা সবাই? বৃদ্ধাশ্রমেই ডয়চে ভেলের কথা হলো তাঁদের সঙ্গে৷

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষের আয়ু বাড়ছে৷ বাড়ছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সংখ্যা৷ বাড়ছে তাঁদের সমস্যাও৷ সমাজের পরিবর্তিত মূল্যবোধ, পারিবারিক অবহেলা, কোনও কোনও ক্ষেত্রে সাংসারিক অশান্তিও হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবীণ-প্রবীণাদের বাড়িতে থাকার পথে বাধা৷ হাসনাবাদের মাতঙ্গিনী বৈদ্য থাকছেন চেতলার একটি বৃদ্ধাশ্রমে৷ ছেলেকে বাড়ি লিখে দেওয়ার পর ছেলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে তাঁকে৷ কিংবা হাতিবাগানের একটি বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক ঋতা দত্ত ছেলের মৃত্যুর পর নাগের বাজারে ছেলের ফ্ল্যাটে কিছুতেই থাকতে রাজি ছিলেন না৷ প্রতিনিয়ত মৃত ছেলের স্মৃতি যেন তাঁকে তাড়া করে বেড়াতো৷ তাই দু ক্ষেত্রেই বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানাটা তাঁদের বেঁচে থাকার সহায়ক হয়ে উঠেছিল৷ 

অডিও শুনুন 07:31
এখন লাইভ
07:31 মিনিট

‘‘বাকিরা একাকিত্ব দূর করতেই আসেন’’

স্যাঁতসেঁতে, আলো-বাতাসহীন ঝুপসি ঘরে চট গায়ে বৃদ্ধার পড়ে থাকার দৃশ্য আজ চলচ্চিত্রে পাওয়া গেলেও বাস্তবে পাওয়া যায় না৷ নিপীড়িত নির্যাতিত হয়ে বাড়িছাড়া নন আজ শহরের অধিকাংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা৷ বরং এসবের থেকেও আজ শহরের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে প্রবীণ-প্রবীণাদের সংখ্যা বাড়ছে স্রেফ নিজের মতো করে থাকার প্রবল ইচ্ছে থেকে৷ তুলনা টানা যেতে পারে প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘দহন' ছবিতে সুচিত্রা মিত্র অভিনীত চরিত্রটির সঙ্গে৷ সংসারে অবাঞ্ছিত না হয়েও তিনি নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিলেন বলে বেছে নিয়েছিলেন বৃদ্ধাশ্রম৷ বাস্তবেও এমন সংখ্যাটাই বেশি৷

দমদম ক্যান্টনমেন্টের ‘স্বপ্ননীড়' বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক সঞ্জয় সুরের কন্ঠেও একই সুর শোনা গেল৷ তিনি বললেন, ‘‘বৃদ্ধাশ্রম মানেই পারিবারিক অশান্তিতে সবাই বাড়ি ছেড়ে আসেন, এমনটা নয়৷ মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোক পারিবারিক অশান্তিতে আসেন৷ বাকিরা একাকিত্ব দূর করতেই আসেন৷''

স্বপ্ননীড়ে ৪৮ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আছেন৷ ৮৪ বছরের গীতা গুপ্ত এখানকার সবচেয়ে পুরোনো আবাসিক৷ দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই বৃদ্ধাশ্রমে৷ ‘‘কেমন আছেন?'' জিজ্ঞেস করলে কোনও কান্নাকাটি নয়, বরং বেশ ঝরঝরে গলায় বললেন, ‘‘ভালোই আছি আমরা৷'' জানা গেল, একসঙ্গে বসে টিভি দেখা, গীতা পাঠ বা রেডিও শোনাতেই তাঁর দিন কাটে৷ মাঝে মাঝে মেয়ের বাড়ি থেকে ঘুরেও আসেন৷ স্বপ্ননীড়ে পিঠের সময় পিঠেপুলি পাওয়া বা তালের বড়ার মতো বাঙালি খাবার পাওয়াটা দারুণ প্রাপ্তি বলে জানান তিনি, বললেন, ‘‘এটা তো বাড়িতেও পাওয়া যায় না৷ তাছাড়া বছরে একবার করে ঘুরতে যাওয়ারও সুবিধা রয়েছে বৈকি!'' গীতা গুপ্তের কথার সুর শোনা গেল কমলা দাস, শীলা দাস, রাজলক্ষ্মী সোমের মতো আবাসিকদের কন্ঠেও৷ তাঁরা সবাই আশির উর্দ্ধে, বৃদ্ধাশ্রমে ৪-৫ বছরের বেশি রয়েছেন৷ অবসর কাটানোর জন্য একটু গল্প করা, সিনেমা দেখাতেই তাঁরা খুশি৷ কেউ লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন না, কেউ বা চোখে ভালো দেখতে পান না৷ স্বপ্ননীড়ে এঁদের দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত ম্যানেজার বর্ণালী দেবনাথ জানালেন, ‘‘মাসিমারা প্রথম যখন আসেন, তখন মানসিকভাবে তাঁরা একটু বিপর্যস্ত থাকেন৷ পরে সব মানিয়ে নেন৷ তার মধ্যেও অনেকের বাড়ির প্রতি টানটা থাকে৷ আমরা যতটা সম্ভব ভালো রাখতেই চেষ্টা করি৷'' 

এটাই ঘটনা৷ আজকালকার ইঁদুরদৌড়ের জীবনে আর নিউক্লিয়াস পরিবারে সুপ্রতিষ্ঠিত চাকুরে সন্তান থাকা সত্বেও বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখার মতো কেউ থাকে না, কেননা, বেশিরভাগ সন্তানকে চাকরির জন্য শহরের বাইরে থাকতে হয়৷ এই ধরনের নিঃসঙ্গ বাবা-মায়েদের পরিষেবা দেওয়ার জন্য বৃদ্ধাশ্রম দরকার৷

বিশিষ্ট সমাজকর্মী হিসেবে সঞ্জয় সুরের এলাকায় পরিচিতি আছে৷ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিয়ে সমাজসেবামূলক কাজে তাঁর অবদান লক্ষ্যণীয়৷ তাঁর মতে, ‘‘পাশাপাশি যারা বিবাহ করেননি ঠিক সময়ে, এক কথায় ব্যাচেলর, তাঁদের একটা সময় পরে বিশেষত অবসরের পর বৃদ্ধাশ্রম প্রয়োজন৷ মেয়ে সন্তানকে বিয়ে দিলে বা ছেলে বিদেশে থাকলে, বৃদ্ধদের সঙ্গ দেওয়ার দরকার হয়৷ আগের কনসেপ্ট এখন মিলবে না৷ আগে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা মানেই আমরা আমাদের মা বাবাকে ফেলে রেখে এসেছি- এই ভাবনা ছিল৷ কিন্তু এখন বৃদ্ধাশ্রম একটা স্ট্যান্ডার্ড হোটেলের মতো৷ একটা অ্যাসোসিয়েশন পাওয়া যায় এখানে৷ পারস্পরিক ভাবের আদান প্রদানের জন্য মানসিক শান্তি বা নিরাপত্তার জন্য বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই শ্রেয়৷ নিঃসন্তান দম্পতিরা অবসরের পরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকবেন বলে খোঁজ নিয়ে যান আগেই৷''

স্বাভাবিকভাবেই প্রবীণদের একা একটা বাড়িতে থাকা মোটেও নিরাপদ নয়৷ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বলছে, শহরে রাতের বেলায় নিঃসঙ্গ বৃদ্ধদেরই দুর্ঘটনা ঘটে বেশি৷ দরজা ভেঙে মৃতদেহ বের করতে হয়৷ কলকাতা পুলিশের ‘প্রণাম' সংস্থা আছে বটে, কিন্তু সেখানে তো ফোনটুকু করতে হবে৷ আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তার সময়টাও পাওয়া যায় না৷         

সঞ্জয় সুর বলেন, ‘‘সল্টলেকে আরও বেশি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলা উচিত৷ তাহলে নিরাপদ হবে ওখানকার বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জীবন যাপন৷ তবে, শুধু ব্যবসার তাগিদে বৃদ্ধাশ্রম করলে সেখানে প্রবীণদের ঠিকমতো পরিষেবা না-ও দেওয়া হতে পারে৷''

নিজের পরিবার বা যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক, তাদের বাইরে বৃদ্ধাশ্রমের এই পরিষেবায় কতটা প্রাণের ছোঁয়া থাকতে পারে? এ ব্যাপারে কলকাতার প্রখ্যাত মনোবিদ কামাল হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সমাজের অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে৷ একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙনের সূচনা যেদিন হয়েছে, সেদিনই এই পরিণতি অনিবার্য ছিল৷ তাই প্রাণের ছোঁয়া না থাকলেও পরিষেবা মিলছে, এটা বড় কথা৷'' কিন্তু সেই পরিষেবা কি পর্যাপ্ত? মনোবিদের ব্যাখ্যা, ‘‘পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে৷ আবেগের ঘাটতিও থাকতে পারে৷ কিন্তু, সে জন্য একাকিত্ব ঘোচানোর সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না৷ তাতে আবেগের সঙ্গে পরিষেবা থেকেও বঞ্চিত হতে হবে৷'' 

বৃদ্ধাশ্রমের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে৷ কিন্তু যত চাহিদা সেই অনুযায়ী বৃদ্ধাশ্রমের আসন খালি নেই৷ তাই অনেকে জায়গা পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন৷ অনেক প্রবীণকে একটা ঘর পাওয়ার জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়৷

অডিও শুনুন 04:58
এখন লাইভ
04:58 মিনিট

‘‘সমাজের অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে’’

কলকাতার সরকারি বৃদ্ধাশ্রম ‘নবনীড়'-এর মতো পরিকাঠামো সব বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমে পাওয়া সম্ভব নয়৷ ‘স্বপ্ননীড়'-এর মতো সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো থাকবে, এমনটাও নয়৷ তাই পরিষেবা নিয়ে অভিযোগও আছে৷ অনেক ক্ষেত্রে মোটা টাকা আদায় করা হলেও যথাযথ পরিষেবা দেওয়া হয় না৷

এর থেকেও একটা বড় প্রশ্ন রয়েছে৷ এসব বৃদ্ধাশ্রম একান্তই সমাজের মুষ্টিমেয় বিত্তবান অংশের জন্য৷ কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, বসবাসের জন্য যে টাকা ধার্য করা হয়, তা জোগানো কোনও নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়৷ তাই সেই অংশের প্রবীণদের কাছে একাকিত্ব আর মন খারাপের কী ওষুধ তা কি বাতলাবে সমাজ?

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন