1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

অনলাইন হয়রানিতে বিপন্ন নারীর জীবন

হারুন উর রশীদ স্বপন ঢাকা
২৮ নভেম্বর ২০২২

বাংলাদেশের ৬৪ শতাংশ নারী অনলাইনে হয়রানি ও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন৷ তাদের অধিকাংশই এর প্রতিকারের জন্য পুলিশের কাছে যান না৷ যারা যান তাদের অধিকাংশই কোনো প্রতিকার পান না৷ এরকম সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে৷

https://p.dw.com/p/4KBij
অনলাইন হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেকে৷
প্রতীকী ছবিছবি: picture-alliance/dpa/S. Gollnow

এ্যাকশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে৷ রোববার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়৷

‘পুরো পরিবার ৫ বছর বিভীষিকার মধ্যে ছিল'

ঢাকায় বসবাসরত এক তরুণীর ২০১৫ সালে বিয়ে হয়৷ বিয়ের পর শুধু ওই তরুণী নয়, তার পুরো পরিবার অনলাইন, বিশেষ করে ফেসবুকে হয়রানির শিকার হন৷ তাতে ওই তরুণীর বিয়ে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল৷ তার ভাই জানান, ‘‘২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর ধরে এই হয়রানি অব্যাহত ছিল৷ পুলিশের কাছে অভিযোগ করার পর ২০২১ সাল থেকে হয়রানি বন্ধ হয়৷ কিন্তু অপরাধীকে চিহ্নিত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি৷''

তিনি জানান, ‘‘আমার বোনের বিয়ের পর একটার পর একটা ফেক ফেসবুক আইডি খুলে আমার বোন সম্পর্কে অশ্লীল কথা লিখে পোস্ট দেয়া হতো৷ আর সেটা তার স্বামীর ইনবক্সেও পাঠানো হতো৷ এখানেই শেষ নয়, আমাদের পরিবারে সদস্যদের ইনবক্সেও পাঠানো হতো৷ বলা হতো তার কাছে অনেক ভিডিও এবং ছবি আছে, যা সে প্রকাশ করবে৷ হুমকি দিত৷ এক পর্যায়ে আমরা পুরো পরিবারই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি৷ আমার বোনকে তার স্বামীও ভুল বুঝতে শুরু করেন৷ দূরত্ব তৈরি হয়৷'' 

আমাদের অনলাইন লিটারেসি বাড়াতে হবে: ফারাহ কবির

তিনি বলেন, ‘‘কোনো উপায় না দেখে ২০২১ সালের প্রথম দিকে আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করি৷ এরপর থেকে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তির তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়৷ তবে তাকে গ্রেপ্তার বা চিহ্নিত করার কোনো খবর পুলিশ আমাদের দেয়নি৷''

তার কথা, ‘‘পাঁচটি বছর আমার বোনসহ আমাদের পুরো পরিবারের সদস্যরা এক বিভীষিকার মধ্যে ছিলাম৷ আমরা আতঙ্কে থাকতাম, কখন অশ্লীল পোস্ট দেয়, মেসেজ পাঠায়৷ আমাদের পরিবারের স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল৷ সেই কথা মনে পড়লে এখনো আমরা আঁতকে উঠি৷ আমার বোনটি এখন মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে৷''

আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী এখন মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত৷ তিনি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা মাধ্যমে এখন হয়রানির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন৷ তার ফেসবুক থেকে ছবি নিয়ে সেটাই বিকৃত করে তার নামেই ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে হয়ররানি করা হচ্ছে৷ তিনি জানান, ‘‘তারা আমার ছবি ও ভিডিও নিয়ে বিকৃত করে প্রচার করছে৷ প্রথম প্রথম এটা নিয়ে আমি খুব ডিপ্রেশনে থাকতাম৷ পরে মেনে নিয়েছি৷ আমার এখন ভাবনা, আমি যেহেতু মিডিয়ায় কাজ করি তাই আমাকে নিয়ে এরকম হতেই পারে৷ আমি এখন আর পাত্তা দেই না৷''

‘‘তবে ভয়াবহ ব্যাপার হলো হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে নানা অশ্লীল প্রস্তাব করা হয়, বাজে মন্তব্য করা হয়৷ এনিয়ে আমি একবার পুলিশের শরণাপন্নও হই৷ কিন্তু প্রতিকার পাইনি৷ আরেকবার তারা আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে সেখানে আমার ছবি বিকৃত করে নানা অশ্লীল ছবি দিয়েছে,'' জানান এই তরুণী৷

তিনি বলেন, ‘‘আমি না হয় সামলে নিয়েছি৷ কিন্তু আমার পরিচিত অনেকেই পারছেন না৷ এ নিয়ে আমার পরিচিতদের মধ্যে সুইসাইডের মতো ঘটনাও ঘটেতে যাচ্ছিল৷ একবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগডেতে নাচার ছবি ও ভিডিও নিয়ে অশ্লীল প্রচারও চলানো হয়৷''

সংবাদমাধ্যমে এই রকম হয়রানির পর আত্মহত্যার খবর প্রায়ই দেখা যায়৷ গত ২২ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে এক কলেজ ছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও ফেসবুকে আপ করে দেয়ার পর সেই তরুণী আত্মহত্যা করেন৷ গত ৭ জুলাই সাতক্ষীরায় একই ধরনের ঘটনায় এক স্কুল ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন৷

অ্যাকশনএইডের জরিপ

অ্যাকশনএইডের ‘বাংলাদেশে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা' শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছর বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৬৩.৫১ শতাংশ সহিংসতার শিকার হয়েছেন৷ আগের বছরের তুলনায় যা ১৪ শতাংশ বেশি৷ এরমধ্যে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তারা৷ এই হার ৪৭ শতাংশ৷ মেসেঞ্জারে হারটি ৩৫ শতাংশ৷ এছাড়া ইনস্টাগ্রাম, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউবসহ অন্যান্য মাধ্যমেও সহিংসতার মুখে পড়েছেন নারীরা৷ গত ১১ থেকে ১৮ নভেম্বর ৫১৪ অনলাইন ব্যবহারকারী নারী তাদের এই গবেষণা জরিপে অংশ নেন৷ 

গবেষণায় বলা হয়, অনলাইনে নারীরা ১২ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন৷ সবচেয়ে বেশি ৮০ শতাংশ নারী অশ্লীল, ক্ষতিকর, যৌনতামূলক ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য পেয়ে থাকেন৷ ৫৩ শতাংশ নারীকে ইনবক্সে অশ্লীল ছবি পাঠিয়ে যৌন সম্পর্ক করার কথা বলে হয়রানি করা হয়৷ বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন ১৯ শতাংশ নারী৷ সামাজিক মাধ্যমে নারীদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলার মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ নারী৷ ১৬ শতাংশ নারী বলেছেন, সাইবার জগতে তাদের কর্মকান্ড সব সময় অনুসরণ করা হচ্ছে৷

২০২১ ও ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে অ্যাকশনএইড বলছে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর হার খুবই কম, মাত্র ১৫ শতাংশ৷ যারা অভিযাগ করেছেন তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা প্রতিকার পাননি৷ আর যারা হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হন তাতের মধ্যে কিশোরীও রয়েছেন৷

‘সাহসী হতে হবে'

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘‘আমরা তো সাইবার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারব না৷ তাই আমাদের অনলাইন লিটারেসি বাড়াতে হবে৷ বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সতর্কতাগুলো বুঝতে হবে৷ আর এটার যে প্রতিকার পাওয়ার উপায় আছে তাও সবাইকে জানাতে হবে৷ কোনো লজ্জার কারণে ভয়ে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকা নয়, সাহস নিয়ে অভিযোগ করতে হবে৷ আর সামাজে এই অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করতে ব্যাপক কাম্পেইন করতে হবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং হয়রানি বাড়ছে৷ সরকার সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং অভিযোগের জন্য হটলাইন চালু করেছে৷ কিন্তু যারা এই অপরাধ নিয়ে কাজ করেন সেই পুলিশ সদস্যদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন৷ কারণ অধিকাংশ হয়রানি করা হয় ফেক আইডি থেকে৷ তাই অপরাধীকে চিহ্নিত করার জন্য দক্ষতা ও সাইবার জ্ঞান জরুরি৷''

ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার  হুমায়রা পারভীন বলেন, ‘‘অভিযোগ না করার অনেক সামাজিক কারণ থাকতে পারে৷ কেউ হয়ত লজ্জার ভয়ে অভিযোগ করেন না৷ কিন্তু সাইবার ক্রাইম ইউনিট এটা নিয়ে কাজ করছে, অভিযোগ নিচ্ছে৷ অভিযোগ করলে পুলিশ অবশ্যই প্রতিকারের ব্যবস্থা করে৷ অভিযোগ করতে হবে৷''