1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু – মাদক

২০ জুন ২০১১

উরাবা গ্রামের পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ শরণার্থীদের মত জীবন যাপন করে৷ এর মূল কারণ হল মাদক ব্যবসা এবং মাদক সম্রাট৷ এদের সাহয্যে কাজ করছে মনবাধিকার কর্মী দিয়েগো এসপিতিয়া৷

https://p.dw.com/p/11fEh
কোকেনছবি: picture alliance/dpa

কলম্বিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পাজেরো জিপে বসে আছেন সাংবাদিক হোসে অসপিনা৷ গাড়িটি বুলেটপ্রুফ৷ চালক অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে৷ সে একটি বুলেট প্রুফ ভেস্ট পরে আছে৷ পেছনের সিটে বসেছে একজন দেহরক্ষী৷ সে বেশ কয়েকবার হোসে অসপিনার কাগজ-পত্র পরীক্ষা করে দেখেছে, অসংখ্য প্রশ্ন করেছে৷ এখন গাড়িতে কেউই কথা বলছে না৷ হোসে অসপিনাকে তারা নিয়ে যাচ্ছে কলম্বিয়ার ‘কালো তালিকা'ভুক্তদের শীর্ষনেতার কাছে৷ তবে এই ‘কালো তালিকা' সরকার ঘোষণা করেনি, করেছে কলম্বিয়ার মাদক সম্রাটরা৷ গত কয়েক বছর ধরে দিয়েগো এসপিতিয়া কাজ করছে উদ্বাস্তু মানুষদের সাহায্যে৷ জোর করে এসব মানুষকে তাদের বসত-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে৷ উচ্ছেদ করেছে স্থানীয় মাদক সম্রাটরা৷

Menschenrechte Landvertreibung Kolumbien
উরাবার মানুষরা আশ্রয় নিয়েছে অন্যত্রছবি: FORJANDO FUTUROS

অঞ্চলের নাম উরাবা৷ এই অঞ্চলের কয়েকশ' মানুষ জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গেছে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে৷ এখানে ডানা মেলে রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীরা৷ এই অঞ্চল মাদক পাচারের জন্য বেছে নিয়েছে তারা৷ উরাবার গভীর ঘন জঙ্গল মাদক পাচারের জন্য সহজ এবং তাতে সুবিধাও অনেক৷ আটলান্টিক এবং প্যাসিফিক থেকে কোকেন পাচার করা খুবই সহজ৷ মিটিং পয়েন্ট উরাবা৷ এ কারণেই এই অঞ্চল নিয়েই বিভিন্ন মাদক সম্রাটদের মধ্যে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ৷ দিয়েগো এসপিতিয়াকেও বেঁচে থাকার জন্য পালিয়ে যেতে হয়েছিল৷

হিটম্যানদের মূল নিশানা দিয়েগো এসপিতিয়া

গ্রামের নাম মেডেলিন৷ সেখানে একটি ক্যাফেটেরিয়ার সামনে দিয়েগো এসপিতিয়ার সঙ্গে দেখা হয় হোসে অসপিনার৷ দিয়েগোকে দেখলে মনে হবে অত্যন্ত শান্ত একজন মানুষ৷ একজন দেহরক্ষী দিয়েগোর সঙ্গে থাকে ছায়ার মত৷ আরেকজন আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করছে৷ দিয়েগো খুব অস্পষ্টভাবে কথা বলে৷ কারণ হিসেবে সে জানাল,‘‘আমার মুখে গুলি লেগেছিল৷ জিভের অর্ধেক উড়ে গেছে৷ তাই কথা জড়িয়ে যায়৷ এ জন্য আমি দুঃখিত৷ এখন অর্ধেক জিভ ঝুলে রয়েছে৷ তা দিয়েই কোন মতে কথা চালানোর কাজ সারি৷ মাফিয়ারা জানে আমি সবসময়ই বুলেট প্রুফ ভেস্ট পরে থাকি৷ তাই আমার মাথা লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল৷'' এসপিতিয়ার গ্রামে মাদক সম্রাটরা আসন গেড়েছে৷ গত বছর তাঁকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়৷ মাদক ব্যবসা এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তিই দিয়েগোকে চেনে৷ সেল ফোনের মাধ্যমে দিয়েগোর ছবি সবার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে৷ দিয়েগোকে যে কোন ‘হিটম্যান' দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চিনবে৷ তাই অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় থাকতে হয় দিয়েগোকে৷ মাত্র ২৫ বছর বয়সেই দিয়েগোকে চলাফেরা করতে হয় দেহরক্ষীদের সঙ্গে৷ গ্রামের সাধারণ মানুষদের বসতি রক্ষায় সে তাঁর নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে৷ যে দেহরক্ষীরা দিয়েগোর সঙ্গে থাকে তাদের নিয়োগ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ দিয়োগো ‘উইটনেস প্রটেকশান প্রোগ্রাম' এর অন্তর্ভুক্ত৷ তাই রাষ্ট্র তাঁকে সাহায্য করছে৷

Menschenrechte Landvertreibung Kolumbien
মানাবাধিকার কর্মীরা সাহায্য করতে পারছে নাছবি: FORJANDO FUTUROS

উরাবা গ্রামকে বেছে নেয়া হয়েছে মাদক পাচারের জন্য

উরাবার মানুষদের উচ্ছেদ করতে প্রথমে খুব হালকাভাবে হুমকি দিয়েছিল মাদক সম্রাটরা৷ এরপরেও যখন গ্রামের মানুষরা গ্রাম ছাড়তে রাজি হয়নি তখন তারা কঠোর হয়৷ দিয়েগো জানালেন, ‘‘একজন মহিলার স্বামীকে তার চোখের সামনে হত্যা করা হয়৷'' এরপর তার বাবাকে বলে, ‘‘ হয় আমাদের কাছে তোমাদের এই জায়গা বিক্রি করবে নয়তো খুব অল্প দামে আমরা তোমার মেয়ের কাছ থেকে তা কিনে নেব৷ সিদ্ধান্ত নিতে হবে তোমাকে৷'' দিয়েগো তাঁর পুরো পরিবার নিয়ে পালিয়ে যায়৷ মাসের পর মাস তারা পালিয়ে থাকে৷ একেকবার একেক জায়গায় তারা থাকতে শুরু করে৷ দিয়েগো এরপরও সবাইকে মানবাধিকারের কথা বলতে থাকে, সবাইকে বোঝাতে থাকে৷ তাঁর আশা ছিল হয়তো এই ‘উচ্ছেদ' সে বন্ধ করতে পারবে৷ কিন্তু দেখা গেছে প্রতিবারই মাফিয়ারা এসেছে ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে৷ এরপর জোর করে সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে৷ পুরো গ্রামটি ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক ব্যবসা এবং পাচারের কাজে৷

উরাবার মানুষরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করেছে সেই গ্রামে৷ এখন তাদের নতুন করে বসতি গাড়তে হবে মেডেলিনে৷ সেটি কি আদৌ সম্ভব? অনেকের পড়াশোনা শুধু মাত্র স্কুল পর্যন্ত৷ এরপরই তারা কাজে নেমেছে বা জীবিকা নির্বাহে নিজেদের নিয়োজিত করেছে৷ তাই অনেকেই বার বার ফিরে যায় উরাবায়৷ তাদের সাহায্য করছে দিয়েগো৷ সে বলল, ‘‘আমি তাদের সাহায্য করছি নিজের গ্রাম, জমি আবার ফিরে পাওয়ার জন্য৷ অনেকেই স্বপ্ন দেখে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার এবং গম, ভুট্টা, কচুর চাষ করার৷ আমরা ভেবেছিলাম মাফিয়ারা যদি আমাদের দেখে তাহলে হয়তো আর কিছু করবে না৷ আমরা ফিরে এসেছি হয়তো আর বাধা দেবে না৷'' কিন্তু হিসেবে ভুল ছিল৷ মাদক ব্যবসায়ীরা ফিরে আসে৷ আর এবার তারা ফিরে আসে রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে৷ তাদের সঙ্গে ছিল পুলিশ বাহিনী৷ পুলিশ তাদের জানায়,‘সরকারের অনুমতি ছাড়া এ গ্রামে প্রবেশ নিষেধ৷ এখানে থাকা অবৈধ৷' ‘‘একবার এক মেয়র পর্যন্ত এসেছিল পুলিশের সঙ্গে৷ আমরা সবাই মিলে ছিলাম মাত্র ২৮০ জন মানুষ৷ আর তারা ছিল প্রায় দুশো জন৷ তারা তৈরি হয়েই এসেছিল৷ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে আমাদের সেখানে থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল৷''

Kolumbien Tod des Drogenbosses Guerrero
মাফিয়ারা সবসময়ই ভারি অস্ত্রে সজ্জিতছবি: AP

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ উরাবা

এক পর্যায়ে উরাবার মানুষরা আশা ছেড়ে দেয়৷ তারা মেডেলিনের বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস শুরু করে৷ কিন্তু দিয়েগো এসপিতিয়া তাঁর কাজ বন্ধ রাখেনি৷ সে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে৷ মাদক সম্রাটদের বিরুদ্ধে সে এখনো সোচ্চার৷ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে দিয়েগো৷ আর দিয়েগো দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মাদক সম্রাটদের৷ যেভাবেই হোক দিয়েগোকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে৷ দিয়েগো কোথায় যাবে, ঘুমাবে, কোন রেস্টুরেন্টে খাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে সে সব সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর দেহরক্ষীরা৷

প্রতিবেদন: মারিনা জোয়দার

সম্পাদনা: হোসাইন আব্দুল হাই