1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

৮০ বছর পূর্ণ করতে চলেছেন সুচিত্রা সেন

বাংলা ছায়াছবির জগতে সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা বোধ হয় সুচিত্রা সেন৷ প্রথম ছবি ‘শেষ কোথায়’৷ শেষ ছবি ‘প্রণয়পাশা’৷ আগামী ৬ এপ্রিল কিংবদন্তী সেই নায়িকার ৮০ জন্মবর্ষ পূর্তি৷

default

‘নামে কিবা এসে যায়' - এই প্রবাদ সঠিক নয় সর্বদা৷ বিশেষতঃ, নাটকে-সিনেমায়৷ নায়ক-নায়িকার নাম হবে ওজনদার, দর্শকের চিত্ত বিলোড়িত করবে, অন্তত ষাটের দশকে৷ এই যেমন, উত্তমকুমারের আসল নাম কী - তা অনেকেরই অজানা৷  

নামে অবশ্যই কৌলিন্য দরকার৷ ছিলেন রমা দাশগুপ্ত৷ হয়ে গেলেন সুচিত্রা সেন৷ প্রথম ছবি ১৯৫২ সনে৷ সেই ছবি ‘শেষ কোথায়'-এ রমা দাশগুপ্ত নামেই অভিনয় করেছিলেন তিনি৷ ছবিটা অবশ্য কোনোদিনই মুক্তি পায় নি৷

গুজব তথা গুঞ্জরণ এই যে, অভিনয়ের জন্য নিজেই ‘সুচিত্রা' নামটি বেছে নিয়েছিলেন তিনি৷ তবে এ কথা হয়তো ঠিক নয়৷ সুচিত্রার নিজের কথায়, ‘‘আমাদের এক আত্মীয় সুকুমার দাশগুপ্তই আমার ‘সুচিত্রা' নামকরণ করেন৷'' কারণও ছিল৷ সুকুমার দাশগুপ্ত তৈরি করেন ‘সাত নম্বর কয়েদী' নামে একটি ছবি (১৯৫৩)৷ সেখানে নায়িকা রমা নয়, সুচিত্রা৷ স্বামী দিবানাথের পদবী সেন-ও যোগ করা হয়৷ ছবির নায়ক ছিলেন সমর রায়৷ ছবিটি রীতিমতন ফ্লপ৷ রমা বলেন, ‘‘ফ্লপ হলেও সুচিত্রা নামটাই বেছে নেই৷''

সুচিত্রা কেন আমাকে এ কথা বলেছেন - তা নিয়ে কৌতূহল হতেই পারে পাঠকের৷ ঘটনা এমন আহামরি নয়৷ ওঁর কন্যা মুনমুন আমার বন্ধু৷ সহপাঠিনী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, তুলনামূলক সাহিত্যে৷ সেই সুবাদে, সহপাঠি ও সহপাঠিনীরা মুনমুনের বাড়িতে কতো দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা গুলজার করেছি, ইয়ত্তা নেই৷

তবে আরো কারণ আছে বৈ কী ! বালিগঞ্জে মুনমুন আর আমার আস্তানার দূরত্ব সাকুল্যে ২০০ মিটারও হবে না৷ এও হয়তো বাহ্য৷ প্রসঙ্গক্রমে মুনমুন কখনো-বা বলে থাকবেন মাকে যে, আমার বাড়ি পাবনা৷ পাবনার কোথায় ? সুচিত্রা সেন নিজেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন একদিন৷ বলি, ‘‘শহরে, দিলালপুরে৷ আপনাদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ির সীমান্ত পেয়ারা গাছ, সুপারি গাছ, নারকেল গাছে ঘেরা ছিল, অন্তত তখন৷ এখনো আছে৷ আপনাদের বাড়ি একতলা৷ এক বিঘে জমির ওপর৷ আর আমাদের বাড়ি ছিল দোতলা৷'' স্মৃতি ঝলসিয়ে সুচিত্রা বললেন, ‘‘ওই বাড়ির রিজিয়া আমার সঙ্গে পড়তো৷'' আমি বললুম, ‘‘তিনি আমার বড় আপা৷''

সুচিত্রা সেনের জন্ম ৬ এপ্রিল ১৯৩১৷ দিলালপুরে নয়, পাবনার সিরাজগঞ্জের (এখন জেলা) বেলকুচির (এখন উপজেলা) সেনডাঙার জমিদার বাড়িতে৷ সুচিত্রার মাতৃমহ ছিলেন ছোটখাটো জমিদার৷ বাবা - করুণাময় দাশগুপ্ত৷ মা - ইন্দিরা দাশগুপ্ত৷ বাবা দিলালপুরের একটি প্রাথমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন৷ আর মায়ের দায় ছিল ঘরকন্নার৷ করুণাময়-ইন্দিরা দাশগুপ্তর পাঁচ সন্তানের তৃতীয় ছিলেন রমা দাশগুপ্ত, আমাদের সুচিত্রা সেন৷

গোটা পাবনা জেলায় তখন একটিই সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, সেই দিলালপুরেই৷ ক্লাস সেভেন পর্যন্ত (অসমাপ্ত) পড়েছেন রমা দাশগুপ্ত৷ এইখানেই পাঠককে জানিয়ে রাখি, সুচিত্রার শ্বশুরের পিতামহ ছিলেন দীননাথ সেন৷ তাঁর নামে পুরোনো ঢাকায় একটি রাস্তা এখনো বহাল তবিয়তে৷ আর কলকাতায় আদিনাথ সেনের ব্যারিস্টার-ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে রমার বিয়ে হয় ১৯৪৭-এর অক্টোবরে৷

দেবকীকুমার বসু পরিচালিত ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য' (১৯৫৩, নায়ক বসন্ত চৌধুরী)৷ ছবিতে অভিনয় করে ঢেউ তোলেন সুচিত্রা৷ পরবর্তী ছবি, একই বছরে, ‘সাড়ে চুয়াত্তর'৷ পরিচালক নির্মল দে৷ নায়ক উত্তমকুমার৷ রমরমা৷ প্রচণ্ড হিট৷ কিন্তু, সুচিত্রা-উত্তম জুটির সেই ম্যাজিক তখনও শুরু হয়নি৷ অগ্রদূত পরিচালিত ‘অগ্নিপরীক্ষা' (১৯৫৪)-য় অভিনয় করে সুচিত্রা-উত্তম জুটি পোক্ত হয়ে যায়৷ যদিও সমর রায়, বসন্ত চৌধুরী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, রবীন মজুমদার, প্রশান্তকুমার, অসিতবরণ, উৎপল দত্ত, রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন৷ কিন্তু জুটি বলতে উত্তমের সঙ্গেই৷

হিন্দি-বাংলা মিলিয়ে মোট ৬০টি ছবিতে অভিনয় করেন কিংবদন্তী সেই নায়িকা৷ হিন্দি ছবিতে অশোককুমার, দিলীপকুমার, দেবানন্দ, সঞ্জিবকুমার, ধর্মেন্দ্র প্রমুখের সঙ্গে অভিনয় করেছিন৷ অনেকের মতে, ইচ্ছে করলেই তিনি বলিউডের সম্রাজ্ঞীও হতে পারতেন৷ কেন হন নি, জিজ্ঞেস করিনি৷

উত্তমের সঙ্গে নয়, সৌমিত্র'এর বিপরীতে ‘সাত পাকে বাঁধা' (১৯৬৩, পরিচালক অজয় কর)-য় অভিনয় করে, মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর শিরোপায় সম্মানিত হন সুচিত্রা৷ এছাড়াও, পান দাদাসাহেব ফালকে, রাষ্ট্রপতি অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার৷ তবে কোনো পুরস্কারই তিনি নিজে নিতে যাননি৷ তাঁর হয়ে কন্যা মুনমুন নিয়েছেন পুরস্কারগুলি৷ ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে মনোনীত করা হলেও, কেন বঞ্চিত করা হয় শেষ অবধি - সে রহস্য আজও অজানা৷ অবশ্য, সুচিত্রার জন্য এ ধরনের পুরস্কার আদৌ কোনো ব্যাপার নয়৷

সত্যজিৎ রায় একবার আমাকে বলেন, ‘‘দেবী চৌধুরানীর স্ক্রিপ্ট সম্পূর্ণ তৈরি৷ অভিনেতা-অভিনেত্রীও নির্বাচিত৷ সুচিত্রাই নায়িকা৷ ওঁকেই মানায়৷ কিন্তু, ব্যস্ততার ফলে এক বছরেও সময় দিতে পারেন নি তিনি ৷ তাই বাদ দিয়ে দেই ছবি৷''

সুচিত্রার বয়ান অবশ্য ভিন্ন৷ বলেন, ‘‘মানিকবাবু (সত্যজিৎ রায়)-র আমাকে দেখেই প্রথম কথা - আপনাকে গড়েপিঠে মানুষ করতে হবে৷ শুনে অপমানিত বোধ করি৷'' পরবর্তীতে, দীনেন গুপ্ত পরিচালিত দেবী চৌধুরানী (১৯৭৪, নায়ক রঞ্জিত মল্লিক)-র ভূমিকায় সুচিত্রা সেনের অভিনয় বঙ্কিমের গোটা উপন্যাসটিকেই যেন ম্লান করে দেয়৷

তবে দুই-তিনটি চরিত্রের বিচারে সুচিত্রা বিচার্য নন৷ সামগ্রিক সবকিছু মিলিয়েই সুচিত্রা সেন৷ তিনি কিংবদন্তী৷ চিত্তহরণকারিণী৷ ৮০ জন্মবর্ষে তাঁকে আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা৷

প্রতিবেদন: দাউদ হায়দার, বার্লিন

সম্পাদনা: দেবারতি গুহ