1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

১৩ বছরের প্রাচীর জন্য লড়াই

আমাদের নানি-দাদিদের বিয়ের সময় বয়স ছিল ১৩ বছর৷ এই তো কিছুদিন আগেও ভারতে গৌরীদান প্রথা ছিল৷ কই কাউকে তো মরতে দেখিনি এত? তাহলে কেন এই যুগে এসে লোকে ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’ বলে হুংকার? বড্ড ঢং হয়েছে আমাদের!

ইউনিসেফে এই বাল্যবিবাহ ব্যাপারটিকে বলা হয়েছে ‘শিশু অধিকারের পরিপন্থী'৷ ১৮ বছরের নীচে সবাই শিশু৷ সবাই তাদের রঙিন শৈশব কাটাবে এই সময়ে৷ ভাবুন, ১৫ বছরের এক মা! মানে এক শিশুই আরেক শিশুর জন্ম দিচ্ছে!

বাল্যবিবাহ কেন খারাপ তা নিয়ে ভূরি ভূরি রিসার্চ হয়েছে৷ একটা ১৪ বছরে সদ্য মাসিক হওয়া মেয়ের গর্ভধারণের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়৷

হ্যা! এখনই এত সমস্যা সমস্যা! কই আমাদের মা দাদীদের এত সমস্যা হয়নি তো?

হয়েছে! জরায়ুতে ক্যান্সার হতে পারে এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি হবার পর আমরা জেনেছি৷ কিংবা ক্যান্সার, এইডস তো খুব বেশি দিন আগের রোগ নয়৷ তার মানে আগে ক্যান্সার হতো না? নাকি প্যাপিলেমো ভাইরাসের কথা লোকে জানত না? অন্ধ থাকলেই প্রলয় বন্ধ হয় না৷

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা করে জানিয়েছে, ১৮-র নীচে মা হওয়াটা মেয়েদের জন্য ঝুঁকির৷ প্রসূতির সময় থেকে শুরু করে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য একটা ১৪ বছরের শরীর মোটেও প্রস্তুত না৷ তার উপর কমবয়সি মায়ের জন্ম দেওয়া বাচ্চা সাধারণত অপুষ্টিজনিত কারণে মারা যায় অথবা কমপ্লিকেশন নিয়ে জন্মায়৷ অথচ ভারতে ১৮-র নীচে মা হবার হার ৭৬ পার্সেন্ট৷ 

একটা শিশুকে বিয়ে দিলে কী রাতারাতি সে বড় হয়ে যায়! শরীর তার শিশুরই থাকে, মনেও লেগে থাকে শৈশব৷ সেই শিশু, যে কিনা তার সেকসুয়াল রাইটস নিয়ে জানার আগেই শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়৷ তাই বাল্যবিবাহ একটি লিগ্যাল ধর্ষণ ছাড়া কিচ্ছু নয়৷

সারা বিশ্বে ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ' নিয়ে কাজ চলছে, আর এই সময়েই বাংলাদেশ একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়ে নিল

রোমান যুগে ছেলে-মেয়ে দু'জনকেই বাচ্চা বয়সে বিয়ে দেওয়া হতো৷ যুগে যুগে পুরুষের আধিপত্য বেড়েছে৷ তাই ছেলেদের কমবয়সি বিয়ে হওয়াটা কমেছে৷ কারণ, সমাজ বুঝেছে, ছেলে যদি স্বাবলম্বী হবার আগে বিয়ে করে বাপ হয়, তাহলে পরিবারেরই ক্ষতি৷

কিন্তু যেহেতু এখনও মেয়েদের সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মনে করা হয়, তাই পিরিয়ড হবার পরে, মানে সন্তান জন্মদানের জন্য ডিম্বাণু গঠন করা শুরু করলেই, তার শরীর মহাউৎসাহে শুক্রাণু নেবার জন্য বলিদান করা হয়!

ভাবুন! ১০০রও বেশি দেশে এখনও বাল্যবিয়ে লিগ্যাল৷ ১৬ বছরের ছেলে মেয়ে অনুমতি নিয়ে বিয়ে করতে পারে অস্ট্রেলিয়াতে৷ ভার্জিনিয়াতে এখনো বাল্যবিবাহ হয়৷ তবে এসবে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আফ্রিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশ৷

বাল্যবিয়ে গ্লোবাল ইস্যু৷ প্ল্যান, ইউনেস্কোর মতো অর্গানাইজেশন এই বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য অনেকদিন ধরে কাজ করে আসছে৷ উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের পাশাপাশি জনসচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগে তারা এই ‘শৈশববিরোধী' কাজ বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে৷

সে কাজে সরকারেরও পাশে থাকা উচিত ছিল৷ সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের সরকার বলে দিল ‘বিশেষ বিধানে' বাল্যবিয়ে দেওয়া যাবে৷ বাপ-মা চাইলে বিয়ে দেওয়া যাবে৷ ধর্ষণ হলে বাচ্চা পেটে এলে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যাবে৷

কিন্তু কেন বাল্যবিয়ে এখনও লিগ্যাল থাকে ১০০টি দেশে? আইনে বৈধ না থাকার পরও বহু দেশে প্রতিদিন শতাধিক বাল্যবিবাহ ঘটে৷ উত্তরটা হচ্ছে– ধর্ম! কিংবা সোশাল কাস্টম৷ সেগুলো আবার ধর্ম থেকেই অনুপ্রাণিত৷

বিয়ে জিনিসটা যত না সামাজিক, তার চাইতে বেশি ধর্মীয়৷ কারণ, বিয়ের কনসেপ্টই এসেছে ধর্মগুরুকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করা থেকে৷ তাই বাল্যবিয়ের পেছনে ধর্মীয় অবদান সবচেয়ে বেশি৷

আপনি যত প্রকারের ধর্মই খুঁজে দেখুন, বাল্য বিয়ে ছাড়া একটিও ধর্ম নেই৷ ইহুদি আইনে ধার্য করা আছে বালিকার জন্য ১২ বছর এবং বালকের জন্য ১৩ বছর হচ্ছে উপযুক্ত বয়স৷ সীতাকে রাম বিয়ে করে যখন, সীতার বয়স তখন ১০ বছর৷ আয়েশাকে মুহাম্মদ বিয়ে করেন যখন আয়েশার বয়স তখন নয় বছর৷ মানে ধর্মে বাল্যবিবাহে একটা স্বাভাবিক কাস্টম হিসেবে তুলে ধরেছে৷


ধর্ম তো আর পরিবর্তন করা যাবে না, তাই বিজ্ঞান পরবর্তীতে যতই চিল্লাচিল্লি করুক, বাল্যবিয়ে খারাপ, ধর্ম তো আর তার জায়গা নড়াতে পারে না! নড়তে পারেনা ধর্মগুরুরাও৷ তাই বাল্য বিয়ে এখনও ধর্মীয় মতে অবৈধ নয়৷

ধর্ম এবং সমাজের আরেকটা দিক বাল্যবিয়েকে উৎসাহ দেয়৷ সেটা হচ্ছে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে ট্যাবু৷ একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তার যন্ত্রনা হচ্ছে– এটার চাইতে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মেয়ের যোনি অপবিত্র হচ্ছে৷ স্বামী ছাড়া অন্য কেউ যোনিতে স্পর্শ করলে যোনি অপবিত্র হয়ে যায়৷ তাই যাও, ধর্ষককে স্বামী বানিয়ে দাও৷

১৯২৯ সালের ভারতের সারদা অ্যাক্ট থেকে শুরু করে ২০০৬ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এক্টে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, বাল্য বিবাহ যদি বাবা-মা আত্মীয়স্বজন বা কোনো অর্গানাইজেশনও দেয়, তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে৷ অথচ বাংলাদেশ সরকার বাপ-মায়ের অনুমতিকে সাপোর্ট দিয়েছে৷

অনেক ধর্মান্ধ বাবা-মা যে মেয়ে বাচ্চা থাকতেই বিয়ে দেয়, মেয়ের শরীর নিরাপদে রাখার জন্য সেটা কি সরকারের অজানা ছিল? তাহলে এই অনুমতির প্রহসনের মানে কী?

এই আইনের পরপরই এক বাল্যবিয়ে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার৷ সেটা বলেই শেষ করছি৷ প্রাচী নামের এক ১৩ বছরের মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয় তার ৩৫ বছরের কাজিনের৷ বড়লোক কাজিন৷ জমিটমির জের ধরে প্রাচীকে বিয়ে করার জন্য উথাল-পাতাল হয়৷ প্রাচী ক্লাস সেভেনে উঠেছে, সদ্য মাসিক হয়েছে৷ ঘটনাটি রাজধানী ঢাকার, কোনো গাঁওগেরামের নয়৷

প্রাচীর বিয়েটা আমরা (আমরা মানে জোনাকি আপু, আমি, সুপ্রীতিদি এবং আরও অনেকে) আটকাতে চেয়েছি৷ কিন্তু আমরা যখন জেনেছি তার দুই সপ্তাহ আগেই প্রাচীকে আকদ করানো হয়ে গেছে, তখন লড়াই করার প্লাটফর্ম হারিয়ে ফেললাম অনেকটাই৷ তারপরেও প্রশাসন, পুলিশ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করে বউকে তুলে দেওয়াটা বন্ধ করতে চাইলাম৷ কিন্তু সবার প্রশ্ন– বিয়ে তো হয়েই গেছে আর প্রাচীর বাপ-মা তো রাজি ছিল?

যদিও পরে আমাদেরকে দুই পরিবার আইনি কাগজে অঙ্গিকারনামা দেয় যে, তারা খালি আংটি বদল করেছে৷ বিয়ে নাকি হবে মেয়ের বয়স ১৮ হওয়ার পর, কিন্তু সুত্র জানিয়েছে, বর লিখন মৃধা মেহেদী হাতে বিয়ে করে ফেলেছে৷ কলেমার বিয়ে৷ এ বিয়েতে এক সঙ্গে থাকা বৈধ হয়ে যায়৷ আমরা আইনিভাবে বিয়ে আটকালেও, ধর্মীয় বিয়ে আটকানোর সাধ্য কার!
প্রাচী কি বিয়ের আগে গর্ভবতী হয়েছিল? আদালত থেকে ‘বিশেষ বিধান‘-এর অনুমতি নিয়েছিল? কিচ্ছু না৷ শুধু বাপ-মা চেয়েছে বলেই প্রাচীর বিয়েটা হয়েছে৷ এলাকা, স্কুল, বন্ধু কেউ জোট বেঁধে এগিয়ে আসেনি৷

Marzia Prova Bangladesch ( Samir Kumar Dey)

মারজিয়া প্রভা, অ্যাক্টিভিস্ট

ব্যাপার হচ্ছে, বাল্যবিয়ে যখন ১৮ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তখনো ১৩ বছরের মেয়ের বিয়ে হতোই! সেটা সরকার না দমন করে, আরও শক্তপোক্ত করে দিল এই বিশেষ বিধান দিয়ে৷ তাই বাল্যবিয়ে এখন গরম গরম একটা ব্যাপার৷
নো প্রেম, নো প্রপোজ! কোনো মেয়েকে কোনো ছেলের পছন্দ হলেই ছেলে রেপ করবে৷ তারপর বাচ্চা আসবে৷ বাচ্চা এলে তো কথাই নেই! বিশেষ বিধানে ধর্ষক পেয়ে যাবে স্বামীর মর্যাদা৷

কি জানি উইম্যান এম্পাওয়ারমেন্ট নিয়ে  গত কয়েক দশক চিৎকার করে গেছে কত নারী সংস্থা! দেশের সর্বোচ্চ আসনে এখন নারীরা৷ প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার৷ কিন্তু তারা কেউ বুঝলন না একবারও, আইন করে ১৫ বছরের মা দেশ, সমাজ এবং জাতির জন্য বোঝা হয়ে যায়৷ আর নারী স্বাবলম্বী না হলে দেশ কখনোই এগোতে পারবে না৷
বাল্যবিবাহ একটা কন্যার শৈশবকে পিষে ফেলে৷ শৈশবেই তাকে পরিচিত হতে হয় দুর্বিষহ যৌনজীবনের সঙ্গে৷ অথচ সে জীবনে থাকার কথা ছিল শুধু ঘাসফড়িঙদের৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়