1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

চীন

স্বপ্ন ও সংঘাত উসকে দিচ্ছে চীনের সিল্ক রোড

বাণিজ্যের প্রাচীন পথ সিল্ক রোডকে ফিরিয়ে আনতে চীন সরকার যে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে, সেটি দেশে দেশে একদিকে যেমন স্বপ্নের বীজ বুনছে, তেমনি সংঘাতেও উসকানি দিচ্ছে৷

সম্প্রতি এ সংক্রান্ত এক শীর্ষ সম্মলনে অংশ নিয়ে রাশিয়া, ব্রিটেন, তুরস্ক আর পাকিস্তানের মতো দেশগুলো চীনের এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন৷ এই উদ্যোগে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও৷

উদ্যোগটির অংশ হিসাবে চীন-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর (সিপিইসি) নামে যে প্রকল্প নেয়া হয়েছে, বিরোধপূর্ণ কাশ্মীরের ভূমি ছূঁয়ে যাওয়ায় এর বিরোধিতা করছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ ভারত৷

বেলুচিস্তানসহ পাকিস্তানের ভেতরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও এর বিরোধিতা এসেছে৷ তবে পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি এটা নিয়ে ব্যাপক আশাবাদী হয়ে উঠছেন৷

পাকিস্তানে সিল্করোড নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় যে সমস্যা হচ্ছে, সেটা আরও অনেক অঞ্চলেই হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন৷

২০১৩ সালে চীন এই উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামার পর এশিয়ার প্রভাবশালী শিল্পোন্নত দেশ জাপানকেও সক্রিয় হতে দেখা গেছে৷ ২০১৫ সালে দেশটি এশিয়াজুড়ে অবকাঠামো খাতে ১১০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নেয়৷

এই প্রকল্প নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন পর্যন্ত কোনো একক অবস্থান গ্রহণ করেনি৷ বরং প্রকল্পে অংশগ্রহণ করতে জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রী ব্রিগিটে সিপ্রিস বেশ কিছু পূর্ব শর্ত দিয়েছেন৷ তিনি স্বচ্ছতা, টেন্ডারে সততা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মান রক্ষার অঙ্গীকার চেয়েছেন৷

জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রী এমন উদ্যোগ নিয়ে এমন সব শর্ত দিয়েছেন, যে উদ্যোগ সম্পর্কে সাধারণ তথ্য জানাও বেশ কষ্টকর৷ অন্যদিকে এই প্রকল্পকে ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিতে না দেখে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দেখতে চীন আহ্বান জানালেও এটা নিয়ে সন্দেহ সংশয় রয়েছে দেশটির আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সব প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যেই৷

চীনের ‘নতুন সিল্ক রোড' –ধারণা ও বাস্তবতা

প্রাচীন সিল্ক রোড ফিরিয়ে আনতে চীনের প্রেসিডেন্টের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা দেখাতে এই সপ্তাহেই দেশটি একটি শীর্ষ সম্মেলন করে৷ এখানে ব্রিটেন রাশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্কের মতো দেশ চীনের এই স্বপ্নের প্রতি সমর্থন জানান৷

এই শীর্ষ সম্মেলনে চীন বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ১২৪ বিলিয়ন ডলার প্রদানের অঙ্গীকার করেন৷ চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও প্রায় ৯০০টি প্রকল্পে ৮৯০ বিলিয়ন ডলারের জোগান দেবে বলে বলা হয়৷

এই টাকায় দেশটি এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকাজুড়ে রেলপথ, নৌপথ ও সড়কপথ করতে চাইছে৷

২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘নতুন সিল্ক রোড' হিসাবে পরিচিত ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড (ওবিওআর)' নামের এই উদ্যোগ শুরু করেন৷

প্রাচীন সিল্করোড ধরে তিন মহাদেশের বিভিন্ন দেশে সড়কপথ, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, পাইপলাইনের মতো অবকাঠামো তৈরি করে যোগাযোগের নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় দেশটি৷ এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে অন্যদেশগুলোর বাণিজ্য বেড়ে যাবে৷

শীর্ষ সম্মেলনের আগেই দেশটি জানিয়েছিল, এরই মধ্যে ৬৫টি দেশ এই উদ্যোগে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছে৷ তারপরও প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্তের অভাবে এর অগ্রগতি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু এখনো বলা যাচ্ছে না৷

যা জানা গেছে

এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে যেসব প্রকল্প করা হচ্ছে, তা থেকেই পুরো উদ্যোগ সম্পর্কে কিছু কিছু জানা যাচ্ছে৷

চীনের নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই উদ্যোগকে নীতি-নির্ধারণী জায়গায় রাখা আছে, যার জন্য বিপুল অর্থের জোগান দেয়া হচ্ছে৷ এই উদ্যোগে এরই মধ্যে চীনের সরকারি তহবিল থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের জোগান দেয়া হয়েছে৷

২০১৩ সালে ১০০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে চীনের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করা এশিয়ান ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকও (এআইআইবি) এখানে অর্থ জোগানের অন্যতম উৎস৷

ফ্রান্সভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক আইএফআরআই-র চীন বিষয়ক বিশ্লেষক অ্যালিস একম্যান বলেন, উদ্যোগটি খুবই ‘ফ্লেক্সিবল'৷ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রয়োজন ও ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রকল্পে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়৷ নতুন করেও যে কেউ এতে অংশ নিতে পারবেন৷

যোগাযোগে চীনের দূরদর্শিতা

এই উদ্যোগে একটি  সার্বজনীন যোগাযোগ কৌশল নিয়েছে চীন৷ এটা এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা থেকে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষ উপকৃত হতে পারে৷

এটাকে ভূ-কৌশলগত পরিকল্পনা হিসাবে না দেখে কেবল অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসাবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে চীন৷

আধুনিক সিল্করোড, প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র তীব্রভাবে চীনের এই উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে৷ বৃহৎ শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে কেবল এই দু'টি দেশই এআইআইবি-তে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে৷ জাপান ও চীনের মধ্যে ঐতিহাসিক শত্রুতা রয়েছে৷ পূর্ব চীন সাগরে সীমানা নিয়েও বিরোধও রয়েছে৷

চীনের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির কারণে টোকিও বেশ উদ্বেগে আছে৷ জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ওবিওআর শীর্ষ সম্মেলন অংশগ্রহণ প্রশ্নাতীতই ছিল৷ তিনি বরং কূটনীতির অন্য অংশে কাজ করছেন৷ ২০১৫ সালে জাপান এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো প্রকল্পে ১১০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার অঙ্গীকার করেছে৷

চীনের এই উদ্যোগ কিভাবে আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে প্রভাব বিস্তার করবে তা দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালেই বোঝা যায়৷

চীন-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের অংশ হিসাবে চীন ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে৷ তা দিয়ে দেশটিতে রাস্তা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং গেভাডার শহরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা হবে৷

এই উদ্যোগ পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ভারত সিপিইসি প্রকল্পের আংশিক বিরোধিতা করছে, কারণ, এই করিডোর বিরোধপূর্ণ কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেছে৷

ওবিওআর শীর্ষ সম্মলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ অংশ নিয়েছেন৷ তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অংশ নেননি৷ এই উদ্যোগেও ভারতের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া

এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে মধ্য এশিয়া৷ বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুদ থাকায় এই এলাকা নিয়ে চীনেরও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে৷ গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলের সবক'টি দেশ সমানতালে চীনের ঋণ ও বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে আসছে৷

এই উন্নয়ন কাজে অঞ্চলজুড়ে প্রভাব কমার আশঙ্কায় কিছুটা উদ্বেগে রয়েছে রাশিয়া৷ এই কারণে রাশিয়াও ইউরেশিয়ান ইকোনোমিক ইউনিয়ন নামে একটি নিজস্ব উদ্যোগ নিয়েছে৷ তবে অর্থনৈতিক সামর্থের কারণেই মস্কো কার্যকরভাবে বেইজিংয়ের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না৷

তবে ইউক্রেন-দ্বন্দ্ব, পরবর্তী পশ্চিমাদের আরোপ করা অবরোধ, ভূ-রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থে দেশটি ক্রমে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হচ্ছে৷

শীর্ষ সম্মেলনে পুটিন অংশগ্রহণ করছেন৷ এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে৷ রাশিয়া চায় চীন থেকে ওই রেলপথ যেন তাদের ভূমির উপর দিয়ে যায়৷

লক্ষ্য ইউরোপ

ইউরোপের এশিয়ার সাথে যোগাযোগ বিস্তৃত করার ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে৷ এটা ইউরোপীয় অর্থনীতিকে উপকৃত করবে৷ বিশেষ করে, জার্মানির মতো রপ্তানিমুখী অর্থনীতিকে৷

২০১৬ সালের জুলাই মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ওবিওআরকে ইউরোপীয় উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে৷ এ উদ্দেশ্যে ‘ইইউ-চায়না কানেক্টিভিটি প্ল্যাটফর্ম' প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে৷ চীনের এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে গ্রিসের পিরাওয়ি বন্দরের মতো ইউরোপে যে বিনিয়োগ এসেছে, সেটা এ পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিকভাবে হয়েছে৷

কিন্তু ওই প্রতিবদনে সকল ইইউ সদস্যকে একটি অভিন্ন অবস্থান নিতে আহ্বান জানানো হয়, যাতে চীন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল' কৌশলে অসুবিধায় ফেলতে না পারে৷

রোডিয়ন এবেগহাউসেন/এসএন

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন