1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

স্বপ্নের শিখরে আরোহণ মধ্যবিত্তের

বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের তালিকায় এবার বেশ কয়েকটি বাঙালি নাম৷ এবং তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা৷

শিখর ছোঁয়ার স্বপ্ন থাকে অনেকেরই, কিন্তু সেই শিখর আরোহণের জন্য যে আর্থিক সঙ্গতি প্রয়োজন, তা সবসময় সবার থাকে না৷ ফলে পাহাড়ে চড়ার কসরৎ, অর্থাৎ মাউন্টেনিয়ারিং বা পর্বতারোহণ কোনওদিনই ফুটবল-ক্রিকেট-হকির মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি৷ বস্তুত গল্ফ-এর মতো বিত্তবানদের আয়ত্বসাধ্য একটি খেলার থেকেও বেশি খরচসাপেক্ষ হল মাউন্টেনিয়ারিং, যেহেতু এটি গলফের মতো ব্যক্তিগত খেলা নয় বরং একটি দলগত ইভেন্ট৷ পর্বতারোহণ অভিযানের একটি সাফল্যের পিছনে একজন নয়, একাধিক পর্বতারোহীর প্রচেষ্টা থাকে৷ ফলে তার খরচও সমানুপাতিক হারে বেড়ে যায়৷ কারণ, চরম ঝুঁকির এই স্পোর্টসে চূড়ান্ত মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি আধুনিক কারিগরি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম থাকাটা সমান গুরুত্বপূর্ণ৷ খরচ বাঁচানোর তাগিদে এইসব সরঞ্জামের গুণমানের সঙ্গে কোনও আপোশ করা যায় না৷

Tusi Das sells eggs at the local market to feed her family and her passion — the mountains. She put on her trekking shoes when she was barely 12 (1998) and relentlessly carried on to subdue Droupadi ka Danda (5,760m), Mount Kalindi, Mount Menthosa (6,443m), Nandokhat (6,611m) and Kangaytst (6,410m). *** Bild Deutsche Welle, Kalcutta-Korrespondent Sirsho Bandopadhyay, Mai 2013

টুসির সংসার চলে কলকাতার দমদম পার্ক এলাকার বাজারে ডিম বিক্রি করে

পশ্চিমবঙ্গের পবর্তারোহীরা বলছেন, শুধু এই কয়েকটা কারণেই পশ্চিমবঙ্গের টুসি দাস বা ছন্দা গায়েন-এর এবারের এভারেস্ট বিজয় এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে৷ এরা দুজনেই নেহাতই মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, যাদের পক্ষে এভারেস্ট অভিযানের স্বপ্ন দেখাটাই অসম্ভব, অবাস্তব বলে ধরে নেওয়া হতো স্রেফ একটাই কারণে৷ আর্থিক সমস্যা৷ এভারেস্টের শিখর ছোঁয়া দূরের কথা, ওই আর্থিক অনটনের পাহাড় ডিঙানোটাই একটা দুরূহ সঙ্কল্প এঁদের মতো সামর্থ্যহীন পর্বতারোহীদের কাছে৷ টুসি দাস-কে যেমন এভারেস্ট অভিযানের খরচ তুলতে সরকারি অর্থসাহায্য ছাড়াও বাজার থেকে ধার করে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা জোগাড় করতে হয়েছে৷ ধার করতে হয়েছে কারণ, টুসিদের সংসার চলে কলকাতার দমদম পার্ক এলাকার বাজারে ডিম বিক্রি করে৷ ডিমের দোকানটা টুসির বাবা-র৷ টুসির যখন মাত্র ১১ বছর বয়স, তখন ওর বাবা হঠাৎ মারা যান৷

পরের ১৮ বছর বেশ কষ্ট করেই থাকতে হয়েছে দমদম পার্কের দাস পরিবারকে৷ এর মধ্যে টুসির দুই দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে, টুসির পরের যে ভাই, সেও বড় হয়েছে৷ কিন্তু এখনও সংসার চালানোর জন্য হয় টুসি বা ওর মাকেই দোকানে গিয়ে বসতে হয়৷ গুণে গেঁথে ডিম বিক্রি করে পয়সা হিসেব করে নিতে হয়৷ মধ্যবিত্ত ঘরের একজন মেয়ের পক্ষে বাজারে বসে এভাবে দোকানদারি করাটা নেহাত সোজা কাজ নয়৷ কিন্তু সেটাই করে দেখিয়েছেন টুসি এবং পাশাপাশি নিজের পর্বতারোহণের উৎসাহটাকেও সতেজ রেখেছেন৷ এর আগে একাধিক অভিযানে অংশ নিয়ে বেশ কিছু ছোট-বড় শৃঙ্গ জয় করেছেন টুসি দাস৷ বাকি ছিল মাউন্ট এভারেস্ট, সেই স্বপ্নটাও সত্যি হয়ে গেল গত সোমবার সকালে৷

টুসির মতোই আর্থিক প্রতিবন্ধকতার পাহাড় জয় করলেন এবারের এভারেস্টজয়ী আরও এক বাঙালি মহিলা পর্বতারোহী ছন্দা গায়েন৷ তাঁরও ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল এভারেস্টের শিখরে পৌঁছানোর৷ কিন্তু ছন্দার সংসারে আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি সম্পর্কের বোঝাপড়ারও অভাব ছিল, যেটা আজকের দিনে অনেক পরিবারেরই নিত্যকার সমস্যা৷ ছন্দা বিয়ে করার সময় হবু স্বামীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছিলেন যে তাঁকে পাহাড়ে চড়তে যেতে দিতে হবে৷ বিয়েটা শেষপর্যন্ত টেকেনি ছন্দার৷ এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি যখন নিচ্ছেন. তখন তাঁর হাতে বিবাহ-বিচ্ছেদের কাগজপত্র এসে পৌঁছয়৷ কিন্তু ততদিনে তো বিয়ের গয়নাই বাঁধা দিয়েছেন ছন্দা, অভিযানের খরচ তুলবেন বলে৷ কাজেই বিচ্ছেদের বেদনা বা গয়নার শোকে কাতর না হয়ে রওনা হয়ে যান ছন্দা গায়েন এবং পৌঁছেও যান স্বপ্নের শিখরে৷

Tusi Das sells eggs at the local market to feed her family and her passion — the mountains. She put on her trekking shoes when she was barely 12 (1998) and relentlessly carried on to subdue Droupadi ka Danda (5,760m), Mount Kalindi, Mount Menthosa (6,443m), Nandokhat (6,611m) and Kangaytst (6,410m). *** Bild Deutsche Welle, Kalcutta-Korrespondent Sirsho Bandopadhyay, Mai 2013

পাহাড়ে চড়ার কসরৎ, অর্থাৎ মাউন্টেনিয়ারিং বা পর্বতারোহণ কোনওদিনই ফুটবল-ক্রিকেট-হকির মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি

পশ্চিমবঙ্গ থেকে এবার আরও যেসব পর্বতারোহী এভারেস্ট অভিযানে গিয়েছিলেন এবং সফল হয়ে ফিরছেন, তাঁদেরও অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা এবং সকলেই শখের পর্বতারোহী৷ প্রত্যেকেই কোনও না কোনও অপেশাদার পর্বতারোহণ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত৷ এঁদের মধ্যে যাঁকে সবথেকে স্বচ্ছল বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, তিনি পেশায় পুলিশকর্মী, উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর থানার অফিসার ইন চার্জ উজ্জ্বল রায়৷ তাঁর যিনি সঙ্গী ছিলেন, সেই দেবদাস নন্দী একটি আবাসনের তদারকির দায়িত্বে আছেন৷

লক্ষ্য করার মতো এটাই যে, নানা ধরণের পেশা বা জীবিকায় নিযুক্ত এই পর্বতারোহীরা প্রত্যেকেই কিন্তু গোপন স্বপ্নের মতোই লালন করে গিয়েছেন একটাই ইচ্ছে৷ জীবনের সব প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে, সমস্ত সঙ্কটকে অতিক্রম করে একদিন কাঙ্খিত উচ্চতায় পৌঁছানোর৷ ওঁদের স্বপ্নের একটাই নাম ছিল৷ মাউন্ট এভারেস্ট৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন