1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

সেই মেয়ে এখন বাংলাদেশের গর্ব

নারায়ণগঞ্জের দলিত হরিজন সমাজ থেকে তিনিই প্রথম এসএসসি পাস করেছিলেন৷ সেখানেই থেমে থাকেননি সনু রানী দাস৷ কুসংস্কার ও অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চালিয়ে গেছেন সমাজ পরিবর্তনের লড়াই৷  

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ৭১ টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে নিজের জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরেছিলেন সনু রানী দাস৷ প্রায় তিন বছর আগের সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও গত মাসে আবার শেয়ার করেছিলেন একজন৷ এক মাসেই ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার বার৷

সনুর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সুইপার কলোনিতে৷ যেখানে দেড়শ পরিবারের বাস৷ সনুর বাবা-মা'ও সুইপারের কাজ করেন৷ সনু তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন মেথরপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ সেখানে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর ক্লাস সিক্সে কলোনির বাইরে অন্য স্কুলে ভর্তি হতে হয়৷ কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজের সম্প্রদায় নিয়ে সংকোচ বোধ করতেন তিনি৷ তাই কলোনির পেছনের গেট দিয়ে বের হতেন, যাতে তার স্কুলের বন্ধুরা তাকে দেখতে না পায়৷ সমাজ দলিতদের এখনো যে নজরে দেখে সে কথা ভেবে তার ভয় হতো, সুইপার কলোনি থেকে বের হতে দেখে কেউ না আবার ‘মেথর, মেথরের বাচ্চা' বলে চেঁচিয়ে ওঠে!

‘মেথর'-এর সন্তান বলে অনেক স্কুলেই ভর্তি হতে পারেননি, তাকে ভর্তি করতে রাজিই হয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ৷ কলোনি থেকে তিনি এবং তার দুই বান্ধবী প্রথম এসএসসি পাস করেন৷ সনুর মা মনে করতেন, ওইটুকু লেখাপড়াই যথেষ্ট, আর দরকার নেই, কেননা তাঁর সব আত্মীয়ই ‘অশিক্ষিত'৷ তাই আত্মীয়রাও নানা নেতিবাচক কথা বলতে শুরু করে৷ আত্মীয়রা বলতেন, ‘‘এসএসসি পাস করেছে আর পড়িয়ে কী হবে? বিয়ে করালে তো ঘরের কাজই করতে হবে৷ মেয়েদের তো রান্না আর ঘরের কাজ ছাড়া কিছু করার নেই৷'' স্কুল শিক্ষকরা বাবা-মাকে বোঝাতে এলেন৷ মাকে মানানো যাচ্ছিল না৷ কিন্তু বাবা স্বপ্ন দেখতেন মেয়ে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে৷ সে কারণেই এসএসসির পরও লেখাপড়াটা করতে পেরেছেন৷

কিন্তু লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াটা একেবারেই সহজ ছিলনা৷ ক্লাসের সবাই যখন জানতে পেরেছিল সনু মেথরের সন্তান, সবার প্রতিক্রিয়াটা কেমন ছিল, তারপর থেকে কেমন বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন তা-ও তুলে ধরেছেন সনু৷ জানিয়েছেন, ক্লাসে তাদের তিন বান্ধবীকে ‘অচ্ছুৎ' ভাবা হতো, সবাই ভাবত তাদের সব কিছু নোংরা৷ তিনজনের স্পর্শ এড়িয়ে চলতো সবাই৷

সেই সনু একসময় বিদেশে গেলেন৷ প্রথমে গেলেন স্কটল্যান্ডে, গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিতে৷ বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ঐ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সনু সেখানে ছিলেন তিন মাস৷ তিন মাসে অনেক কিছু শিখেছেন৷ ইংরেজিতে কথা বলতেও শিখেছেন তখন৷ সনু তারপর জেনিভায় যান হিউম্যান রাইটসের এক সম্মেলনে অংশ নিতে৷ সেখানে ৭ মিনিটের এক ভাষণে তুলে ধরেন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দলিত নারীদের অবস্থান৷  সেখানে বলেছিলেন, ‘‘দলিত নারীরা পরনির্ভরশীল৷ যে কোনো জায়গায় যেতে হলে তাদের পুরুষের সঙ্গে যেতে হয়৷ তাই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কীভাবে তারা অবদান রাখবে?'' এরপর জাতিসংঘের একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্রাজিলেও যান সনু৷ তারপর থেকে নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি৷

সনু বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে শিশুদের পড়ালেখা ও নারীদের স্বাস্থ্য ও উপার্জনের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করছেন৷ স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই তাঁর কাজ৷ বাংলাদেশের ‘মেথর' জনগোষ্ঠীর অনেকেই অবাঙালি৷ তারা হিন্দি ভাষায় কথা বলেন৷ তাই ভাষাও তাদের জন্য একটা প্রতিবন্ধকতা৷ এ কারণে শিশুরা ভাষাটা বুঝতে না পারায় পড়ালেখায় আনন্দ পায় না৷ শিক্ষার আগ্রহটাও তাদের কম ছিল৷ তাই কলোনির শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন সনু৷ পাঠ্যপুস্তকের প্রত্যেকটা লাইনের মানে তাদের ভাষায় ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন তিনি৷ নারীরাও এখন বাসায় বসেই সেলাইসহ নানা কাজ করছেন৷

এখন নারায়ণগঞ্জের সুইপার কলোনির সবাই সনুর জন্য গর্ববোধ করে৷ তার দেখাদেখি এখন অনেক শিশুই লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছে৷ সনুও এখন আর কেউ তাকে ‘মেথর' বলতে পারে ভেবে সংকোচ বোধ করেন না৷ এখন গর্বের সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের বলেন, ‘‘আমি মেথর পরিবারের সন্তান৷'' সুইপাররা যদি কাজ না করে, দেশ পরিষ্কার রাখার কাজটি কে করবে? কোন কাজই যে ছোট নয় সেটাও বন্ধুদের বুঝিয়েছেন তিনি৷

সনু এখন এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন যেখানে এমন বৈষম্য দূর হয়ে যাবে৷ স্বপ্ন দেখেন এমন দিনের যখন সবাই সব কাজকে, সব পেশাকে সম্মান করবে, সেইসঙ্গে সম্মান করে দলিত সম্প্রদায়কেও৷

এপিবি/এসিবি

 

নির্বাচিত প্রতিবেদন