1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

সিনেমা থেকে বাস্তব, কতটা এগোলো স্বচ্ছ ভারত অভিযান?

প্রেমিকের বাড়িতে এসে থ হয়ে গিয়েছিল জয়া৷ এত ভালবাসে যে মানুষটা, সে শৌচাগারের ব্যবস্থা করেনি৷ প্রকৃতির ডাকে যেতে হবে মাঠে-ঘাটে৷ তাই শ্বশুরবাড়িতে এসেই স্বামীকে ছেড়ে চম্পট দেয় জয়া৷ মোদীর ভারতের এটাই কি বাস্তব চিত্র?

গত ১১ আগস্ট মুক্তি পাওয়া অক্ষয় কুমারের নতুন ছবি ‘টয়লেট এক প্রেম কথা'য় এই গল্পই দেখানো হয়েছে৷বার্তাটা খুব সহজ– প্রেম যতই নিবিড় হোক না কেন, তা ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে যদি বাড়িতে শৌচাগার না থাকে!

কেন্দ্রীয় সরকারের স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই ছবিটি৷ সেখানে জয়া যে সমস্যার কথা তুলে ধরেছে, বাস্তবে তা পরখ করতে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জে্ সফর করেছে ডয়চে ভেলে৷ মূলত কলকাতা থেকে দূরবর্তী গ্রাম বা মফস্বলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এনডিএ সরকারের প্রকল্প, সেটাই খতিয়ে দেখার চেষ্টা সরেজমিনে৷ 

ডয়েচে ভেলের প্রথম গন্তব্য নদিয়া জেলার হরধামের পারনিয়ামতপুর গ্রাম৷ শিয়ালদহ রানাঘাট শাখায় পায়রাডাঙ্গা স্টেশন থেকে এই গ্রামের দূরত্ব ৬-৭ কিলোমিটার৷ এই গ্রামে প্রাথমিক স্কুলটি ছয় দশকেরও বেশি পুরোনো৷ স্কুলের মাঠের একধারে তৈরি হয়েছে দু'টি শৌচাগার৷ এগুলি বেশ পরিচ্ছন্ন৷ পড়ুয়ারা নিয়মিত সেটা ব্যবহার করে৷ পাড়ার রাস্তাতেই দেখা হলো পারনিয়ামতপুরের বাসিন্দা ক্ষুদিরাম ঘোষের সঙ্গে৷ এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দার মতো তিনিও কৃষিজীবী৷ তাঁর সন্তানও এই প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়া৷ ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সূচনা করেছিলেন, তার সুফল মিলেছে বলে জানালেন ক্ষুদিরাম৷

অডিও শুনুন 00:39

‘ছাত্র-ছাত্রীরা এখন অনেকটাই সচেতন’

শুধু কেন্দ্রীয় প্রকল্প নয়, রাজ্য সরকারের উদ্যোগেও নির্মল বাংলা প্রকল্পেও সাফসুতরো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল৷ ক্ষুদিরাম বলেন, ‘‘আগে যেখানে-সেখানে লোকজন রাস্তাঘাট নোংরা করে রাখত৷ মাঠ-ময়দানে যাওয়া যেতো না৷ এখন সে সব দেখতেই পাবেন না৷''

চার দশক আগে ক্ষুদিরাম যখন এই স্কুলে পড়তেন, তখন কোনও শৌচাগার ছিল না৷ পারনিয়ামতপুরের স্কুলে ১৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করা মিঠু মণ্ডল এই পরিবর্তনটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন৷ শুধু সরকারি প্রকল্পের ঢক্কানিনাদ নয়, এই অভিযান একটা সামাজিক আন্দোলনেরও জন্ম দিয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘ছাত্র-ছাত্রীরা এখন অনেকটাই সচেতন৷ এখন আর ওদের শৌচাগার ব্যবহারের কথা বলে দিতে হয় না৷ এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনও সক্রিয়৷''

শিক্ষিকা মিঠু মণ্ডল আরো বলেন, ‘‘পঞ্চায়েত আমাদের কাছ থেকে পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়মিত নেয়৷ কোথাও কোনও ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করার চেষ্টা করে৷ কোনও পড়ুয়ার বাড়িতে শৌচাগার না থাকলে আমরা পঞ্চায়েতকে জানিয়ে তা নির্মাণের ব্যবস্থা করে দিই৷''

পারনিয়ামতপুরের মতো গ্রামে অভিযানের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর নজরদারি চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ মিঠু বলেন, ‘‘কেন্দ্রের একটি্ দল স্কুল পরিদর্শনে এসেছিল৷ তারা মূলত পরিচ্ছ্ন্নতার দিকটি খুঁটিয়ে দেখেছে৷ এ নিয়ে কোনও সমস্যা আছে কিনা জানতে চেয়েছে৷'' 

তিন বছর আগে শুরু হওয়া স্বচ্ছ ভারত অভিযান মোদী সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ' প্রকল্প৷ ৪০৪১টি গ্রাম-শহরকে ২০১৯-এর ২ অক্টোবরের মধ্যে পরিচ্ছন্ন করে তোলাই এই অভিযানের লক্ষ্য৷ মূলত খোলা জায়গায় মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাস বদলে ফেলার উদ্দেশ্যে সচেতনতার প্রসার ও পরিকাঠামো নির্মাণ চলছে৷ এই অভিযানে যুক্ত রয়েছেন ৩০ লক্ষ সরকারি আধিকারিক৷ ২০১৬-র হিসেব অনুযায়ী, গ্রামে ১ কোটি ৬০ লক্ষ শৌচালয় তৈরি হয়েছে৷ ২০১৯-এর মধ্যে গ্রাম-শহর মিলিয়ে ১২ কোটি শৌচালয় তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে৷

অডিও শুনুন 08:16

‘কেন্দ্রের একটি্ দল স্কুল পরিদর্শনে এসেছিল’

পারনিয়ামতপুরের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে এই অভিযানের সাফল্য লক্ষ্য করা গেলেও সব জায়গায় ছবিটা একরকম নয়৷ যেমন পশ্চিম মেদিনীপুরের মহকুমা শহর ঘাটালের বসন্তকুমারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়৷ এই স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী অয়ন্তিকা মিশ্র জানিয়েছে, তাদের স্কুলের শৌচাগার ততটা সাফসুতরো নয়৷ অনেক সময়ই পরিচ্ছন্নতার অভাবে দুর্গন্ধ ছড়ায়৷ অয়ন্তিকা অবশ্য এ জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি দায়ী করতে চায়নি৷ তার ভাষায়, ‘‘আমার সহপাঠীদের মধ্যেই সচেতনতার অভাব৷ অনেকেই টয়লেটে গিয়ে জল দেয় না৷ পিরিয়ড চলাকালীন টয়লেট ব্যবহারের পর ঠিকভাবে পরিষ্কার করে না৷ অনেকে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলেও সবাই নয়৷''

অথচ বসন্তকুমারীর প্রধান শিক্ষিকা বীণা মান্না জানান, প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট মাসে সাতদিন ধরে রাজ্য সরকারের নির্দেশে স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতা সপ্তাহ পালিত হয়৷ সেখানে ছাত্রীদের পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হয়৷ কিন্তু তাতেও শৌচাগার সবসময় পরিষ্কার রাখা সম্ভব হচ্ছে না৷ প্রধান শিক্ষিকা জানালেন, ‘‘শুধু গ্রাম থেকে আসা মেয়েরা নয়, শহরের সম্ভ্রান্ত-শিক্ষিত পরিবারের মেয়েদের মধ্যেও বদভ্যাস দেখতে পাই৷ স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া ও তা ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার ব্যবস্থাও আছে৷ পর্যাপ্ত জল থেকে ঝাড়ুদার সবেরই জোগান আছে৷ কিন্তু, সব ছাত্রী সেটা মেনে চলে না৷ বাড়িতে সেই সচেতনতা গড়ে না তুলতে না পারলে এর থেকে মুক্তি নেই৷''

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, কলকাতার প্রথম সারির একটি হাসপাতালের চিকিৎসক সৈয়দ মোনাজাতুর রহমান ছাত্রীদের মধ্যে এই সচেতনতা গড়ে তোলার উপর জোর দেন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে বড় কারণ সংক্রমণ৷ মহিলারা পরিচ্ছন্ন না থাকলে এই সংক্রমণের হার বেড়ে যায়৷ বন্ধ্যাত্ব না হোক, মূত্রনালীর সংক্রমণ আকছার দেখা যায় একই কারণে৷ আমরা সবসময় বলি, সংক্রমণ এড়াতে সাফসুতরো থাকতে হবে এবং কাপড়ের বদলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হবে৷'' ডা. রহমান আরো বলেন, ‘‘আমাদের দেশে স্বচ্ছ ভারতের মতো একটা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দরকার ছিল৷ বিশেষত মহিলাদের জন্য৷ কিন্তু, এই বিষয়টি এতদিন তেমন গুরুত্ব পায়নি৷ অভিযান সফল হবে আশা করি৷'' 

অডিও শুনুন 01:34

‘অনেকে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলেও সবাই নয়'

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মাঠে-ঘাটে শৌচকর্ম করার অভ্যাস একেবারে বদলে গিয়েছে, এ কথা বলা যাবে না৷ তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত৷ শালবনির ধাঁচাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৃণালকান্তি মাহাতো বলেন, ‘‘ছাত্রদের নিয়মিত বিষয়টি বোঝানো হয়৷ কিন্তু সবার বাড়িতে যতদিন না শৌচালয় হচ্ছে, ততদিন শুধু স্কুলে শেখালে এতদিনের অভ্যাসে বদল হবে না৷''

রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের রুক্ষ এলাকায় অন্য সমস্যাও রয়েছে৷ জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে জলের অভাব স্বচ্ছ ভারত গড়ার পথে অন্তরায়৷ এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের শিক্ষক মৃণালকান্তি৷ তিনি বললেন, ‘‘জলের সরবরাহ এখানে ভালো নয়৷ তাই ইচ্ছে থাকলেও, ছাত্রছাত্রীদের শেখালেও আমরা প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো জোগাতে পারিনি৷ অধিকাংশ স্কুলেই শৌচাগার রয়েছে৷ কিন্তু নিয়মিত জলের জোগান না পেলে সবসময় শৌচাগার ব্যবহার করা কি সম্ভব?''

‘টয়লেট এক প্রেম কথা' ছবিতে অবশ্য জয়াকে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে হয়নি৷ কেশব তার স্ত্রী-র জন্য শৌচালয় তৈরি করে দিয়েছিল, সেখানে জলের জোগানও ছিল৷ হয়তো বি্দ্যা বালান ও প্রিয়াঙ্কা ভারতীর গণমাধ্যমে প্রচারও বহু মানুষকে টয়লেট সচেতনতা গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে৷ কিন্তু সেলুলয়েডের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক যতটা, স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে দূরত্ব হয়তো ততটাই৷ এই দূরত্ব আগামী দু বছরের মধ্যে ঘুচিয়ে ফেলাই চ্যালেঞ্জ নরেন্দ্র মোদীর৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়