1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

‌সিঙ্গুরে চাষের জমি ফেরালেন মমতা

সিঙ্গুরে পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের অধিগৃহীত কৃষিজমির একাংশ ২৫ জন কৃষককে ফিরিয়ে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি৷ কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের সাফল্য বৃত্তটি সম্পূর্ণ হলো৷

MAMTA-DW-7 (Prabhakar)

ফাইল ছবি

সুপ্রিম কোর্টের রায় কৃষিজমি রক্ষার পক্ষে যাওয়ার পরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করেছিলেন, টাটা মোটরসের ন্যানো কারখানার কাঠামো ভেঙে, জমি খালি করে এবং সে জমি চাষযোগ্য করে জমির মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন৷ নিজের প্রশাসনের জন্যে একটা সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিলেন মমতা৷ ২০ অক্টোবর৷ যদিও সব জমি ফেরত দেওয়া গেল না, কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখে ২৫ জন কৃষককে তাঁদের প্রায় সাত একর জমি ফিরিয়ে দেওয়া হলো৷ মুখ্যমন্ত্রী কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামলেন এবং নিজের হাতে ছড়িয়ে দিলেন সর্ষের বীজ৷ বললেন, শীতের আগে সর্ষের চাষ দিয়ে শুরু হলো, এরপর মরশুম অনুযায়ী আলু ও ধানচাষ হবে৷ সারা বিশ্বে কৃষিজমি অধিগ্রহণমুক্ত করার মডেল হয়ে উঠবে সিঙ্গুর, বললেন মমতা৷

গাড়ি কারখানার জন্য ৯৯৭ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করেছিল পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার৷ দিন–রাত কাজ করে, গাড়ি কারখানার কংক্রিট আর ইস্পাতের কাঠামো ভেঙে, আবর্জনা সরিয়ে জমি পরিস্কার করে, ট্র্যাক্টর আর পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি খুঁড়ে তার প্রায় ৯৩২ একর, মানে ৯০%‌ জমি চাষযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়েছে৷ বাকি ৬৫ একর জমিও খুব তাড়াতাড়িই চাষের উপযোগী করে ফেলা হবে৷ তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন ৮ নভেম্বর৷ বলেছেন ১০ নভেম্বরের মধ্যে সব জমি ফেরত যাবে মালিকদের হাতে৷ এদিন স্বাভাবিকভাবেই আবেগতাড়িত ছিল সিঙ্গুর৷ কৃষক পরিবারগুলি আনন্দে হেসেছেন, কেঁদেছেন, নেচে–গেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন৷

রাজনীতিক মমতা ব্যানার্জি যে আদতেই কী অসাধ্যসাধন করেছেন, সিঙ্গুরবাসীর ওই বহিঃপ্রকাশেই তা ধরা পড়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী নয়, সেই রাজনীতিক মমতা তাঁদের বলে এলেন, অধিকার কেড়ে নিতে হয়৷ লড়াই ছেড়ে কখনও পালিয়ে যেতে নেই৷ এই দুটো কথা সবসময় মনে রাখবেন৷ শুক্রবার কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি দৈনিক সিঙ্গুরের একটি ছবি ছেপেছে৷ আদিগন্ত চাষের ক্ষেতে মাটি চষতে ব্যস্ত গোটা ছয়েক ট্র্যাক্টর৷ তাদের সামনে এক কৃষক পিতা তাঁর বালিকা কন্যাকে হাত তুলে কিছু একটা দেখাচ্ছেন৷ ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে— এই প্রজন্মের বলার মতো একটা গল্প আর পরের প্রজন্মের জন্য গড়ে তোলার মতো এক ভবিষ্যৎ৷ আদতেই সিঙ্গুর তাই৷ চলতি প্রজন্ম মনে রাখবে তার লড়াইকে, মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বকে৷ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই সাফল্যের ওপর ভরসা করে গড়বে তাদের নতুন জীবন৷

শিল্পায়নের নামে কৃষকের জমি জোর করে যে কেড়ে নেওয়া যায় না, সিঙ্গুর আন্দোলনের এই দাবিকে মান্যতা দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়৷ এই ঐতিহাসিক রায় দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে দেশের যে কোনো প্রান্তে এ ধরনের জমি–বিরোধের মীমাংসার ক্ষেত্রে৷ তার সঙ্গে জুড়ে থাকবে সিঙ্গুরের প্রতিবাদী কৃষক আর তাঁদের জমি রক্ষার আন্দোলনের নাম৷

তবে বিরোধিতাও কি একেবারেই নেই? সিঙ্গুরের বাসিন্দা গোপাল বাগ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের জমিতে সর্ষের বীজ ছড়ালেন৷ কিছুদিনের মধ্যেই লোকে সর্ষেফুল দেখতে পাবেন সিঙ্গুর জুড়ে৷ এর কি কোনো প্রতীকী অর্থও আছে?‌ সম্পন্ন পরিবারের ছেলে গোপাল খুবই উৎসাহিত ছিলেন সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানা নিয়ে৷ ওই কারখানার সুবাদে গোটা এলাকার ভোল যে বদলে যাবে, তার ইঙ্গিতও তিনি পেয়েছিলেন৷ অন্তত গোটা ছয়েক প্রথম সারির ব্যাঙ্ক সিঙ্গুরে তাদের এ টি এম যন্ত্র বসিয়ে দিয়েছিল টাটা কারখানা তৈরির কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই৷

এলাকার রাস্তাঘাটের হাল ফিরে যাচ্ছিল রাতারাতি৷ স্থানীয় ইমারত ব্যবসায়ীদেরও কপাল খুলে গিয়েছিল, টাটা কারখানায় নিয়মিত নির্মাণসামগ্রী জোগান দেওয়ার বরাত পেয়ে৷ তা হলে কি বামফ্রন্ট সরকার যে স্লোগান চালু করেছিল— কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ, সেটাই ঠিক?‌ গোপালের বক্তব্য এক্ষেত্রে আবেগবর্জিত এবং বাস্তববাদী৷ যে, কৃষিজ পণ্যের দেশীয় বাজার ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে৷ বিশেষ করে ছোট চাষীদের জন্যে কৃষিতে ভবিষ্যৎ প্রায় নেই, কারণ, বড় বড় সংস্থা কৃষিতে হাত দিয়েছে বেশ কিছু বছর হলো৷ তারা কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা চুক্তি চাষের মাধ্যমে নিজেদের কৃষিপণ্যের উৎপাদন করিয়ে নিচ্ছে৷ ফলে একজন স্বল্পপুঁজির ছোট কৃষক তাঁর সামান্য কৃষিপণ্য বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দামে, বা গুণমানে এঁটে উঠতে পারছেন না৷ মার খাচ্ছেন৷ ফলে বহু কৃষক পরিবারের ছেলেরাই এখন চাষবাস ছেড়ে বাঁধা চাকরির নিশ্চয়তার দিকে পা বাড়িয়েছেন৷ সেখানে কৃষিজমি রক্ষার এই আবেগসর্বস্ব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আন্দোলন কৃষিজীবী মানুষের আদতে কতটা উপকার করবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে৷

সেই নিরিখে সিঙ্গুর ভবিষ্যতের কাছে ঠিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, না ভুল, তার উত্তরও সময়ই দেবে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়