1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

সম্মুখযুদ্ধের বীর সৈনিক যশোরের মমতাজ

রাজাকাররাও রেহাই পায়নি তাঁদের হাত থেকে৷ মেয়েদের জন্য অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে মেয়েদের উৎসাহিত করেছেন তাঁরা৷ অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পাক সেনাদের উপর৷

default

১৯৭১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ বেগম

‘‘সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভারত থেকে অস্ত্র বহন করে আমরা দেশের মধ্যে পৌঁছে দিতাম৷ কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে নৌকায় করে অস্ত্র নিয়ে যেতাম৷ সারারাত ধরে নৌকায় অস্ত্র বহন করতাম৷ নৌকায় অনেক সময় সাপ উঠতো৷ সাপগুলোকে ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতাম৷ একদিন অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছি এমন সময় পাঁচ-ছয় জন রাজাকার আমাদেরকে পথের মধ্যে অস্ত্রসহ ধরে ফেলে৷ আমরা তিন জন ছিলাম৷ দুই জন মেয়ে আর এক জন ছেলে৷ রাজাকাররা আমাদেরকে নিয়ে তাদের ঘাঁটিতে যাচ্ছিল৷ আমরা সারাক্ষণ ভাবছি কী করা যায়৷ ওরা সংখ্যায় বেশি৷ তার উপর ওরা তো বাঙালি৷ ফলে সাঁতারও জানে৷ এভাবে যেতে যেতে এক পর্যায়ে নদীর ঘাটে নৌকা ভিড়ল৷ এসময় সেখানে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দলকে আমরা পেয়ে যাই৷ তারা দূরে থেকে দেখে আমাদেরকে চিনতে পেরে অনুসরণ করছিল৷ সুবিধামতো জায়গায় পৌঁছেই আমাদের ছেলেরা রাজাকারদের উপর হামলা করে৷ এসময় রাজাকারদের কাছে অস্ত্র থাকলেও তারা পাল্টা গুলি ছোঁড়ার সুযোগ করে উঠতে পারেনি৷ তারা হতভম্ব হয়ে পালানোর চেষ্টা করে৷ ঠিক এসময় আমি একজন রাজাকারের পাঞ্জাবি ধরে ফেলি৷ ফলে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়৷ তখন আমি তাকে এমন মার মেরেছিলাম যে আমি আর কখনই কাউকে এতোটা মারিনি৷ এরপর আমাদের ছেলেরাও এসে বেয়নেট দিয়ে তাকে মারতে মারতে সেখানেই মেরে ফেলে৷'' এভাবেই ডয়চে ভেলের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের সাহসী ভূমিকার কথা বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ বেগম৷

যশোর শহরে ১৯৫৩ সালের ২৫ আগস্ট জন্ম মমতাজ বেগমের৷ বাবা অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন এবং মা রওশন আরা বেগম৷ রাজনৈতিক ও সংগ্রামী পরিবারেই বেড়ে ওঠেন মমতাজ৷ তাঁর নানা পাকিস্তান আমলে সাংসদ ছিলেন৷ বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পরও আমৃত্যু সাংসদ হিসেবে সমাজসেবা করেছেন তিনি৷ এছাড়া মমতাজ বেগমের বাবা এবং নানা দু'জনই বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সাথে জড়িত ছিলেন৷ ফলে সেই ছোট্টকাল থেকেই মিছিল-মিটিং'এ দুই ভাইয়ের সাথে হাজির থাকতেন মমতাজ৷ এমনকি স্কুলে পড়া অবস্থায় ১৯৬৫ সালের আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন তিনি৷

Momtaz Begum

বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ বেগম

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনের সময়ও রাজপথে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন মমতাজ৷ এছাড়া নাচ-গানেও পটু ছিলেন তিনি৷ তাই আন্দোলন-সংগ্রামে বিপ্লবী সংগীত পরিবেশন করে জনতার মাঝে উদ্দীপনা-উৎসাহ জোগাতেন এই সাহসী প্রতিভা৷ এরপর মুক্তিযুদ্ধের আগে নিউক্লিয়াস নামে যে গোষ্ঠী তৈরি হয় সেখানেও সদস্য ছিলেন তিনি৷ ফলে যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই নিউক্লিয়াস এর সদস্য হিসেবে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ নেন মমতাজ৷ এসময় তিনি দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন৷

এই প্রশিক্ষণ করার সময়ই মার্চ মাসের ২ তারিখে আ স ম আব্দুর রবের পাঠানো স্বাধীন বাংলাদেশের নমুনা পতাকা পান৷ সেই নমুনা অনুসারে সারারাত জেগে স্থানীয় এক দর্জির বাসায় বসে গোপনে ২২ টি পতাকা তৈরি করেন৷ পরের দিন যশোর ঈদগাহ চত্বরে পতাকা উত্তোলন করা হয়৷ এরপর নতুন পতাকা নিয়ে মিছিল করছিলেন তাঁরা৷ সেই মিছিলে পাকিস্তানি সেনারা গুলি বর্ষণ করে৷ এসময় গুলিতে নিহত হন চারুবালা কর৷ তাঁর লাশ নিয়ে আবারো মিছিল করেন তাঁরা৷ এরপর ২৩ মার্চ যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে নতুন পতাকা উত্তোলন করেন৷ এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই বিডিআর-এর সাথে ভূগর্ভস্থ গোপন ঘর তথা ট্রেঞ্চ খুঁড়তেন মমতাজ এবং তাঁর সঙ্গীরা৷ ফলে রাজাকার এবং পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর কালো তালিকায় আগে থেকেই নাম ছিল মমতাজ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের৷

২৬ তারিখ শহরের বাড়ি ছেড়ে গ্রামে চলে যান তাঁরা৷ বাড়ি থেকে রওয়ানা দেওয়ার মাত্র কিছুক্ষণ পরেই এসে হাজির পাক সেনারা৷ কিন্তু বাড়িতে কাউকে না পেয়ে বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পাক সেনারা৷ যুদ্ধের সময় স্বামী হারানো বড় বোনের করুণ কাহিনী তুলে ধরেন মমতাজ৷ তিনি বলেন, ‘‘বড় বোন আমাদের বাসায় ছিলেন৷ তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন৷ তাঁকে সাথে নিয়েই আমরা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি৷ ২৫ মার্চ বেতন উঠানোর জন্য খুলনায় গিয়েছিলেন আমার দুলাভাই৷ কিন্তু আর ফিরে আসেননি৷ অথচ আমার বোন এখন পর্যন্ত তাঁর পথ চেয়ে আছেন৷ যুদ্ধের সময় আমার বোনের বয়স মাত্র ১৯ বছর ছিল৷ অথচ তিনি আর বিয়ে করতে রাজি হননি৷ তিনি শুধু বলেন, সে ফিরে আসবে এবং সে ফিরে আসলে তাকে কী জবাব দেবে তোমরা৷ এখন আমার বোন অসুস্থ এবং মৃতপ্রায়৷ অথচ এখনও তিনি বলেন, সে ফিরে আসবে৷''

গ্রামের বাড়ি থেকেই যশোর শহরে এসে এসে বিভিন্ন অপারেশনে যোগ দিতেন মমতাজ৷ যশোর জেলখানা ভেঙে কয়েদিদের বের করে এনে তাদের নিয়ে অপারেশন চালিয়েছেন৷ এরপর পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিন দিন তিন রাত পায়ে হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজে ভারত পাড়ি দেন মমতাজ৷ সেখানে ছেলেদের সাথে মেয়েদেরকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি৷ তাই মেয়েদের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে বিভিন্ন এলাকা এবং শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে আরো অনেকগুলো মেয়ে সংগ্রহ করেন মমতাজ এবং তাঁর অপর সহযোদ্ধা৷ এরপর মেয়েদের জন্য গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়৷ সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র হয়ে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক সেনাদের উপর৷ পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্মুখযুদ্ধ করেন৷ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সমাজ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ বেগম৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও