1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

সমাধিকে ঘর বানালেন মোনা

দক্ষিণ এশিয়ায় হিজড়া হয়ে জন্মগ্রহণ করা একটা অপরাধের মতো৷ কেবল হিজড়া হওয়ার কারণেই তাঁদেরকে সব হারাতে হয়, পরিবারও তাঁদের ত্যাগ করে৷ গৃহত্যাগী হয়ে কষ্টে কাটানো জীবনে তাঁরা স্বপ্ন দেখেন ফের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার৷

নয়া দিল্লির মোনা আহমেদ সে রকম একটি সুযোগ পেয়েও ছিলেন৷ তবে কাঙ্ক্ষিত সেই জীবনে বেশি দিন থাকতে পারেননি৷ এ কারণে ফিরে আসেন নিজের পরিচিত দুনিয়ায়৷ ফিরে এসে ঘর হিসাবে বেছে নেন মেহদিয়ান এলাকার  করবস্থানকে৷

এখানে মোনার প্রতিবেশীরা যৌনকর্মী, কবর খননকারী এবং ভিক্ষুক৷ তাঁদের জীবন জড়িয়ে আছে এই কবরের সঙ্গেই৷ তাঁরা কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকেন৷ ভেজা জামা-কাপড় শুকোতে দেয় বাইরের সমাধিস্তম্ভের বাইরের দিকে৷

কয়েক দশক ধরে মোনা এখানেই বাস করছেন৷

মোনার বন্ধু ও নারীবাদী লেখক উর্বশী বুটালিয়া বলেন, এক সময় মোনা এই অদ্ভূত এলাকাটি ছাড়তে চাইতেন৷ তাঁর ইচ্ছা ছিল, দিল্লীর কোনো একটি অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে বাস করবেন৷

১৯৫৫ সালে পারিবারিক বাসা থেকে পালিয়েছিলেন মোনা৷ সমাজের মূল স্রোতের বাইরে এই এলাকায় বাস করতে থাকেন৷ ভারত তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দিলে ২০১৪ সালে এদের মূল ধারায় ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হয়৷

তবে ফ্ল্যাটে ফেরার পর এটাকে তার কাছে কারাগার মনে হতে থাকে৷ মানুষে গমগম করা স্থানে থাকতেন তিনি৷ সেখানে উৎসবে হিজরাদের ঐতিহ্যবাহী নাচ হতো৷ এ ছাড়ার তাঁর কাছে অনেকেই আসতো পরামর্শের জন্য৷

তবে এই জীবন ছাড়ার পর এককালের পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিক জীবন আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না৷ পূর্বের জীবনই হয়তো তার কাছে স্বাভাবিক জীবন৷ পরিবর্তিত জীবন তাঁর কাছে কোনো আবেদনই তৈরি করতে পারেনি৷ এখানে বরং একাকীত্বই তাঁর কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়৷

হিজড়াদের যমপুরী

এশিয়া-প্যাসিফিক ট্র্যান্সজেন্ডার নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মী নারায়ণ ত্রিপাঠি'র মতো অধিকার কর্মীরা তৃতীয় লিঙ্গের নারীদেরকে আড়াল থেকে বের করতে শুরু করেন৷ সমাজে এই নারীদেরকে সব সময়ই সন্দেহের চোখে দেখা হতো৷

তবে তাঁদের একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে৷ হিন্দু শাস্ত্রে হিজড়াদেরকে ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো৷ এ কারণে বিয়ে বা জন্মক্ষণে তাঁদের আশীর্বাদ নেয়া হতো৷

তবে এটা তাঁদের জীবনে খুব কম ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে৷ ভারতে ২০ লাখের মতো এমন মানুষ রয়েছে৷ তাঁদের অধিকাংশই গরিব পরিবার থেকে এসেছেন৷

যৌবনে মোনাও অন্য হিজড়াদের মতো একজন পুরুষ গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ তিনি হিজড়াদের অন্তরালের জগতকে নিয়ন্ত্রণ করেন৷ এটা হিজড়াদের অন্য রকম পরিবার৷ সেখানে আধিপত্য চলে ওই গুরুর৷ সেখানে সদস্যদের উপর নানা বিধিনিষেধ থাকে৷ তাঁরা পুলিশসহ বাইরের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না৷

শিষ্যত্ব গ্রহণকারী হিজড়াদের বিভিন্ন গ্রুপ বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে৷ নিজ নিজ এলাকায় তাঁরা মালী, বাসার কাজের লোক, দোকানদারদের নিয়ে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করে৷ তাঁদের মাধ্যমে তাঁরা বিয়ে, শিশুর জন্ম, নতুন চাকুরি, নতুন বাড়িসহ যে কোনো উদযাপনের খবর সংগ্রহ করেন৷

খবর পাওয়ার পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, অর্থাৎ হিজড়ারা সেখানে গিয়ে টাকা আদায় করেন৷ বিয়ের জন্য নব দম্পত্তিকে ২০ হাজার রূপি দিতে হয়৷ নয়তো তাঁরা জনসম্মুখে নিজেদের জামা-কাপড় খুলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেন৷ ব্যক্তি ও উপলক্ষ্যভেদে এই টাকা ১ লাখ রূপিও হতে পারে৷

আশীর্বাদের কাজটা হিজড়াদের উঁচু শ্রেণির লোকজনই করে থাকে৷ বাকিদের যৌনকর্মী, ভিক্ষুক হয়েই জীবন কাটাতে হয়৷ 

মেহদিয়ান এলাকার অধিবাসীরা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ দখলদার৷ তাঁরা তাঁদের সম্পত্তির জন্য নামজারি করতে পারেন না৷ যদিও দশকের পর দশক ধরে বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে৷

আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হলেও কর্তৃপক্ষ প্রতিরোধের ভয়ে এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করে না৷

মধ্য আশির দশকে মোনা এখানে একখণ্ড জমি নেন৷  সেখানেই এখন তাঁর একটি ঘর রয়েছে৷

তবে তাঁর ঘরের দরজা সব সময়ই খোলা থাকে৷ এমনকি ঘরে ডাকাতির পরও তিনি এই নিয়ম থেকে সরে আসেননি৷ যে কেউ চাইলেই যে কোনো সময় তাঁর ঘরে যেতে পারেন৷

বুটালিয়া বলেন, দরজা কখনো বন্ধ হয় না৷ দরজা ধাক্কা দিলেই ভেতরে ঢোকা যায়৷ তখন হয়তো তিনি নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন৷ কিন্তু এরপরও যে কেউ ঘরে গিয়ে টিভি দেখতে পারে৷ এটা তাঁর কাছে একেবারেই স্বাভাবিক৷ যতদিন তিনি বেঁচে আছেন ততদিনই হয়তো এটা চলবে৷

এসএন/এসিবি (থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন)

নির্বাচিত প্রতিবেদন