1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

সবুজ নেই, আকাশ নেই, আছে শুধু নির্মমতা, অবহেলা

বাংলাদেশের শিশুরা ঝুঁকির মুখে আছে৷ শিশুদের বেড়ে ওঠার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় তারা শুরুতেই নানা মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে৷ তাই কখনো কখনো তারা অবসাদ ও হতাশা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনেও প্রবেশ করে৷

তাদের খেলার মাঠের জায়গা নিয়েছে এখন তথাকথিত ‘প্লে-জোন'৷ নীল আকাশ তারা দেখে না৷ ক্রিকেট, ফুটবল নয় তারা আসক্ত ভার্চুয়াল গেমে৷ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশে বেড়ে উঠছে এখানকার শিশুরা৷

রাজশাহী মহানগরীর উপকন্ঠ কাটাখালী পৌর এলাকায় মাসকাটাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়৷ এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলের সামনেই রয়েছে সবুজ মাঠ৷ কিন্তু সেই মাঠ দখল করে এখন বসানো হয়েছে হাট৷ খেলা তো দূরের কথা, হাটের হৈ চৈ আর সোরগোলে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে৷

স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুর রউফ জানায়, ‘‘আমাদের স্কুলের খেলার মাঠ দখল করে হাট বসানো হয়েছে৷ সবসময় হৈচৈ হয়৷ আমরা ঠিকমতো পড়তে পারি না৷ মাঠে ইট, লাঠি পোঁতার কারণে খেলতে গেলে পা মচকে যায়৷ বারান্দায় লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে৷ স্কুলে এলে আর বাইরে যেতে পারি না৷ টিফিনেও আমরা মাঠে গিয়ে খেলতে পারি না৷''

অডিও শুনুন 07:33

‘‘শিশুরা সবাই একই শ্রেণির নয়’’

এ প্রসঙ্গে সোনিয়া শারমিন নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘‘বাচ্চারা তো লেখাপড়া আর খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শিখবে৷ স্কুলের মাঠে সবজির হাট বসানো হয়৷ হাটের কারণে শিশুদের লেখাপড়া ভালো হয় না৷ হাটের কারণে শিশুরা খেলাধুলার মতো বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷''

ঢাকায় ৪ হাজার ২০০ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় শিশুদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবশ নেই এখানে৷ জরিপে অংশ নেয়া ৮৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় একটি খেলার মাঠ হোক৷ ৭৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠুক৷ ৭৬ শতাংশ শিশু বলেছে, এলাকায় শিশুপার্ক গড়ে তোলা হোক, ৬৭ শতাংশ শরীরচর্চাকেন্দ্র, ৩ শতাংশ পাঠাগার ও ২ শতাংশ চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার কথা বলেছে৷

আরেক গবেষণা প্রতিবেদনেও ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে৷ তাতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না৷ বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নাই৷ ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছাকাছি খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নেই৷ ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু কোনো খেলাধুলাই করে না এবং ৪৭ শতাংশ শিশু দিনে গড়ে ৩ ঘন্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টেলিভিশন দেখে কাটায়৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘এর ফলে নানারকম শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি শিশুরা নানা মানসিক সমস্যায়ও পড়ছে৷ তারা আত্মকেন্দ্রিক, অসহনশীল ও অসামাজিক হয়ে পড়ছে৷''

শিশুরা, বিশেষ করে শহুরে শিশুরা এখন তাই গৃহবন্দি সময় কাটায়৷ তাদের বিনোদন বলতে এখন কম্পিউটার গেম, মেবাইল ফোন গেম বা টিভি দেখা৷ ব্যাট বলের পরিবর্তে হাতে থাকে ট্যাব৷ তারা সবুজ মাঠ এখন দেখে ভার্চুয়াল জগতে৷ খেলাধুলাও সেখোনে৷

অভিভাবকরাও এত ব্যস্ত যে শিশুদের সময়ই দেননা৷ কর্মজীবী মা-বাবা শিশু দেখাশোনার ভার ছেড়ে দিয়েছেন গৃহকর্মী বা আয়াদের ওপর৷ আকাশ না দেখা শিশু বড় হচ্ছে ঘরের কোণে একাকি৷

ঢাকার ৯৫ ভাগ স্কুলে কোনো খেলার মাঠ নেই৷ কাগজে-কলমে রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের মোট ৫৪টি পার্ক ও ২৫টি খেলার মাঠ রয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে এগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার৷

মাঠের অভাবের সুযোগে ঢাকায় গড়ে উঠেছে কিছু প্লে জোন নামের ভার্চুয়াল গেমের কর্নার৷ ফার্স্ট ফুডের দোকানের সঙ্গেই এগুলোর অবস্থান৷ সেই সব প্লে-জোনে ভার্চুয়াল জগতে শিশুদের বন্দুক চালানো বা কার ড্রাইভিংয়ের মতো গেমস-এ অভ্যস্ত করা হচ্ছে৷ এমন অনেক গেম আছে যা শিশুদের উপযোগীই নয়৷ শহুরে শিশুরা জাংক ফুডের সাথে গিলছে অদ্ভুত সব ভার্চুয়াল গেম৷ তৈরি হচ্ছে ব্যস্ত পৃথিবীর অনুপযোগী প্রজন্ম৷

একদিকে শিশুর যেমন খেলার মাঠ নেই, নেই হাত-পা ছুড়ে বেড়ানোর জায়গা, অন্যদিকে এই শিশুই হচ্ছে নানা নির্মমতার শিকার৷ বাংলাদেশের ৮০ ভাগ শিশুই শারীরিক শাস্তির শিকার হচ্ছে৷ তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা নিজেদের বাড়িতে এই শাস্তির শিকার হয়৷

বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িতে শারীরিক শাস্তি নিয়ে ইউএনডিপি ২০১৩ সালে একটি জরিপ পরিচালনা করে৷ সাক্ষাত্‍কার ভিত্তিক সেই জরিপে দেখা যায়৷ প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন জানিয়েছে যে তারা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছে৷ আর প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জন শিশু জানায় যে তারা বাড়িতে অভিবাকদের হাতে শারীরিক শাস্তি পেয়ে থাকে৷

ইউনিসেফের জরিপ বলছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতকরা ৯১ ভাগ এবং বাড়িতে শতকরা ৭১ ভাগ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার৷ জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে বেত বা লাঠির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে এবং ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ ছাত্র এই বেত বা লাঠির শিকার হয়৷

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম শিশুদের অধিকার ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করে এরকম ২৬৭টি সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক৷ তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ১০ মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি শিশু৷ ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ২ হাজার ১৯৭ এবং ২০১৩ সালে ১ হাজার ১১৩ জন ছিল৷

অডিও শুনুন 02:43

‘‘আমরা এখন প্রচুর শিশু পাচ্ছি, যারা মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত’’

শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ'-এর প্রধান ওয়াহিদা বানু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের পরিবেশকে মোটেই শিশুবান্ধব বলা চলেনা৷ এখানে শিশুদের অধিকার এবং তাদের সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য ভালো ভালো আইন আছে, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নাই৷ শিশুরা সবাই একই শ্রেণির নয়৷ এখানে কর্মজীবী শিশু আছে, পথ শিশু আছে, গৃহকর্মী শিশু আছে, ঝঁকিপুর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু আছে৷ রয়েছে আটিস্টিক শিশুও৷ কোনো শিশুর সুরক্ষা এবং বিকাশের জন্য কী প্রয়োজন আমরা তা সুনির্দিষ্ট করতে পারিনি৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘শিশুর বিকাশের জন্য যে পরিবেশ এবং পারিবারিক ও সামাজিক আবহ দরকার তার যেমন অভাব, তেমনি শিশুর প্রতি নির্মমতাও সব শ্রেণির মধ্যেই দেখা যায়৷''

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের শিশু বর্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান ডা. হেলাল উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের এখানে প্যারেন্টিং বিষয়টিই এখনো গড়ে ওঠেনি৷ আর পারিবারের বাইরের পরিবেশ তো শিশুর জন্য আরো ভয়াবহ৷ তার খেলার মাঠ নেই, বিনোদনের জায়গা নেই, বেড়ে ওঠার পরিবেশ নেই৷''

ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘‘এ কারণে শিশু কম্পিউটার, ভিডিও বা মোবাইল গেম খেলে সময় কাটায় ৷ টিভি দেখে৷ ফলে যা হচ্ছে, তা হলো শিশু একাকিত্বে ভুগতে ভুগতে নিজের একটা নির্জন জগৎ তৈরি করে৷ অসামাজিক হয়ে যায়৷ মিশতে পারে না৷ বাস্তব পরিবেবেশে অসহায় বোধ করে৷''

ডা. হেলাল আরো বলেন, ‘‘আমরা এখন প্রচুর শিশু পাচ্ছি, যারা মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত৷ এ সব শিশু কিশোররা পরবর্তীতে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে প্রবেশ করতে পারে৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়