1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

সত্যজিতের রবিশঙ্কর

বন্ধু-সংগীত পরিচালক রবিশঙ্করকে নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরির ভিশুয়াল স্ক্রিপ্ট করেছিলেন সত্যজিৎ রায়৷ ছবি না হওয়া সেই স্ক্রিপ্ট বই আকারে প্রকাশিত হলো৷

সত্যজিৎ রায়ের চারটি ছবির সংগীত পরিচালনার কাজ করেছিলেন সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্কর৷ সত্যজিতের ‘‘অপু ট্রিলজি'', অর্থাৎ ‘‘পথের পাঁচালি'', ‘‘অপরাজিত'' ও ‘‘অপুর সংসার'' এবং সেইসঙ্গে ‘‘পরশপাথর''৷ সেই সময়ই সম্ভবত সত্যজিৎ ভেবেছিলেন শিল্পী রবিশঙ্করের উপর এক স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করার কথা৷ চিরাচরিত প্রথায় দৃশ্যের বর্ণনা কথায় লিখে নয়, কলম অথবা তুলি দিয়ে কালো কালিতে একের পর এক ছবি এঁকে সেই সংলাপহীন, সংগীতবহুল ছবির ভিশুয়াল স্ক্রিপ্ট বা দৃশ্য-চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, যা তিনি পথের পাঁচালি ছবির বিশেষ কয়েকটি দৃশ্যের জন্যেও করেছিলেন৷

Satyajit Ray

সত্যজিৎ রায়

এই দৃশ্য-চিত্রনাট্যের প্রতিটি ফ্রেমে রয়েছে মূলত ক্লোজ-আপ৷ সেতারবাদনরত শিল্পীর নিবিষ্ট মুখের, সেতারে তাঁর হাতের আঙুলের, সেতারের গায়ের কারুকাজের, তবলিয়ার হাতের এবং আরও কিছু শৈল্পীক মোটিফের ‘‘ক্লোজ আপ শট'' – যা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ছবিটি ভেবেছিলেন সত্যজিৎ রায়৷ চিত্রনাট্যের মার্জিনে ‘‘ডিজলভ'' বা ‘‘ফেড ইন'' জাতীয় কিছু নির্দেশ চলচ্চিত্রের পরিভাষায় লিখেছিলেন সত্যজিৎ, যা মূলত নিজের জন্যেই৷ কোনো অজ্ঞাত কারণে সত্যজিৎ রায় শেষপর্যন্ত ছবিটি করেননি, সেটি তাঁর খাতায় চিত্রনাট্যের চেহারাতেই থেকে গিয়েছিল৷

সত্যজিতের স্মৃতি, তাঁর জীবনের নানা বিচিত্র সৃজনশীলতা এবং কাজের সংরক্ষণের জন্য ‘রে সোসাইটি' নামে যে সংস্থা আছে, তাদের উদ্যোগে এবং সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায়ের সম্পাদনায় সেই ভিশুয়াল স্ক্রিপ্টটি এবার বই আকারে প্রকাশ করল ‘হার্পার কলিন্স সংস্থা'৷ একই সঙ্গে আরও একটি বই প্রকাশ হলো, ‘‘ফোরটিন স্টোরিজ দ্যাট ইনস্পায়ার্ড রে''৷ নামেই স্পষ্ট এই বইয়ের মূল বিষয়৷ প্রেরণাদায়ী গল্পগুলির ইংরেজি অনুবাদ এবং বইটি সম্পাদনার কাজ করেছেন ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়৷ ২ মে, সত্যজিৎ রায়ের ৯৩তম জন্মদিনে কলকাতার ‘‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস'', যা ‘‘টেগোর সেন্টার'' নামেও পরিচিত, তার সত্যজিৎ রায় প্রেক্ষাগৃহে বই দুটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করলেন সত্যজিতের ছবির দুই অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় এবং ভারতীয় থিয়েটার ও সিনেমার বিশিষ্ট অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ৷

Satyajit Ray's Ravi Shankar

বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আগত অতিথিবৃন্দ

প্রতি বছর সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনে যে ‘‘রে মেমোরিয়াল লেকচার''-এর আয়োজন করে রে সোসাইটি, এবার নাসিরুদ্দিন শাহ সেই স্মারক বক্তৃতা দিলেন৷ যদিও সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কোনো ছবিতে কাজ করার সুযোগ নাসিরুদ্দিনের হয়নি৷ কিন্তু বলা বাহুল্য যে, সত্যজিতের ছবির গুণমুগ্ধ দর্শক নাসিরুদ্দিন৷ তিনি একেবারে নিজস্ব কায়দায় বললেন, সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর তিনবার ‘‘সাক্ষাত'' হওয়ার গল্প৷ একবার, তখন নাসির খুব ছোট, ক্রিকেটারদের ছবি কেটে কেটে ঘরের দেওয়ালে বা খাতায় সেঁটে রাখেন, সাদা পোশাক পরা এক দীর্ঘদেহী ভদ্রলোকের ছবি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই কোনো বড় ক্রিকেটার হবেন, তাই তাঁর ছবিটি কেটে তিনি খাতায় আটকেছিলেন৷ পরে যদিও তিনি জানতে পারেন ওই লোকটির নাম সত্যজিৎ রায় এবং তিনি সিনেমা বানান, কিন্তু ছবিটা আর ক্রিকেটারদের খাতা থেকে সরাননি নাসিরুদ্দিন!

এর পরে, বাস্তবে পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে নাসিরুদ্দিনের মুখোমুখি দেখা নয়া দিল্লির মাক্সমুয়েলার ভবনে৷ বিশ্ববিখ্যাত চিত্র পরিচালক ইঙ্গমার বার্গম্যানের একটি ছবি দেখানো হচ্ছিল সেখানে, দেখতে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ এবং নাসিরুদ্দিন দূর থেকেই তাঁকে দেখেছিলেন সেবার৷ পরের বার কিন্তু সত্যজিৎ নিজে এগিয়ে এসে করমর্দন করেছিলেন নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে, দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে কেতন মেহতা পরিচালিত ‘‘মির্চ মসালা'' ছবিতে নাসিরুদ্দিনের অসামান্য অভিনয় দেখার পর৷

Soumitra Chatterjee und Naseeruddin Shah

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নাসিরুদ্দিন শাহ

তবে সত্যজিৎ রায় নন, তাঁর নামাঙ্কিত স্মারক বক্তৃতায় নাসিরুদ্দিনের নির্দিষ্ট বিষয় ছিল ‘‘দ্য অনেস্ট অ্যাক্টর'', বা অভিনেতার সততা৷

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে, সমালোচকের নির্মম দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে, প্রায়শই তীক্ষ্ণ শ্লেষ আর বিদ্রূপে ঝলসে উঠে অভিনেতা এবং অভিনয়ের আন্তর্সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের চরিত্র নির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রে সততা, বা সৎ থাকার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নিজের বক্তব্য পেশ করলেন নাসিরুদ্দিন এবং বোঝালেন, এই প্রবীণ বয়সেও তিনি স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে পিছপা হন না৷ যেমন বললেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পূর্তি নিয়ে যতই দেশজুড়ে ট্যামটেমি বাজানো হোক না কেন, তিনি মোটেই মনে করেন না বিষয়টা নিয়ে এত উচ্ছ্বাসের কোনো কারণ আছে! কারণ ১০০ বছর আগে যেটা হয়েছিল, মূলত হিন্দি এবং উর্দু থিয়েটারের চলতি ধারাকে আত্মস্থ করে তৈরি হয়েছিল ভারতীয় সিনেমা৷ থিয়েটারকে প্রায় গিলে খেয়ে, তার অভিনেতাদের সবাইকে টেনে নিয়েছিল সিনেমা, অথচ তাঁর নিজস্ব কোনো চিত্রভাষা তৈরি হয়নি৷ ফলে ইউরোপে যে সময় ‘‘বাইসাইকেল থিফ''-এর মতো ছবি তৈরি হচ্ছে, ভারতীয় সিনেমা তখন পড়ে থেকেছে ‘‘রাজা হরিশচন্দ্র'' বা ‘‘কালীয় দমন''-এর মতো পৌরাণিক কাহিনীর আবর্তে৷

শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, নাসিরুদ্দিন যা বলছেন, সেই কথাগুলোই বুঝি সত্যজিৎ রায় চিরকাল বলতে চেয়েছেন তাঁর সিনেমায়৷ এমন এক চিত্রভাষার সন্ধানে নিরন্তর প্রয়াসী থেকেছেন সত্যজিৎ, যা একইসঙ্গে ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক, আর চিরকালীন৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন