1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

‘শহরাঞ্চলে ডিভোর্সের প্রধান কারণ মাদক'

‘মাদক' বাংলাদেশে একটা ভয়াবহ সমস্যা৷ অথচ মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই এখানে৷ দেশে মদকাসক্তদের অধিকাংশই তরুণ-তরুণী৷ তবে দিন দিন আসক্ত নারীদের সংখ্যা বাড়েই চলেছে, জানালেন অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল৷

ডা. কামাল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ-এর সাইকোথেরাপি বিভাগের প্রধান৷ ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ‘‘এই তরুণীরা তাদের বন্ধুদের বা প্রেমিকদের কাছ থেকে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে৷ অনেকক্ষেত্রে মাদকে আসক্ত স্বামী কৌশলে স্ত্রীকে মাদকাসক্ত করে ফেলছেন৷ তাছাড়া শহরাঞ্চলে যে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাগুলো ঘটছে, তার অধিকাংশই মাদকের কারণে৷ রাতে মদ্যপান করে স্বামীরা বউকে পেটাচ্ছেন, আবার সকালে হাত-পা ধরে ক্ষমা চাচ্ছেন৷ কিন্তু ততক্ষণে ওই নারীর সহ্যের সীমা পার হয়ে গেছে, ফলে তারা ‘সেপারেট' হয়ে যাচ্ছেন৷''

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে মাদকসেবীদের চিকিৎসা কেমন?

ডা. মোহিত কামাল: মাদকাসক্তির অনেকগুলো ধরণ আছে৷ যেমন বাংলাদেশে তিন ধরনের চিকিৎসা চলে৷ একটা হলো ‘সোশ্যাল মেথড', আরেকটা ‘সাইকোলজিক্যাল মেথড' এবং অন্যটা ‘ বায়ো-সাইকোলোজিক্যাল মেথড'৷

অডিও শুনুন 10:34

‘সরকারি সেন্টারগুলো মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ নয়’

এখানে তিনটা মডেলের তিনটা দিক৷ আমি এটা বলব না যে, প্রত্যেকটা মডেলই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে পারে৷ এখন ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড হলো – দু'বছর চিকিৎসা করতে হবে৷ এক বছর যদি ফ্রি রাখা যায়, তবে তাকে আমরা ‘আর্লি রিকভারি বলি'৷ আরেক বছর যদি ফ্রি রাখা যায়, তাহলে সেটাকে আমরা বলি ‘সাসটেন রিকভারি'৷ কিন্তু দুই বছরের চিকিৎসা দেয়ার মতো অবকাঠামো বাংলাদেশে গড়ে উঠেনি৷ অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড স্টান্ডার্ড চিকিৎসা বাংলাদেশে গড়ে উঠেনি৷

তারপরও বিভিন্ন সেন্টার, আমার পর্যবেক্ষণে যেটা দেখেছি, বেশ নাম করেছে৷ তারা তাদের মডেল অনুযায়ী জাতিসংঘ বা ডাব্লিউএইচও-র বলে দেয়া মতে চিকিৎসা দিয়ে থাকে৷ কেউ কেউ আবার ‘কলম্বো প্ল্যান' বা নিডা অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকে৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যাচ্ছে৷ তবে নেশায় ফেরত যাওয়ার ‘রেট' খুবই বেশি৷ কারণ ঐ ছেলেটা যে পাড়ায় থাকত, চিকিৎসা নিয়ে সেখানে ফিরে গিয়ে নানা ছলে-বলে সে আবারো ফিরে যায়৷ এখন ‘ইজি কমিউনিকেশন', বিশেষ করে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুকের কারণে ডিলারদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে৷ ফলে আবার খুব সহজেই তাদের হাতে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে৷ এই যোগাযোগ যদি বিচ্ছিন্ন করা না যায়, তাহলে তাকে ফেরানো যাবে না৷ ফলে ফিরে যাওয়ার রেট ‘ভেরি হাই'৷ এর অর্থ এই নয় যে, চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল৷ আমি মনে করি, কোনো কোনো সেন্টারে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো এবং তাদের বিশ্বের নানা উন্নত দেশের সাথে তুলনা করা যায়৷ অন্যদিকে কোনো কোনো সেন্টার হয়ত মানসম্পন্ন নয়৷ ‘প্রাইভেট সেক্টর' বেশ ‘ডেভেলপ' করছে৷ কিন্তু সরকারি সেন্টারগুলো মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ বলে মনে করি না৷

আপনারা যাদের চিকিৎসা দেন বা যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের কতভাগ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন?

আমি একটা বাস্তব পরিসংখ্যান দিয়ে বলি৷ আমার অধিনে যে ক'জন রোগী ভর্তি আছে, সেই ২০ জনের মধ্যে ১৬ জনই ইয়াবায় আসক্ত৷ তারা ইয়াবা যখন নিতে থাকে, তখন তাদের ব্রেনের ভেতরেও পরিবর্তন হয়ে যায়৷ এটা ছেড়ে দেয়ার পর রোগীর অবসাদ থাকে, কাজ করার উদ্যোম থাকে না৷ অর্থাৎ ‘লেথার্জি' থাকে৷ তখন সে নিজেকে চাঙ্গা করার জন্য আবার পুরনো মাদকে ফিরে যায়৷ কোনো কোনো চিকিৎসায় ৬ মাস পরও তারা আবার মাদক নিয়ে ফেলে৷ আবার কোনো কোনো সেন্টারে থেকে তারা তিন মাস চিকিৎসা নিয়ে বের হওয়ার পরও আর ইয়াবা নেয় না৷ এ সময় আমরা বায়ো-সাইকোলোজিক্যাল মেথডে কিছু ওষুধও ব্যবহার করি৷ এক্ষেত্রে দেখা যায় ‘ফলোআপ' যদি ঠিকমতো থাকে, পারিবারিক ‘সাপোর্ট' যদি ঠিকমতো থাকে, তাহলে ‘রিকভারি রেট' খুব ভালো৷ এরপরেও অবশ্য অনেকে ‘ফেল' করে৷ এ অন্যতম কারণ হলো ‘ফ্রাস্টেশন' ও ‘স্টেস'৷

আপনাদের কাছে যেসব রোগী আসে, তাদের বয়স কত?

আমি এই মুহূর্তে একজন রোগী দেখছি, যার বয়স ৪৭ বছরের বেশি৷ তাঁর ডায়াবেটিস আছে৷ অথচ তিনি ইয়াবায় আসক্ত৷ তবে এ ধরনের ‘কেস' বেশি আসে না৷ তবে ১৫-১৬ বছর থেকে শুরু করে ৩২-৩৫ বছরের রোগীর সংখ্যাই বেশি৷ এমনকি কিশোর-কিশোরীরাও ইয়াবা খায়, কারণ স্কুল লেভেলেও এখন ইয়াবা ছড়িয়ে যাচ্ছে৷ এদের ‘মোটিভেট' করা হয় এই বলে যে, ইয়াবা খেলে স্লিম হবা, ভালো গান গাইতে পারবা৷ মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের এভাবে ‘মোটিভেট' করে ইয়াবা ধরিয়ে দেয়৷ একটু আগেই একটি ‘কেস' দেখলাম৷ একজন রোগী, গলব্লাডারে ব্যাথা হওয়াই ডাক্তার ‘প্যাথডিন' দিয়েছিলেন৷ মুশকিল হলো, এরপর ব্যাথা হলে তিনি নিজেই প্যাথডিন নিতেন৷ তার মানে তিনি এটাতে নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছিলেন৷ এইভাবে আমাদের ছেলেরা নানা ছলে-বলে মাদকে আসক্ত হচ্ছে৷ বলা বাহুল্য, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের প্রবণতাটা বেশি৷ আগে আমরা ভাবতাম এ সমস্যা ছেলেদের মধ্যে হয়৷ এখন কিন্তু অনেক মেয়েও আসছে৷

তরুণীদের মধ্যে মাদকাসক্তের হার কেমন?

এখন তরুণীদের মধ্যেও মাদকাসক্তের হার ব্যাপক৷ এখন আধুনিক যুগ৷ তাই তারা মোবাইল ফোনে, ইন্টারনেটে, ফেসবুকে যোগাযোগ করে৷ এভাবে সহজেই বন্ধু জোগাড় হয়ে যায়৷ আর বন্ধু যদি আসক্ত থাকে, তাহলে সে তার বান্ধবীকেও আসক্ত করে ফেলে৷ আমি কয়েকটি দম্পতিও পেয়েছি, যেখানে স্বামী ড্রাগ নেওয়ায় স্ত্রী বাধা দিলে স্বামী কৌশলে স্ত্রীকেও ইয়াবা ধরিয়ে দিয়েছে এবং দু'জনে মিলে নেয়া শুরু করেছে৷ পরবর্তীতে সন্তানরা তাদের নিয়ে এসেছে চিকিৎসা করাতে৷ এভাবে কিন্তু মেয়ে, মায়েরাও আসক্ত হয়ে যাচ্ছে৷ আমি মনে করি, আমাদের সমাজে ভোগবাদী অস্তিত্ব বেড়ে গেছে৷ এরা পর্ণসাইড দেখছে, আর নারী-পুরুষ একে-অপরকে ভোগের বস্তু মনে করছে৷ আজকাল তো শিশুকাল থেকেই এগুলো দেখার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে৷ এতে করে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ, মমতা, ভালোবাসার জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে৷ ফলে তারা নানা ধরনের অপকর্মেও জড়িয়ে যাচ্ছে৷

আপনারা যে মাদকাসক্ত রোগী দেখেন, তাদের অপরাধ প্রবণতা কেমন?

ধরুন একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার মেয়ে ড্রাগ নেয়৷ বাবা-মা যখন বিষয়টা জানল, তখন তাকে টাকা-পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হলো৷ তখন সেই মেয়েটি ড্রাগের জন্য একজন রিক্সাওয়ালার সঙ্গে চলে গেল বস্তিতে৷ সেখানে তাকে ২-৪ জন ধর্ষণ করল৷ কিন্তু সেটা সে গায়েই মাখলো না৷ তার কাছে মাদক পাওয়াটাই বড়৷ ফলে সে যখন আসক্ত হয়ে যায়, তখন সে বুঝতে পারে না যে সে ‘ক্রাইম' করছে৷ তার বিবেকবোধ শূন্য হয়ে যায়, মায়া-মমতার জায়গা ধসে যায়৷ তাই তখন তাকে দিয়ে যে কোনো অপরাধ করানো যায়৷ এমনকি হঠাৎ ক্ষেপে গেলে সে কাউকে খুনও করে ফেলতে পারে৷

একজন ‘এক্সপার্ট' হিসেবে আমি দেখেছি আমাদের শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশনে যে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাগুলো ঘটছে, মেয়েরা যে কেসগুলো ‘ফাইল' করছে অধিকাংশই গৃহনির্যাতন এবং সেটা ড্রাগের কারণে৷ রাতে মদ খেয়ে বা ড্রাগ নিয়ে বউ পেটানো যেমন চলেছে, তেমনই স্ত্রীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় ডিভোর্সের সংখ্যাও বেড়েছে৷ সুতারাং বেড়ে গেছে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, শুরু হয়েছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অবনতি হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির৷ এই যে এত ছিনতাই, ডাকাতি বেড়ে গেছে – আমার মনে হয়, আসলে এগুলো ড্রাগেরই একটা কুফল৷

তরুণ-তরুণী বা যাদের পরিবার এটা ‘সাফার' করছে, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

প্রত্যেকের নিজের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে৷ প্রতিটি পরিবারকে বলব, নিজ সন্তানের প্রতি নজর দিন, তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন৷ চারপাশে যে নানা ধরনের ফাঁদ আছে সে ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে৷ আসল কথা হলো – ঘরে যদি শান্তির আবহাওয়া থাকে, তাহলে সেই ঘরে বাচ্চাদের ‘সেলফ কনফিডেন্স' এত ভালো থাকে যে তারা অশুভকে না বলতে পারে৷ আর যেসব পরিবারে অশান্তি থাকে, বাবা-মায়ের মধ্যে হানাহানি হয়, ডিভোর্স, বিবাদ ঘটে, সেখানকার বাচ্চারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে৷ ঐ বাচ্চাদের মানসিক দুর্বলতা থাকে৷ তারা সহজেই অশুভকাজে জড়িয়ে যায় এবং খারাপ কাজ জেনেও সেটাকে না বলতে পারে না৷

বন্ধুরা, মাদকাসক্তি নিয়ে অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের সাক্ষাৎকারটি আপনার কেমন লাগলো? জানান নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়