1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

‘রাজনৈতিক চক্রে ভূলুণ্ঠিত শিশুদের মানবাধিকার'

রাজধানীতে ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডে সম্প্রতি ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল বের হয়৷ মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হলে, পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে৷ এতে মাসুদ মিয়া নামে এক শিক্ষার্থী গুলিবদ্ধ হয়৷

অন্যান্য মিছিলকারীরা পালিয়ে গেলেও মাসুদ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে৷ সে ক্যামব্রিয়ান কলেজের লালমাটিয়া ক্যাম্পাসের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র৷ পরিবারের সঙ্গে নিউ পল্টনের ইরানী কবরস্থানের পাশের একটি বাসায় থাকে মাসুদ৷ তার বাবা মীর কাশেম আহমেদ পেশায় একজন ঠিকাদার৷ কাশেম আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার ছেলের বয়স ১৬ বছর ৭ মাস৷ অথচ পুলিশ তার বয়স ১৮ বছরের বেশি দেখিয়ে তাকে মামলার আসামী বানিয়েছে৷ এখন পুলিশ পাহারায় পঙ্গু হাসপাতালে তার চিকিত্‍সা চলছে৷''

কাশেম বলেন, ‘‘আমার ছেলে কোনো অপরাধ করলে তার বিচার শিশু আইনে হওয়ার কথা৷ কিন্তু আমাদের কোনো কথাই পুলিশ শুনছে না৷''

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে মাসুদের দাবি, ‘‘পুলিশ আমাকে ধরার পর পায়ে গুলি করেছে৷'' তবে ধানমন্ডি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মিছিল থেকে যখন একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছিল, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে গুলি করতে হয়েছে৷ তারই একটা গুলি হয়ত মাসুদের পায়ে লাগে৷ তখন তো কে সামনে ছিল, তা দেখার সুযোগ ছিল না৷ তবে মাসুদের বয়স ১৮ বছরের বেশিই হবে৷

শুধু মাসুদ নয়, এই ঘটনার তিন দিন আগে গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি তিনটি শিশু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়৷ এতে ওই শিশুদের মধ্যে একজন আহতও হয়৷ স্থানীয় লোকজন তাদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে৷ শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সিরাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই তিনটি শিশুর কাছে কে বা কারা ককটেল দিয়েছিল, তা জানা যায়নি৷ কিন্তু যারা এই শিশুদের হাতে ককটেলগুলো তুলে দিয়েছে, তারা কি মানুষ?''

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিশুদের ব্যবহার নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু একদিকে হাতে বোমা তুলে দিয়ে তাদের মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করা হচ্ছে৷ অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বয়স বাড়িয়ে বড় অপরাধীদের সঙ্গে রাখছে শিশুদের৷ এতে শিশুরা অপরাধ করে সংশোধনের সুযোগ তো পাচ্ছেই না, বরং জেল থেকে অপরাধী হয়ে বের হচ্ছে৷

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সভাপতি এমরানুল হক চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে শিশুদের নিয়ে ছোট-বড় ৩৫টি আইন আছে৷ কিন্তু এর একটি বা দু'টির বেশি মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা জানেন না৷ আসলে এখন যে অবস্থা, তাতে শিশুদের নিয়ে বড় ‘মুভমেন্ট' দরকার৷ কারণ আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী শিশুদের দেখার দায়িত্ব নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের৷ কিন্তু এই মন্ত্রণালয়ে শিশুদের কোনো ‘ডেস্ক'-ই নেই৷ সারাদেশে নারী বিষয়টি দেখার জন্য কর্মকর্তা থাকলেও শিশুদের দেখার জন্য কোনো কর্মকর্তা নেই৷ পুলিশ যদি কোনো অন্যায় করে তাহলে দেখবে কে? এর জন্য তো লোকজন থাকতে হবে? আমাদের দেশে সে ধরনের কোনো ব্যবস্থাই তো নেই৷''

২০১৩ সালের ১৬ই জুন জাতীয় সংসদে শিশু বিল-২০১৩ পাস হয়৷ এই বিলে বলা আছে কোনো ব্যক্তি যদি শিশুকে সন্ত্রাসী কাজে নিয়োজিত করেন, তবে তার বিচার হবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে৷ এ ধরনের অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড৷ এ আইনে বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোনো অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করাকে সন্ত্রাসী কাজ আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ এই আইন পাসের পরেও কিন্তু থেমে নেই সন্ত্রাসী কাজে শিশুদের ব্যবহার৷

সাধারণ মানুষের দাবি, হরতাল-অবরোধের মতো বিভিন্ন কর্মসূচিতে আর যেন কোনো শিশু চোখ না হারায়, আর যেন কোনো শিশুর হাত উড়ে না যায়৷ সবারই সন্তান আছে, অন্তত নিজের সন্তান মনে করে এই শিশুদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার৷

পুলিশ কেন শিশুদের বয়স বাড়িয়ে মামলার আসামী করছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটা করে তো পুলিশের কোনো লাভ নেই৷ অনেক সময় বৈধ অভিভাবক না পাওয়ার কারণে বয়স এদিক-সেদিক হয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেয়া হয়৷ এছাড়া অপুষ্টির কারণে অনেকের বয়স ঠিতমতো বোঝা যায় না৷ এর কারণেও বয়স বেড়ে যেতে পারে৷''

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পুলিশ ভুল করতে পারে, অনেক সময় ইচ্ছে করেও করতে পারে? কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব আছে৷ পুলিশ যাই বলুক না কেন, কোনো শিশুকে আদালতে হাজির করার পর ম্যাজিস্ট্রেটকেই বুঝে সিদ্ধান্ত দিতে হবে৷ কারো বয়স নিয়ে সন্দেহ হলে পরীক্ষার জন্য মেডিক্যালে পাঠাতে পারেন৷ কোনো একটি শিশুও যেন বড়দের মধ্যে চলে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটদের৷ পাশাপাশি পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তারাও দায় এড়াতে পারেন না৷''

মানবাধিকার কর্মী নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আলোচনা-সমালোচনা যাই হোক শিশুদের মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এটাই তো আসল কথা৷ আসলে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রবণতা চলে আসছে, আমরা তা থেকে বের হতে পারিনি৷ বয়স বাড়িয়ে মামলার আসামী করা, বয়স বাড়িয়ে শিশুদের বিয়ে দেয়া – সবই কিন্তু অপরাধ৷ আমাদের সমাজে এই অপরাধগুলো হরহামেশাই হয়ে যাচ্ছে৷ গণতন্ত্রের ভিত যখন দূর্বল হয়ে যায় তখন শুধু শিশু নয়, সব ধরনের মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে থাকে৷ এখন বাংলাদেশে যা হচ্ছে এগুলো তারই সব আলামত৷''

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে ২০১৩ সালের ৫ই মে৷ ঐ দিন হেফাজতে ইসলামের ডাকা অবরোধ ও শাপলা চত্বরের সমাবেশেও মাদ্রাসার অজস্র শিশু-কিশোরকে নিয়ে আসা হয়৷ ঐ শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ যদিও সেই ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ৪৮ জন শিশুর মৃত্যুর হয়েছে৷ আহত হয়েছে প্রায় দুইশ'৷

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শিশুদের ব্যবহারের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই কাজটা অত্যন্ত অমানবিক৷ আমাদের সবার পরিবারে শিশু আছে৷ তাই আমাদের সবাইকে শিশুদের রাজনীতিতে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে৷ বর্তমান অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে জাতির জন্য ভবিষ্যতে ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে৷ তখন শত চেষ্টা করেও আর পরিত্রাণ মিলবে না৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন