1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় মা - দুই

কেমন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মা? কিন্তু স্বর্ণপ্রসবিনী সারদা দেবীর বিখ্যাত পুত্রদের রচনাতে তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বা বিবরণ নেই বললেই চলে৷ রবীন্দ্রনাথের লেখাতে মায়ের কথা কতটুকু পাওয়া যায়?

default

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মাত্র ছ'বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়৷ সর্বশেষ সন্তান রবীন্দ্রনাথের জন্মের সময় তাঁর বয়স ৩৪-এর মত৷ রবীন্দ্রনাথ কী ইতিহাসে উপেক্ষিতা সেই মায়ের কথা মনে রেখেছিলেন?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি'-তে তাঁর শিশুজীবনের এক পর্বকে ‘ভৃত্যরাজক তন্ত্র' আখ্যা দিয়েছেন৷ সারাদিন ভৃত্যরাজক তন্ত্রের মধ্যে থাকলেও এক পর্যায়ে রাত্রে শোবার সময়ে মায়ের ঘরে তাঁর আশ্রয় মিলতো৷ বিভিন্ন স্মৃতিকথার সূত্রে জানা যায়, মায়ের ঘরে রবীন্দ্রনাথ স্বতন্ত্র শয্যায় শুতেন৷ মা কোনও দিন গল্প শুনিয়ে বা ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে তাঁকে ঘুম পাড়াতেন কি না এমন তথ্য কোথাও পাওয়া যায় না৷

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি'-তে বলেছেন, ‘‘ভূতের ভয় শিরদাঁড়ার উপর চাপিয়ে চলে যেতুম মায়ের ঘরে৷ মা তখন তাঁর খুড়ীকে নিয়ে তাস খেলছেন....এমন উৎপাত বাধিয়ে দিতুম যে, তিনি হাতের খেলা ফেলে দিয়ে বলতেন ‘জ্বালাতন করলে, খুড়ী ওদের গল্প শোনাও গে'৷ আমরা বাইরের বারান্দার ঘটির জলে পা ধুয়ে দিদিমাকে টেনে নিয়ে বিছানায় উঠতুম৷ সেখানে শুরু হত দৈত্যপুরী থেকে রাজকন্যার ঘুম ভাঙিয়ে আনার পালা৷ মাঝখানে আমারই ঘুম ভাঙায় কে৷''

মাতৃস্নেহ না পেলেও মায়ের স্বাভাবিক সস্নেহ প্রশ্রয় থেকে রবীন্দ্রনাথ বঞ্চিত হননি৷ যাত্রাপালা দেখার ইচ্ছে নিয়ে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়া রবীন্দ্রনাথকে ঠিক সময়ে জাগিয়ে দিয়েছেন সারদা দেবী৷ মাস্টার এসেছেন পড়াতে, রবীন্দ্রনাথ পড়া ফাঁকি দিতে চান৷ বানিয়ে মাকে বলতেন পেট কামড়ানির কথা৷ তারপর, রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘শুনে মা মনে মনে হাসতেন, একটুও ভাবনা করতেন বলে মনে হয়নি৷ তবু চাকরকে ডেকে বলে দিতেন, ‘আচ্ছা যা মাষ্টারকে জানিয়ে দে, আজ আর পড়াতে হবে না৷''

অনেকের মতে রবীন্দ্রনাথের মা, রবীন্দ্রনাথের গাত্রবর্ণ নিয়ে তেমন সন্তুষ্ট ছিলেন না৷ বলেছেন ‘সব ছেলের মধ্যে রবিই আমার কালো'৷ এটি ছিলো অবশ্য তাঁর আদরের কথা৷ রবীন্দ্রনাথ কিন্তু আদৌ কালো ছিলেন না৷ তিনি ছিলেন ‘বিশুদ্ধ গৌর বর্ণের' অধিকারী৷ মা তাতেও খুশি ছিলেন না৷

Rabindranath Tagore

রবীন্দ্রনাথের লেখা

ঠাকুরবাড়ির সব ছেলেকেই ছোট বেলায় পালোয়ানের কাছে কুস্তি শিখতে হতো৷ এতে গায়ে বেশ মাটি মাখামাখি হতো৷ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘‘সকাল বেলায় রোজ এত করে মাটি ঘেঁটে আসা ভালো লাগত না মায়ের, তাঁর ভয় হত ছেলের গায়ের রঙ মেটে হয়ে যায় পাছে৷ তার ফল হয়েছিল, ছুটির দিনে তিনি লেগে যেতেন শোধন করতে৷ শোধনক্রিয়ার সামগ্রী হিসেবে থাকতো ‘বাদাম-বাটা, সর, কমলালেবুর খোসা, আরো কতো কী...৷''

রবীন্দ্রনাথের মা রবীন্দ্রনাথের রচনার মধ্যে না থাকলেও খানিকটা ছিলেন তাঁর স্মৃতির মধ্যে৷ ‘জীবনস্মৃতি'তে লিখেছেন, ‘‘মনে পড়ে বাড়ি-ভিতরের পাঁচিল-ঘেরা ছাদ৷ মা বসেছেন সন্ধেবেলায় মাদুর পেতে, তাঁর সঙ্গিনীরা চারদিকে ঘিরে গল্প করছে৷....এই সভায় আমি মাঝে মাঝে টাটকা পুঁথিপড়া বিদ্যের আমদানি করেছি....ঋজুপাঠ দ্বিতীয়ভাগ থেকে স্বয়ং বাল্মিকী রামায়ণের টুকরো আউড়ে দিয়েছি অনুস্বার-বিসর্গ-সুদ্ধ৷ মা জানতেন না তাঁর ছেলের উচ্চারণ কত খাঁটি, তবু তার বিদ্যের পাল্লা....তাঁকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে৷''

মায়ের মৃত্যুতে হাহাকারে আচ্ছন্ন হলেও মাতৃশোক তাঁর জীবনে চিরস্থায়ী হয়নি৷ নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘‘যে ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই, তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণশক্তির একটা প্রধান অঙ্গ৷ শিশুকালে সেই প্রাণশক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীর ভাবে গ্রহণ করে না, স্থায়ী রেখায় আঁকিয়া রাখে না৷ এই জন্য প্রথম যে-মৃত্যু কালো ছায়া ফেলিয়া প্রবেশ করিল, তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতোই একদিন নিঃশব্দ পদে চলিয়া গেল৷''

তাই বলে, রবীন্দ্রনাথের মন থেকে মায়ের স্মৃতি যে, একেবারেই মুছে গিয়েছিলো তা নয়৷ রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেছেন, ‘‘...বড়ো হইলে যখন বসন্ত প্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেল ফুল চাঁদরের প্রান্তে বাঁধিয়া খ্যাপার মতো বেড়াইতাম৷ তখন সেই কোমল চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিন আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত৷ আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম যে স্পর্শ সেই সুন্দর আঙুলের আগায় ছিল, সেই স্পর্শই প্রতিদিন এই বেলফুল গুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে...৷''

পরিণত মধ্য বয়সেও রবীন্দ্রনাথের মনের মাঝে মাতৃস্মৃতি পুনরায় যে ফিরে এসেছে তার প্রমাণ মেলে, ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতন মন্দিরে প্রদত্ত এক উপদেশে৷ রবীন্দ্রনাথ সেখানে তাঁর দেখা এক স্বপ্নের উল্লেখ করেছেন, ‘‘...আমার একটি স্বপ্নের কথা বলি৷ আমি নিতান্ত বালককালে মাতৃহীন৷ আমার বড়ো বয়সের জীবনে মার অধিষ্ঠান ছিল না৷ কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখলুম, আমি যেন বাল্যকালেই রয়ে গেছি৷ গঙ্গার ধারের বাগান বাড়িতে মা একটি ঘরে বসে রয়েছেন৷ মা আছেন তো আছেন৷ তাঁর আর্বিভাব তো সকল সময়ে চেতনাকে অধিকার করে থাকে না৷ আমিও মাতার প্রতি মন না দিয়ে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে চলে গেলুম৷ বারান্দায় গিয়ে এক মুহূর্তে আমার কী হল জানি নে৷ আমার মনে এই কথাটা জেগে উঠল যে, মা আছেন৷ তখনই তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলুম৷ তিনি আমার হাত ধরে আমাকে বললেন, ‘তুমি এসেছ!' এইখানে স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল৷ ''

মাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সম্ভবত এটাই শেষ প্রকাশ্য স্মরণ৷

প্রতিবেদন: ফরহাদ খান

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

নির্বাচিত প্রতিবেদন