1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা পরিভাষা

রবীন্দ্রনাথ বাঙালির জীবনাচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন৷ তাঁর ভাবনার বলয়ে আবর্তিত হয়েছে বাংলা ও বাঙালির যাবতীয় অনুষঙ্গ৷

default

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের অনুচিন্তনে প্রোথিত বিষয়াবলির মধ্যে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিলো বাংলাভাষা৷ মাতৃভাষা বাংলার সপক্ষে ছিলো তাঁর আজন্ম সংগ্রাম৷ তাঁর বহু প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে তার পরিচয় পাওয়া যায়৷

শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন৷ মাত্র বাইশ বছর বয়সে ‘ভারতী' পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, ‘‘ইংরাজিতে যাহা শিখিয়াছ তাহা বাংলায় প্রকাশ কর, বাংলা সাহিত্য উন্নতি লাভ করুক ও অবশেষে বাংলা বিদ্যালয়ে দেশ ছাইয়া সেই সমুদয় শিক্ষা বাংলায় ব্যাপ্ত হইয়া পড়ুক৷''

মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে বাংলাদেশে সকল প্রকার শিক্ষার ব্যবস্থা করা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চিরজীবন উদ্বিগ্ন ছিলেন৷ বঙ্গাব্দ তেরো শ'র আষাঢ় সংখ্যায় তিনি শিক্ষায় মাতৃভাষার স্থান সম্বন্ধে যা বলেছিলেন তা এখনো উদ্ধৃতিযোগ্য – ‘‘কোন শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে চাইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চিরপরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়৷''

বাংলাভাষার রূপ ও প্রকৃতি, অবয়ব এবং আন্তরশক্তি অবলোকন ও অনুসন্ধানে ছিলো তাঁর নিরন্তর আগ্রহ৷ শুধু ভাব প্রকাশের বাহন নয় বাংলাভাষাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন চর্চার বাহন হিসেবে পেতে হলে, তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলাভাষাকে চিনতে হবে ভালো করে; কোথায় তার শক্তি, কোথায় তার দুর্বলতা, দুইই আমাদের জানা চাই৷'' তিনি চেয়েছিলেন বাংলাভাষা যেন সবল ও সতেজ হয়৷

বঙ্গাব্দ তেরো শ' এগারোতে তিনি 'ভাষার ইঙ্গিত' প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘‘বৈয়াকরণের যে সকল গুণ ও বিদ্যা থাকা উচিত তাহা আমার নাই, শিশুকাল হইতে স্বভাবত আমি ব্যাকরণভীরু; কিন্তু বাংলাভাষাকে তাহার সকল প্রকার মূর্তিতেই আমি হৃদয়ের সহিত শ্রদ্ধা করি, এই জন্য তাহার সহিত তন্নতন্ন করিয়া পরিচয় সাধনে আমি ক্লান্তিবোধ করি না৷''

রবীন্দ্রনাথের এই শ্রদ্ধার প্রতিরূপ হলো তাঁর দুই অসামান্য গ্রন্থ ‘বাংলাভাষা-পরিচয়' ও ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব'৷

Rabindranath Tagore

মাতৃভাষা বাংলার সপক্ষে ছিলো তাঁর আজন্ম সংগ্রাম৷ তাঁর বহু প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে তার পরিচয় পাওয়া যায়৷

অধ্যাপক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৩২-এ৷ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা ছিলো ‘‘রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের হিতার্থে বেশ কিছু ভাষণ দিবেন এবং বাংলাভাষার অধ্যয়ন ও গবেষণাকর্মের উন্নতি সাধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা করিবেন৷''

গবেষণা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান বাংলা বানানে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা স্থাপন করা আবশ্যক এবং এ কাজের ভার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই গ্রহণ করা উচিত৷'' একই সঙ্গে তিনি বাংলায় বৈজ্ঞানিক শব্দের পরিভাষা প্রণয়ন ও সংকলনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উত্থাপন করেন৷ রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব অনুসারে গঠিত হয় বহুল পরিচিত ‘কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান-সংস্কার-সমিতি৷' সংস্কার সমিতির প্রথম পুস্তিকা প্রকাশিত হয় ১৯৩৬-এর মে মাসে ‘বাংলা বানানের নিয়ম' শিরোনামে৷

বাংলাভাষার যে নিজস্ব ব্যাকরণ নেই সে কথাও প্রথম মনে করিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ৷ বাংলা ব্যাকরণ যে সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বারা শাসিত হতে পারে না সেই কথা সামনে রেখে তিনি তাঁর ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব' ও ‘বাংলাভাষা-পরিচয়' গ্রন্থে প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ রচনার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন৷ মাতৃভাষার প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা এবং শিক্ষার বাহন হিসেবে মাতৃভাষা বাংলা প্রচলনের প্রবল দায়িত্ববোধ প্রসঙ্গে এসে পড়ে তাঁর পরিভাষা-ভাবনার কথা৷ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর, অর্থাৎ জীবনের এক বিরাট সময় ধরে রবীন্দ্রনাথ বাংলা পরিভাষা নিয়ে কাজ করেছেন, মাথা ঘামিয়েছেন, নানাজনকে নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন৷

রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন, ‘‘গল্প কবিতা নাটক দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পনেরো আনা আয়োজন৷ অর্থাৎ ভোজের আয়োজন, শক্তির আয়োজন নয়৷'' বাংলাভাষায় শক্তির আয়োজন করতে গিয়ে প্রয়োজন পড়ে পরিভাষার৷ বাংলা পরিভাষা তৈরির কাজ শুরু হয় উনিশ শতকে এ দেশে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাতের কালে৷

বাংলা পারিভাষিক শব্দ তৈরির বিভিন্ন নীতিকৌশল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ ছিলো৷ কেউ চেয়েছেন শব্দের সহজবোধ্যতা, কেউ শ্রুতিমাধুর্য, কেউ চেয়েছেন শব্দের দার্ঢ্য৷ কেউ হয়েছেন শুধুই সংস্কৃতনির্ভর, কারো বা পক্ষপাত আরবি-ফারসি দেশী শব্দের ওপর৷ রবীন্দ্রনাথ জোর দিয়েছেন পারিভাষিক শব্দের প্রকাশ-সামর্থ ও যাথার্থের ওপর৷ শব্দের অর্থের মধ্যে তিনি সবসময় যুক্তি খুঁজতেন৷ যুক্তিতে না টিকলে তিনি সরাসরি মূলভাষার শব্দটিকে গ্রহণ করতেন, যেমন করেছিলেন ‘রোমান্টিক' শব্দের বেলায়৷ এই শব্দের তিনি কোনো বাংলা করতে যাননি৷ বাংলা করেননি অনেক শব্দের৷

প্রতিবেদন: ফরহাদ খান

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

নির্বাচিত প্রতিবেদন