1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি: সনজীদা খাতুন

স্বাধীন বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার বিকাশ ঘটেছে ব্যাপকভাবে৷ পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল এক অন্যতম হাতিয়ার৷ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল সুরলোকের সেই হাতিয়ার?

default

সনজীদা খাতুন

১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের তদানীন্তন তথ্যমন্ত্রী, ঢাকার নবাব বাড়ির খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত প্রচারের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিলেন, এই সংগীত পাকিস্তানের আদর্শের বিরোধী৷ ১৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক এই নির্দেশনামার বিরোধিতা করে বিবৃতি দিলেন৷ এতে রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাভাষী পাকিস্তানীর অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে' দাবি করা হয়৷ পাল্টা বিবৃতি দিলেন রবীন্দ্রবিরোধী, পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিরা৷ এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে  তিনদিন ধরে অনুষ্ঠিত হল বুলবুল ললিতকলা কেন্দ্র বাফা, ছায়ানট, ক্রান্তির সম্মেলক অনুষ্ঠান৷ বইতে শুরু করল জোর রবীন্দ্র হাওয়া৷

উপমহাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরির নামে ঢাকায় বাফা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে৷ বাফায় রবীন্দ্র সংগীত শিখিয়েছেন কলিম শরাফী, ভক্তিময় সেনগুপ্ত এবং আরো পরে আতিকুল ইসলাম৷ তৎকালীন পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্র সংগীতের চর্চায় বাফার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করলেন ছায়ানট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম রূপকার সনজীদা খাতুন৷ তিনি বলেন: ‘‘বাফা রবীন্দ্র সংগীতের চর্চা ভালভাবেই চালিয়ে গেছে সেইসময়৷ এমনকি শান্তিনিকেতন থেকে ‘শ্যামা' নৃত্যনাট্যের দল নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠান করেছে৷ কলকাতা থেকে দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষদের নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠানে গান গাইয়েছে৷ বাফার ভূমিকাটা তখন খুবই ভাল ছিল৷''

Flash-Galerie Bangladeshi singer Dr. Sanjida Khatun

বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার এক কিংবদন্তি সনজীদা খাতুন

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের পরই গড়ে ওঠে সমমনা সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে ‘ছায়ানট'৷ ঢাকায় রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের আবাহনী অনুষ্ঠান শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান৷ পাকিস্তান আমলে এগুলো ছিল প্রতিবাদেরই প্রকাশ৷ এই প্রতিবাদের শরিক হয় ছোটবড় আরো সাংস্কৃতিক সংগঠন৷ আন্দোলনের নানা পর্বে নানা অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান৷ সনজীদা খাতুন বললেন: ‘‘সোনার বাংলা গাওয়া হয়েছে মিছিলে৷ অনুষ্ঠান হলে সেখানে ‘সার্থক জনম আমার' গাওয়া হয়েছে৷ একটি গান আমরা আবিষ্কার করেছিলাম৷ ‘কে এসে যায় ফিরে ফিরে  আকুল নয়ননীরে৷ কে বৃথা আশাভরে চাহিছে মুখ'পরে, সে যে আমার জননী রে৷' তার পরের কথাগুলো ইম্পর্টেন্ট৷ ‘কাহার সুধাময়ী বাণী  মিলায় অনাদর মানি৷ কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায়, সে যে আমার জননীরে৷' এই যে গানটা, এটা রবীন্দ্রনাথ বহু আগে বাংলায় যে বক্তৃতা হত না তা নিয়ে দুঃখ করে গানটা লিখেছিলেন৷ আর আমরা ভাষা আন্দোলনের পরে এই গানটা নতুন করে আবিষ্কার করলাম৷ এই গান আমরা তখন গাইতাম৷ তাছাড়াও পাকিস্তান আমলে আমরা যেটা করেছি, যখনই কোন একটা বিরূপ ব্যাপার হত তখনই আমরা রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে আমাদের মনের ব্যথাটা প্রকাশ করতাম৷ যারা দর্শক হয়ে আসতেন তারা কিন্তু বুঝতে পারতেন৷ একটা অনুষ্ঠানে আমরা গেয়েছিলাম -‘কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো! বিরহানলে জ্বালোরে তারে জ্বালো৷' অন্ধকারের মধ্যে গানটা শুরু করা হয়েছিল৷ এবং সেটা বিশেষভাবে মানুষের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল৷ তাছাড়া একবার পাকিস্তান আমলে, আইউবের আমলে চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের গ্রামে শিশুনারী নির্বিশেষে মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছিল৷ আর্মি গিয়ে করেছিল৷ সেই সময় বৌদ্ধরা কয়েকজন আমাদের কাছে এসেছিলেন৷ বললেন, আমরা কিছুতো করতে পারছিনা, কিছু বলতে পারছি না৷ আমরা রবীন্দ্র সংগীতের একটা অনুষ্ঠান করতে চাই৷‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী', বুদ্ধকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান আছে সেই গানগুলো, সেসময় তারা আমাদের কাছে দেখে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছিলেন৷ এটাও আন্দোলনই হলো৷''

মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে৷ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নানা উদ্দীপক গানের সঙ্গে প্রচারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান৷ সনজীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক এঁদের সক্রিয় উদ্যোগে গড়ে ওঠে গানের দল৷ তাঁরা ঘুরে বেড়ান মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে৷ সনজীদা খাতুন জানালেন: ‘‘আমাদেরকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল কলকাতায়৷ সেখানে গিয়ে আমরা ‘রূপান্তরের গান' নামে একটি গীতি আলেখ্য তৈরি করেছিলাম৷ তাতে ‘সার্থক জনম আমার' ছিল৷ ‘সোনার বাংলা' তো ছিলই৷ আরো গান ছিল৷ ‘দেশে দেশে ভ্রমি তব দুখ গান গাহিয়ে, নগরে প্রান্তরে বনে বনে৷ অশ্রু ঝরে দু নয়নে, পাষাণ হৃদয় কাঁদে সে কাহিনী শুনিয়ে৷' কিংবা আরেকটা গান ছিল - ‘ঢাকোরে মুখ চন্দ্রমা, জলদে'৷ মানে চাঁদকে বলা হচ্ছে মুখ ঢেকে ফেলো, বড় লজ্জার দিন, বড় কষ্টের দিন, দুঃখের দিন৷ এই গানগুলোকে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করে তখন গাইতাম৷ এবং এই গান হতো মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্থীদের শিবিরে এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে সাধারণ মানুষকে আমাদের বেদনার সাথে যুক্ত করবার জন্য আমরা এই গানগুলো গাইতাম৷ কাজেই রবীন্দ্র সংগীত আমাদের আন্দোলনের মস্তবড় একটা হাতিয়ার ছিল এবং এখনও আছে৷ এখনও আমরা বলি, রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি৷''

প্রতিবেদন: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

সম্পাদনা: সঞ্জীব বর্মন

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়